ঢাকা ০৪:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
এই শোক শেষ হবার নয়: সাংবাদিক আতাহার ইকবালের বিদায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ডাম্পার চালকের মৃত্যু লামায় বোনের পালিয়ে বিয়ে:ভাইয়ের গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা বন্যাদুর্গত কক্সবাজারসহ ৫ জেলায় তিন মাসের জন্য ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি আদায় স্থগিত নৈতিক স্খলনের দায়ে গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াত থেকে বহিষ্কার ইউপি চেয়ারম্যানের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণে হাইকোর্টে রুল লামায় ভাড়াবাসা থেকে যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার সন্ধ্যার মধ্যে যেসব জেলায় ঝড়ের আভাস টেকনাফের ‘জাফর চেয়ারম্যান’ দুনীর্তির দায়ে ৭ বছরের সাজা নিয়ে কারাগারে ফাইনালের পর কাতারে আবারও মুখোমুখি হতে পারে স্পেন-আর্জেন্টিনা ফ্রান্সে ১৫ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধে আইন পাস বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের স্পেশাল মিডিয়েটর হিসাবে নিয়োগ পেলেন অ্যাডভোকেট মোঃ শাহা আলম রাজা পালংয়ের প্রয়াত জননেতা শেখ শাহাবুদ্দিনের সহধর্মিণীর মৃত্যু : জানাজা বুধবার পেকুয়ায় দুর্বৃত্তের দেয়া আগুনে পুড়লো আমজাদের ড্রাম ট্রাক জেলা পুলিশের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

পুলিশের মানবিকতায় বাঁচল প্রসূতি মা ও নবজাতকের প্রাণ

চারদিকে তখন গভীর রাতের নিস্তব্ধতা। জনমানবহীন রাস্তা, ঘুমে ডুবে পুরো জনপদ। ঠিক এমন সময় এক প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট্ট কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ভেসে আসছিল এক অসহায় মায়ের কান্না আর মৃত্যুভয়ে কাঁপতে থাকা আর্তনাদ। ক্লিনিকের অন্ধকার মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া এক মা। তার পাশেই নাড়ি না কাটা নবজাতক ছেলে সন্তান। না ছিল চিকিৎসক, না ছিল বিদ্যুৎ, না ছিল কোনো যানবাহন। ছিল শুধু মৃত্যুর সঙ্গে সময়ের নির্মম প্রতিযোগিতা। আর ঠিক তখনই মানবিকতার আলো হয়ে সেখানে পৌঁছায় কক্সবাজারের রামুর থানা পুলিশের একটি টহল দল।

সোমবার (১৮ মে) ভোর রাত সাড়ে ৩টার দিকে রামু থানার রাত্রিকালীন মোবাইল টিমের দায়িত্বে ছিলেন এএসআই জাহিদ। সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে সিএনজিযোগে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় টহল দিচ্ছিলেন তিনি। টহল দল যখন রাজারকুল সিকদারপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের সামনে পৌঁছায়, তখন এক মধ্যবয়সী নারী উদভ্রান্তের মতো দৌড়ে এসে পুলিশ বহনকারী সিএনজির সামনে দাঁড়ান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি শুধু বলছিলেন— “বাবা, আমার মেয়েটাকে বাঁচান… না হলে ও মারা যাবে…”

এএসআই জাহিদ ও তার সঙ্গীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওই নারী জানান, ক্লিনিকের ভেতরে তার মেয়ে সদ্য সন্তান জন্ম দিয়েছেন। মা ও নবজাতক দুজনই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। দ্রুত হাসপাতালে নিতে না পারলে হয়তো আর বাঁচানো যাবে না।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে এক মুহূর্তও দেরি করেননি এএসআই জাহিদ। দ্রুত তিনি ক্লিনিকের ভেতরে ঢুকে পড়েন।

ভেতরের দৃশ্য যেন এক বিভীষিকা। বিদ্যুৎহীন অন্ধকার ঘরের ঠান্ডা মেঝেতে রক্তে ভেজা কাপড়ে কাতরাচ্ছিলেন প্রসূতি মা। তার বুকের পাশে নিথর হয়ে পড়ে ছিল সদ্য পৃথিবীর আলো দেখা ছোট্ট শিশু সন্তানটি। সেই মুহূর্তে উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের অনেকের চোখও ভিজে ওঠে। তারা বুঝতে পারেন, আর কয়েক মিনিট দেরি হলেই হয়তো নিভে যাবে দুটি জীবন।

