দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি ট্রেনে পর্যটন নগরী কক্সবাজার যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন যাত্রীরা। তবে পথে রেললাইন ও স্টেশন থাকলেও অনেক এলাকার মানুষের সেই ট্রেনে ওঠার সুযোগ ছিল না। তাদের এলাকার ওপর দিয়ে ট্রেন ছুটে যেত কক্সবাজারের পথে, অথচ সেই ট্রেনে চড়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ ছিল না। এবার সেই আক্ষেপ ঘুচছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করা মহানগর এক্সপ্রেসের রুট সম্প্রসারণ করে আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর) থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এতে নতুন করে ১০টি উপজেলার যাত্রীরা নিজ এলাকার কাছের স্টেশন থেকেই সরাসরি কক্সবাজার যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
নতুন এই ব্যবস্থায় নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনী জেলার যাত্রীরা বিশেষভাবে উপকৃত হবেন। তাদের আর কক্সবাজার যাওয়ার ট্রেন ধরতে ঢাকার দিকে আসা কিংবা চট্টগ্রাম পর্যন্ত যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। নিজ এলাকার স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠে চট্টগ্রাম হয়ে সরাসরি কক্সবাজার পৌঁছাতে পারবেন তারা।
২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর কক্সবাজার এক্সপ্রেসের মাধ্যমে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়। প্রায় ৩৫ মাস পর মহানগর এক্সপ্রেসের রুট সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে কক্সবাজারে ট্রেনযাত্রার সুযোগ আরও বিস্তৃত হচ্ছে। আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করা ট্রেনটি এখন চট্টগ্রাম হয়ে পর্যটন নগরী কক্সবাজার পর্যন্ত যাবে।
মহানগর এক্সপ্রেস নতুন করে যাত্রাবিরতি দেবে নরসিংদী, ভৈরববাজার, আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, কসবা, কুমিল্লা, লাকসাম, নাঙ্গলকোট ও ফেনী স্টেশনে। এ ছাড়া ট্রেনটি ঢাকার বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম স্টেশনেও যাত্রাবিরতি থাকবে।
ফেনীর বাসিন্দা গাজী রাজ্জাক হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ফেনী থেকে সরাসরি রেলপথে কক্সবাজার যেতে পারা আমাদের জন্য খুবই আনন্দের। এটা ফেনীবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ছিল। অনেক দেরিতে হলেও এ সুবিধা পেতে যাচ্ছি আমরা। তবে যাত্রী চাহিদা বিবেচনা করে আসন সংখ্যা (সাধারণ এবং কেবিন) আরও বাড়ালে আমাদের খুশির মাত্রা বেশি হতো। আশা করছি কর্তৃপক্ষ ফেনীবাসী এ দাবিটিও বিবেচনায় নেবেন।
নতুন রুট উদ্বোধন উপলক্ষ্যে আজ সোমবার রাত ৮টায় দেশের প্রধান ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন (কমলাপুরে) অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
উদ্বোধন উপলক্ষ্যে সকালে ঢাকা ওয়াশপিটে রাখা মহানগর এক্সপ্রেসের রেক পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন, পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম, ঢাকা বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক এ বি এম কামরুজ্জামানসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন দুপুরে ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা সকালে মহানগর এক্সপ্রেসের রেক পরিদর্শন করেছি। কক্সবাজার যাওয়ার জন্য ট্রেনের রেক একেবারে প্রস্তুত আছে। আজ ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার আগে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে রেলপথ মন্ত্রী সার্বিক বিষয় নিয়ে জানাবেন।
কোন স্টেশন থেকে কক্সবাজারের জন্য কত আসন?
