ঢাকা ০৫:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাদিপাহাড়ে সাইফুল হত্যাকান্ড : সিহাব নামের যুবক আটক চকরিয়ায় শিক্ষার্থীকে অপহরণ : যুবকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদ জেলা শাখার কমিটি অনুমোদন: সভাপতি জোবায়ের, সা: সম্পাদক ওসমান জ্বালানি তেলের দাম বাড়তেই কক্সবাজার-টেকনাফ রুটে বাসভাড়া বৃদ্ধি কক্সবাজারে ৪৪ লাখ ৯২ হাজার ইয়াবাসহ ১৩৫ কোটি টাকার মাদক ধ্বংস কক্সবাজার সদর থানার বিশেষ অভিযান: ২৪ ঘন্টায় গ্রেপ্তার ২৯ হলদিয়ায় কিশোরকে মারধর করে অপহরণ : থানায় অভিযোগ দায়ের মহেশখালীতে ঘুরতে এসে সড়ক দুর্ঘটনায় চকরিয়ার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু লিংক রোডে এসআরবির হাতে আটক ২ ২ মাদক কারবারি : ইয়াবা উদ্ধার পেকুয়ায় সড়ক অবরুদ্ধ করে লবণবোঝাই, ট্রাকচালককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা দেশের স্বার্থ ও জনস্বার্থ বিবেচনা করেই কাজ করতে হবে-টেকনাফে শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি কক্সবাজারে চালু হলো মাদকদ্রব্য অপরাধ দমনে তিন ট্রাইব্যুনাল পড়ে আছে মহেশখালীর ৮ হাজার কোটি টাকার পাইপলাইন নিখোঁজের ৮ বছর পর বালুখালীর জসিমকে  পঞ্চগড় থেকে ফিরে পেল পরিবার

পুলিশের মানবিকতায় বাঁচল প্রসূতি মা ও নবজাতকের প্রাণ

চারদিকে তখন গভীর রাতের নিস্তব্ধতা। জনমানবহীন রাস্তা, ঘুমে ডুবে পুরো জনপদ। ঠিক এমন সময় এক প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট্ট কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ভেসে আসছিল এক অসহায় মায়ের কান্না আর মৃত্যুভয়ে কাঁপতে থাকা আর্তনাদ। ক্লিনিকের অন্ধকার মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া এক মা। তার পাশেই নাড়ি না কাটা নবজাতক ছেলে সন্তান। না ছিল চিকিৎসক, না ছিল বিদ্যুৎ, না ছিল কোনো যানবাহন। ছিল শুধু মৃত্যুর সঙ্গে সময়ের নির্মম প্রতিযোগিতা। আর ঠিক তখনই মানবিকতার আলো হয়ে সেখানে পৌঁছায় কক্সবাজারের রামুর থানা পুলিশের একটি টহল দল।

সোমবার (১৮ মে) ভোর রাত সাড়ে ৩টার দিকে রামু থানার রাত্রিকালীন মোবাইল টিমের দায়িত্বে ছিলেন এএসআই জাহিদ। সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে সিএনজিযোগে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় টহল দিচ্ছিলেন তিনি। টহল দল যখন রাজারকুল সিকদারপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের সামনে পৌঁছায়, তখন এক মধ্যবয়সী নারী উদভ্রান্তের মতো দৌড়ে এসে পুলিশ বহনকারী সিএনজির সামনে দাঁড়ান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি শুধু বলছিলেন— “বাবা, আমার মেয়েটাকে বাঁচান… না হলে ও মারা যাবে…”

এএসআই জাহিদ ও তার সঙ্গীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওই নারী জানান, ক্লিনিকের ভেতরে তার মেয়ে সদ্য সন্তান জন্ম দিয়েছেন। মা ও নবজাতক দুজনই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। দ্রুত হাসপাতালে নিতে না পারলে হয়তো আর বাঁচানো যাবে না।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে এক মুহূর্তও দেরি করেননি এএসআই জাহিদ। দ্রুত তিনি ক্লিনিকের ভেতরে ঢুকে পড়েন।