কিন্তু সামনে তখন আরও বড় সংকট। গভীর রাতে আশপাশে কোনো যানবাহন নেই। পুলিশ বহনকারী সিএনজিতেও এতজন নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

সময় নষ্ট না করে এএসআই জাহিদ ছুটে যান পাশের দেওয়ানপাড়া গ্রামে। গভীর ঘুম থেকে ডেকে তোলেন সিএনজি চালক শুক্কুরকে। পরিস্থিতির কথা শুনে তিনিও মানবিকতার ডাকে সাড়া দেন। এরপর শুরু হয় জীবনের জন্য দৌড়।

রাতের আঁধার চিরে দ্রুত সিএনজিতে করে প্রসূতি মা ও নবজাতককে নিয়ে যাওয়া হয় রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েই থেমে থাকেননি পুলিশ সদস্যরা। নিজেদের উদ্যোগে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র কিনে দেন, চিকিৎসা নিশ্চিত করেন। চিকিৎসকদের নিরলস চেষ্টায় অবশেষে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসে মা ও নবজাতক।

হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, আরও কিছু সময় দেরি হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারত। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মা ও শিশুর জীবন দুটোই ঝুঁকির মধ্যে ছিল।

ঘটনার পর পুরো এলাকায় প্রশংসায় ভাসছেন এএসআই জাহিদ ও তার টহল টিম। স্থানীয়রা বলছেন, পুলিশ সদস্যরা শুধু দায়িত্ব পালন করেননি, তারা একজন মায়ের জন্য অভিভাবকের মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আলম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেছেন, “পুলিশকে আমরা অনেক সময় ভয় পাই। কিন্তু সে রাতে তারা ফেরেশতার মতো এসেছে। না এলে হয়তো দুটি লাশ বের হতো সেই ক্লিনিক থেকে।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি ছড়িয়েছে ব্যাপকভাবে। অনেকেই লিখছেন, কঠোরতার আড়ালেও পুলিশের ভেতরে যে এক মানবিক হৃদয় আছে, এই ঘটনাই তার প্রমাণ।

রাত তিনটার সেই অন্ধকারে, যখন একটি পরিবার মৃত্যুর আতঙ্কে ভেঙে পড়েছিল, তখন কয়েকজন পুলিশ সদস্য মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে লিখেছেন মানবতার এক উজ্জ্বল গল্প। এক নবজাতকের প্রথম কান্না আর এক মায়ের বেঁচে থাকার পেছনে তাই আজ জড়িয়ে আছে, রামুর রাতের টহল পুলিশের নিঃস্বার্থ মানবিকতা।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

এই শোক শেষ হবার নয়: সাংবাদিক আতাহার ইকবালের বিদায়

পুলিশের মানবিকতায় বাঁচল প্রসূতি মা ও নবজাতকের প্রাণ

আপডেট সময় : ০৯:৩৫:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

চারদিকে তখন গভীর রাতের নিস্তব্ধতা। জনমানবহীন রাস্তা, ঘুমে ডুবে পুরো জনপদ। ঠিক এমন সময় এক প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট্ট কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ভেসে আসছিল এক অসহায় মায়ের কান্না আর মৃত্যুভয়ে কাঁপতে থাকা আর্তনাদ। ক্লিনিকের অন্ধকার মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া এক মা। তার পাশেই নাড়ি না কাটা নবজাতক ছেলে সন্তান। না ছিল চিকিৎসক, না ছিল বিদ্যুৎ, না ছিল কোনো যানবাহন। ছিল শুধু মৃত্যুর সঙ্গে সময়ের নির্মম প্রতিযোগিতা। আর ঠিক তখনই মানবিকতার আলো হয়ে সেখানে পৌঁছায় কক্সবাজারের রামুর থানা পুলিশের একটি টহল দল।