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজারের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে কক্সবাজার রুটে চলাচলের সময় মহানগর এক্সপ্রেস (৭২২) ট্রেনে মোট ৭০৬টি এবং কক্সবাজার থেকে ঢাকা রুটে চলাচলের সময় মহানগর এক্সপ্রেস (৭২১) ট্রেনে ৭৩৬টি আসন থাকবে।
ট্রেনটিতে শোভন চেয়ার (নন-এসি), স্নিগ্ধা (এসি), এসি বার্থ (রাতে শুয়ে যাওয়ার আসন) ও এসি সিট (দিনে বসে যাওয়ার আসন) শ্রেণির আসনের কোচ থাকবে। ট্রেনটির সাপ্তাহিক বন্ধ রোববার। সপ্তাহে ছয় দিন ঢাকা থেকে রাত সাড়ে ৮টায় এবং কক্সবাজার থেকে সকাল ৯টায় ট্রেনটি ছেড়ে যাবে।
ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে ঢাকা ও বিমানবন্দর স্টেশন থেকে এসি বার্থের ১২টি, স্নিগ্ধার ২৫টি এবং শোভন চেয়ারের ৫০টি আসন বরাদ্দ থাকবে। নরসিংদী থেকে এসি বার্থের ২টি, স্নিগ্ধার ১৫টি ও শোভন চেয়ারের ৩০টি আসন থাকবে। ভৈরববাজার থেকে এসি বার্থের ২টি, স্নিগ্ধার ১৫টি ও শোভন চেয়ারের ৪০টি আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
আশুগঞ্জ থেকে এসি বার্থের কোনো আসন থাকবে না। সেখান থেকে স্নিগ্ধার ৫টি ও শোভন চেয়ারের ১০টি আসন পাওয়া যাবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এসি বার্থের ৪টি, স্নিগ্ধার ১৫টি ও শোভন চেয়ারের ৫০টি আসন থাকবে। আখাউড়া থেকে এসি বার্থের আসন না থাকলেও স্নিগ্ধার ১০টি ও শোভন চেয়ারের ২০টি আসন বরাদ্দ রয়েছে।
কসবা থেকে শুধু শোভন চেয়ারের ১০টি আসন থাকবে। কুমিল্লা থেকে এসি বার্থের ৪টি, স্নিগ্ধার ১৫টি ও শোভন চেয়ারের ৪৫টি আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। লাকসাম থেকে এসি বার্থের আসন না থাকলেও স্নিগ্ধার ৫টি ও শোভন চেয়ারের ১৫টি আসন থাকবে। নাঙ্গলকোট থেকে শুধু শোভন চেয়ারের ৫টি আসন বরাদ্দ রয়েছে।
ফেনী থেকে এসি বার্থের ২টি, স্নিগ্ধার ১৫টি ও শোভন চেয়ারের ৩০টি আসন পাওয়া যাবে। সর্বশেষ স্টপেজ চট্টগ্রাম থেকে এসি বার্থের ১০টি, স্নিগ্ধার ১০০টি ও শোভন চেয়ারের ১৫৫টি আসন বরাদ্দ থাকবে। এ ছাড়া বাকি আসনগুলো অন্যান্য গন্তব্যের যাত্রীদের জন্য বরাদ্দ।
অন্যদিকে, কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফেরার পথে বিভিন্ন স্টেশনের জন্য আসন বরাদ্দেও শ্রেণিভেদে পার্থক্য রয়েছে। চট্টগ্রামের জন্য এসি সিটের ২১টি, স্নিগ্ধার ৬০টি ও শোভন চেয়ারের ১২৫টি আসন থাকবে। ফেনীর জন্য এসি সিটের ৬টি, স্নিগ্ধার ২০টি ও শোভন চেয়ারের ৪০টি আসন বরাদ্দ রয়েছে।
নাঙ্গলকোটের জন্য এসি সিট ও স্নিগ্ধার কোনো আসন নেই; শোভন চেয়ারের ৫টি আসন থাকবে। লাকসামের জন্য এসি সিটের ৩টি, স্নিগ্ধার ১৫টি ও শোভন চেয়ারের ৫টি আসন বরাদ্দ রয়েছে। কুমিল্লার জন্য এসি সিটের ৬টি, স্নিগ্ধার ২০টি ও শোভন চেয়ারের ৫০টি আসন থাকবে।
কসবা থেকে এসি সিটের আসন না থাকলেও স্নিগ্ধার ৫টি ও শোভন চেয়ারের ১০টি আসন পাওয়া যাবে। আখাউড়া থেকে এসি সিটের ৩টি, স্নিগ্ধার ১০টি ও শোভন চেয়ারের ২০টি আসন বরাদ্দ রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জন্য এসি সিটের ৬টি, স্নিগ্ধার ২০টি ও শোভন চেয়ারের ৬০টি আসন থাকবে।