ভেতরের দৃশ্য যেন এক বিভীষিকা। বিদ্যুৎহীন অন্ধকার ঘরের ঠান্ডা মেঝেতে রক্তে ভেজা কাপড়ে কাতরাচ্ছিলেন প্রসূতি মা। তার বুকের পাশে নিথর হয়ে পড়ে ছিল সদ্য পৃথিবীর আলো দেখা ছোট্ট শিশু সন্তানটি। সেই মুহূর্তে উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের অনেকের চোখও ভিজে ওঠে। তারা বুঝতে পারেন, আর কয়েক মিনিট দেরি হলেই হয়তো নিভে যাবে দুটি জীবন।

কিন্তু সামনে তখন আরও বড় সংকট। গভীর রাতে আশপাশে কোনো যানবাহন নেই। পুলিশ বহনকারী সিএনজিতেও এতজন নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

সময় নষ্ট না করে এএসআই জাহিদ ছুটে যান পাশের দেওয়ানপাড়া গ্রামে। গভীর ঘুম থেকে ডেকে তোলেন সিএনজি চালক শুক্কুরকে। পরিস্থিতির কথা শুনে তিনিও মানবিকতার ডাকে সাড়া দেন। এরপর শুরু হয় জীবনের জন্য দৌড়।

রাতের আঁধার চিরে দ্রুত সিএনজিতে করে প্রসূতি মা ও নবজাতককে নিয়ে যাওয়া হয় রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েই থেমে থাকেননি পুলিশ সদস্যরা। নিজেদের উদ্যোগে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র কিনে দেন, চিকিৎসা নিশ্চিত করেন। চিকিৎসকদের নিরলস চেষ্টায় অবশেষে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসে মা ও নবজাতক।

হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, আরও কিছু সময় দেরি হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারত। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মা ও শিশুর জীবন দুটোই ঝুঁকির মধ্যে ছিল।

ঘটনার পর পুরো এলাকায় প্রশংসায় ভাসছেন এএসআই জাহিদ ও তার টহল টিম। স্থানীয়রা বলছেন, পুলিশ সদস্যরা শুধু দায়িত্ব পালন করেননি, তারা একজন মায়ের জন্য অভিভাবকের মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আলম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেছেন, “পুলিশকে আমরা অনেক সময় ভয় পাই। কিন্তু সে রাতে তারা ফেরেশতার মতো এসেছে। না এলে হয়তো দুটি লাশ বের হতো সেই ক্লিনিক থেকে।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি ছড়িয়েছে ব্যাপকভাবে। অনেকেই লিখছেন, কঠোরতার আড়ালেও পুলিশের ভেতরে যে এক মানবিক হৃদয় আছে, এই ঘটনাই তার প্রমাণ।

রাত তিনটার সেই অন্ধকারে, যখন একটি পরিবার মৃত্যুর আতঙ্কে ভেঙে পড়েছিল, তখন কয়েকজন পুলিশ সদস্য মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে লিখেছেন মানবতার এক উজ্জ্বল গল্প। এক নবজাতকের প্রথম কান্না আর এক মায়ের বেঁচে থাকার পেছনে তাই আজ জড়িয়ে আছে, রামুর রাতের টহল পুলিশের নিঃস্বার্থ মানবিকতা।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

পুলিশের মানবিকতায় বাঁচল প্রসূতি মা ও নবজাতকের প্রাণ

আপডেট সময় : ০৯:৩৫:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

চারদিকে তখন গভীর রাতের নিস্তব্ধতা। জনমানবহীন রাস্তা, ঘুমে ডুবে পুরো জনপদ। ঠিক এমন সময় এক প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট্ট কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ভেসে আসছিল এক অসহায় মায়ের কান্না আর মৃত্যুভয়ে কাঁপতে থাকা আর্তনাদ। ক্লিনিকের অন্ধকার মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া এক মা। তার পাশেই নাড়ি না কাটা নবজাতক ছেলে সন্তান। না ছিল চিকিৎসক, না ছিল বিদ্যুৎ, না ছিল কোনো যানবাহন। ছিল শুধু মৃত্যুর সঙ্গে সময়ের নির্মম প্রতিযোগিতা। আর ঠিক তখনই মানবিকতার আলো হয়ে সেখানে পৌঁছায় কক্সবাজারের রামুর থানা পুলিশের একটি টহল দল।