সোমবার (১৮ মে) ভোর রাত সাড়ে ৩টার দিকে রামু থানার রাত্রিকালীন মোবাইল টিমের দায়িত্বে ছিলেন এএসআই জাহিদ। সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে সিএনজিযোগে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় টহল দিচ্ছিলেন তিনি। টহল দল যখন রাজারকুল সিকদারপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের সামনে পৌঁছায়, তখন এক মধ্যবয়সী নারী উদভ্রান্তের মতো দৌড়ে এসে পুলিশ বহনকারী সিএনজির সামনে দাঁড়ান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি শুধু বলছিলেন— “বাবা, আমার মেয়েটাকে বাঁচান… না হলে ও মারা যাবে…”

এএসআই জাহিদ ও তার সঙ্গীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওই নারী জানান, ক্লিনিকের ভেতরে তার মেয়ে সদ্য সন্তান জন্ম দিয়েছেন। মা ও নবজাতক দুজনই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। দ্রুত হাসপাতালে নিতে না পারলে হয়তো আর বাঁচানো যাবে না।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে এক মুহূর্তও দেরি করেননি এএসআই জাহিদ। দ্রুত তিনি ক্লিনিকের ভেতরে ঢুকে পড়েন।

ভেতরের দৃশ্য যেন এক বিভীষিকা। বিদ্যুৎহীন অন্ধকার ঘরের ঠান্ডা মেঝেতে রক্তে ভেজা কাপড়ে কাতরাচ্ছিলেন প্রসূতি মা। তার বুকের পাশে নিথর হয়ে পড়ে ছিল সদ্য পৃথিবীর আলো দেখা ছোট্ট শিশু সন্তানটি। সেই মুহূর্তে উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের অনেকের চোখও ভিজে ওঠে। তারা বুঝতে পারেন, আর কয়েক মিনিট দেরি হলেই হয়তো নিভে যাবে দুটি জীবন।

কিন্তু সামনে তখন আরও বড় সংকট। গভীর রাতে আশপাশে কোনো যানবাহন নেই। পুলিশ বহনকারী সিএনজিতেও এতজন নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

সময় নষ্ট না করে এএসআই জাহিদ ছুটে যান পাশের দেওয়ানপাড়া গ্রামে। গভীর ঘুম থেকে ডেকে তোলেন সিএনজি চালক শুক্কুরকে। পরিস্থিতির কথা শুনে তিনিও মানবিকতার ডাকে সাড়া দেন। এরপর শুরু হয় জীবনের জন্য দৌড়।

রাতের আঁধার চিরে দ্রুত সিএনজিতে করে প্রসূতি মা ও নবজাতককে নিয়ে যাওয়া হয় রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েই থেমে থাকেননি পুলিশ সদস্যরা। নিজেদের উদ্যোগে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র কিনে দেন, চিকিৎসা নিশ্চিত করেন। চিকিৎসকদের নিরলস চেষ্টায় অবশেষে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসে মা ও নবজাতক।

হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, আরও কিছু সময় দেরি হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারত। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মা ও শিশুর জীবন দুটোই ঝুঁকির মধ্যে ছিল।

ঘটনার পর পুরো এলাকায় প্রশংসায় ভাসছেন এএসআই জাহিদ ও তার টহল টিম। স্থানীয়রা বলছেন, পুলিশ সদস্যরা শুধু দায়িত্ব পালন করেননি, তারা একজন মায়ের জন্য অভিভাবকের মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আলম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেছেন, “পুলিশকে আমরা অনেক সময় ভয় পাই। কিন্তু সে রাতে তারা ফেরেশতার মতো এসেছে। না এলে হয়তো দুটি লাশ বের হতো সেই ক্লিনিক থেকে।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি ছড়িয়েছে ব্যাপকভাবে। অনেকেই লিখছেন, কঠোরতার আড়ালেও পুলিশের ভেতরে যে এক মানবিক হৃদয় আছে, এই ঘটনাই তার প্রমাণ।

রাত তিনটার সেই অন্ধকারে, যখন একটি পরিবার মৃত্যুর আতঙ্কে ভেঙে পড়েছিল, তখন কয়েকজন পুলিশ সদস্য মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে লিখেছেন মানবতার এক উজ্জ্বল গল্প। এক নবজাতকের প্রথম কান্না আর এক মায়ের বেঁচে থাকার পেছনে তাই আজ জড়িয়ে আছে, রামুর রাতের টহল পুলিশের নিঃস্বার্থ মানবিকতা।