আশুগঞ্জ থেকে এসি সিটের আসন না থাকলেও স্নিগ্ধার ১০টি ও শোভন চেয়ারের ১০টি আসন বরাদ্দ রয়েছে। ভৈরববাজার থেকে এসি সিটের ৬টি, স্নিগ্ধার ২০টি ও শোভন চেয়ারের ৩০টি আসন থাকবে। নরসিংদী থেকে এসি সিটের ৩টি, স্নিগ্ধার ২০টি ও শোভন চেয়ারের ৩০টি আসন বরাদ্দ রয়েছে। সর্বশেষ ঢাকা স্টেশনের জন্য এসি সিটের ১২টি, স্নিগ্ধার ২০টি ও শোভন চেয়ারের ৩০টি আসন থাকবে। বাকি আসনগুলো অন্যান্য গন্তব্যের জন্য বরাদ্দ।
বিভিন্ন স্টেশন থেকে কক্সবাজারের ভাড়া
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজারের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৫৮৩ কিলোমিটার। এ পথে মহানগর এক্সপ্রেসের শোভন চেয়ার শ্রেণির ভাড়া ৬৮৫ টাকা, স্নিগ্ধার ভাড়া ১ হাজার ৩১১ টাকা এবং এসি বার্থের ভাড়া ২ হাজার ৪০৮ টাকা।
নরসিংদী থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৫১৮ কিলোমিটার। এ পথে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৬১০ টাকা, স্নিগ্ধার ১ হাজার ১৬৮ টাকা এবং এসি বার্থের ভাড়া ২ হাজার ১৪৩ টাকা। ভৈরববাজার থেকে দূরত্ব ৪৮০ কিলোমিটার। এ পথে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৫৬৫ টাকা, স্নিগ্ধার ১ হাজার ৮১ টাকা এবং এসি বার্থের ভাড়া ১ হাজার ৯৮৮ টাকা।
আশুগঞ্জ থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৪৫৪ কিলোমিটার। এ পথে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৫৩৫ টাকা, স্নিগ্ধার ১ হাজার ২৪ টাকা এবং এসি বার্থের ভাড়া ১ হাজার ৮৮৫ টাকা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে দূরত্ব ৪৩৯ কিলোমিটার। এ পথে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৫১৫ টাকা, স্নিগ্ধার ৯৮৯ টাকা এবং এসি বার্থের ভাড়া ১ হাজার ৮২৭ টাকা।
আখাউড়া থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৪১৯ কিলোমিটার। এ পথে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৪৯৫ টাকা, স্নিগ্ধার ৯৪৩ টাকা এবং এসি বার্থের ভাড়া ১ হাজার ৭৪৭ টাকা। কসবা থেকে দূরত্ব ৪০৩ কিলোমিটার। এ পথে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৪৭৫ টাকা, স্নিগ্ধার ৯০৯ টাকা এবং এসি বার্থের ভাড়া ১ হাজার ৬৭৮ টাকা।
কুমিল্লা থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৩৭১ কিলোমিটার। এ পথে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৪৩৫ টাকা, স্নিগ্ধার ৮৩৪ টাকা এবং এসি বার্থের ভাড়া ১ হাজার ৫৫১ টাকা। লাকসাম থেকে দূরত্ব ৩৪৯ কিলোমিটার। এ পথে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৪১০ টাকা, স্নিগ্ধার ৭৮২ টাকা এবং এসি বার্থের ভাড়া ১ হাজার ৪৫৩ টাকা।
নাঙ্গলকোট থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৩৩৪ কিলোমিটার। এ পথে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৩৯৫ টাকা, স্নিগ্ধার ৭৫৪ টাকা এবং এসি বার্থের ভাড়া ১ হাজার ৪০২ টাকা। ফেনী থেকে দূরত্ব ৩০৩ কিলোমিটার। এ পথে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৩৫৫ টাকা, স্নিগ্ধার ৬৮৫ টাকা এবং এসি বার্থের ভাড়া ১ হাজার ২৭৫ টাকা।
সর্বশেষ, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ২০২ কিলোমিটার। এ পথে শোভন চেয়ারের ভাড়া ২৪০ টাকা, স্নিগ্ধার ৪৫৫ টাকা এবং এসি বার্থের ভাড়া ৮৬৭ টাকা।
সূত্র:ঢাকা পোস্ট
টিটিএন ডেস্ক: 