সোমবার (১৮ মে) ভোর রাত সাড়ে ৩টার দিকে রামু থানার রাত্রিকালীন মোবাইল টিমের দায়িত্বে ছিলেন এএসআই জাহিদ। সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে সিএনজিযোগে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় টহল দিচ্ছিলেন তিনি। টহল দল যখন রাজারকুল সিকদারপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের সামনে পৌঁছায়, তখন এক মধ্যবয়সী নারী উদভ্রান্তের মতো দৌড়ে এসে পুলিশ বহনকারী সিএনজির সামনে দাঁড়ান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি শুধু বলছিলেন— “বাবা, আমার মেয়েটাকে বাঁচান… না হলে ও মারা যাবে…”

এএসআই জাহিদ ও তার সঙ্গীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওই নারী জানান, ক্লিনিকের ভেতরে তার মেয়ে সদ্য সন্তান জন্ম দিয়েছেন। মা ও নবজাতক দুজনই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। দ্রুত হাসপাতালে নিতে না পারলে হয়তো আর বাঁচানো যাবে না।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে এক মুহূর্তও দেরি করেননি এএসআই জাহিদ। দ্রুত তিনি ক্লিনিকের ভেতরে ঢুকে পড়েন।

ভেতরের দৃশ্য যেন এক বিভীষিকা। বিদ্যুৎহীন অন্ধকার ঘরের ঠান্ডা মেঝেতে রক্তে ভেজা কাপড়ে কাতরাচ্ছিলেন প্রসূতি মা। তার বুকের পাশে নিথর হয়ে পড়ে ছিল সদ্য পৃথিবীর আলো দেখা ছোট্ট শিশু সন্তানটি। সেই মুহূর্তে উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের অনেকের চোখও ভিজে ওঠে। তারা বুঝতে পারেন, আর কয়েক মিনিট দেরি হলেই হয়তো নিভে যাবে দুটি জীবন।

কিন্তু সামনে তখন আরও বড় সংকট। গভীর রাতে আশপাশে কোনো যানবাহন নেই। পুলিশ বহনকারী সিএনজিতেও এতজন নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

সময় নষ্ট না করে এএসআই জাহিদ ছুটে যান পাশের দেওয়ানপাড়া গ্রামে। গভীর ঘুম থেকে ডেকে তোলেন সিএনজি চালক শুক্কুরকে। পরিস্থিতির কথা শুনে তিনিও মানবিকতার ডাকে সাড়া দেন। এরপর শুরু হয় জীবনের জন্য দৌড়।

রাতের আঁধার চিরে দ্রুত সিএনজিতে করে প্রসূতি মা ও নবজাতককে নিয়ে যাওয়া হয় রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েই থেমে থাকেননি পুলিশ সদস্যরা। নিজেদের উদ্যোগে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র কিনে দেন, চিকিৎসা নিশ্চিত করেন। চিকিৎসকদের নিরলস চেষ্টায় অবশেষে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসে মা ও নবজাতক।

হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, আরও কিছু সময় দেরি হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারত। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মা ও শিশুর জীবন দুটোই ঝুঁকির মধ্যে ছিল।

ঘটনার পর পুরো এলাকায় প্রশংসায় ভাসছেন এএসআই জাহিদ ও তার টহল টিম। স্থানীয়রা বলছেন, পুলিশ সদস্যরা শুধু দায়িত্ব পালন করেননি, তারা একজন মায়ের জন্য অভিভাবকের মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আলম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেছেন, “পুলিশকে আমরা অনেক সময় ভয় পাই। কিন্তু সে রাতে তারা ফেরেশতার মতো এসেছে। না এলে হয়তো দুটি লাশ বের হতো সেই ক্লিনিক থেকে।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি ছড়িয়েছে ব্যাপকভাবে। অনেকেই লিখছেন, কঠোরতার আড়ালেও পুলিশের ভেতরে যে এক মানবিক হৃদয় আছে, এই ঘটনাই তার প্রমাণ।

রাত তিনটার সেই অন্ধকারে, যখন একটি পরিবার মৃত্যুর আতঙ্কে ভেঙে পড়েছিল, তখন কয়েকজন পুলিশ সদস্য মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে লিখেছেন মানবতার এক উজ্জ্বল গল্প। এক নবজাতকের প্রথম কান্না আর এক মায়ের বেঁচে থাকার পেছনে তাই আজ জড়িয়ে আছে, রামুর রাতের টহল পুলিশের নিঃস্বার্থ মানবিকতা।