কক্সবাজারের রামু উপজেলার বহুল আলোচিত গর্জনিয়া বাজারকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও রাজস্ব বেহাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ২৬ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব থাকা সত্ত্বেও গত এক বছরে সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে মাত্র ১ কোটি টাকার সামান্য বেশি। এমন তথ্য প্রকাশের পর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আর জোরালো হয়েছে জবাবদিহিতার দাবি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে (বাংলা ১৪৪২ সন) গর্জনিয়া বাজারটি সর্বোচ্চ ১৯ কোটি টাকায় নিলামে ওঠে। আয়কর ও ভ্যাটসহ দরদাতা তৌহিদুল ইসলাম প্রায় ২৬ কোটি টাকায় ইজারা গ্রহণ করেন।
তবে একটি মামলার অজুহাতে উপজেলা প্রশাসন নিলাম কার্যক্রম স্থগিত করে। পরে বাজারটি খাস কালেকশনের আওতায় নেওয়া হয়। আর এখান থেকেই শুরু হয় রাজস্ব আদায়ে অস্বাভাবিক পতন।
উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া হিসাব বলছে, বৈশাখ: ৬৭ লাখ ৯৮ হাজার ৬৭ টাকা, জৈষ্ঠ-আষাঢ়: ১৩ লাখ ৪৮ হাজার ৭৫০ টাকা, শ্রাবণ: ২ লাখ ২৬ হাজার ৫৫০ টাকা, ভাদ্র: ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা, আশ্বিন-কার্তিক: ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা, অগ্রহায়ণ: ২ লাখ ৫১ হাজার টাকা, পৌষ: ২ লাখ ১ হাজার ৮৪০ টাকা, মাঘ: ১ লাখ ৭৪ হাজার ৩৮০ টাকা, ফাল্গুন: ২ লাখ ১৫ হাজার ১৮০ টাকা, চৈত্র (২২ দিন): ৭৭ হাজার ২৬০ টাকা। সব মিলিয়ে ১২ মাসে মোট আদায় হয়েছে ১ কোটি ২৩ হাজার ২৭ টাকা।
এখানে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, শুধু বৈশাখ মাসেই আদায় হয়েছে প্রায় ৬৮ লাখ টাকা। অথচ পরবর্তী ১১ মাসে মোট আদায় মাত্র ৩২ লাখ টাকার কিছু বেশি। এই বড় ধরনের বৈষম্য প্রশাসনিক দুর্বলতা বা রাজস্ব নয়ছয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের দাবি, গর্জনিয়া বাজারে সপ্তাহে দুই দিন বড় হাট বসে। প্রতিটি হাট থেকে কয়েক লাখ টাকা করে আদায় হওয়ার কথা। কিন্তু সেই অর্থের বড় একটি অংশ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না।
ব্যবসায়ী মো. শাহেদ বলেন, “হাটে লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয়। কিন্তু সরকারের হিসাবে তা দেখা যায় না।”
এদিকে প্রশাসন সীমান্ত চোরাচালান ঠেকানোর অজুহাতে গরুর বাজার বন্ধ রাখলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন শত শত গরু প্রবেশ করছে।
তাদের মতে, শুধু গরুর হাট থেকেই প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১০ লাখ টাকার বেশি সম্ভাব্য রাজস্ব বেহাত হচ্ছে।
বর্তমানে উপজেলা প্রশাসন সরাসরি গর্জনিয়া তহসিল অফিসের মাধ্যমে হাসিল আদায় করছে। তবে জনবল সংকটের কারণে এত বড় বাজার থেকে নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে রাজস্ব আদায় সম্ভব হচ্ছে না।
এই সুযোগে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়ভাবে সরকারদলীয় অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানা গেছে।
এদিকে, পরিস্থিতিকে আরও রহস্যজনক করে তুলেছে চলতি বাংলা ১৪৩৩ সনের দরপত্র তালিকা। সেখানে গর্জনিয়া বাজারের নামই রাখা হয়নি। একটি উচ্চমূল্যের বাজারকে কেন নিয়মিত ইজারার আওতায় না এনে বারবার খাস কালেকশনের মাধ্যমে পরিচালনা করা হচ্ছে এই প্রশ্ন এখন সর্বত্র।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, হাইকোর্টের নির্দেশনা এক বছরের জন্য কার্যকর ছিল এবং তা পরে আর বাড়ানো হয়নি। সেই মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কেন নতুন করে নিলাম ডাকা হয়নি। তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আইনজীবী শিপ্ত বড়ুয়া বলেন, “২৬ কোটির সম্ভাব্য রাজস্বের একটি বাজার যখন মাত্র ১ কোটিতে পরিচালিত হয়, তখন এটি শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়। এটি বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন। রাষ্ট্র হারছে, কারা লাভবান হচ্ছে, তা তদন্ত করা জরুরি।”
এব্যাপারে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফজলে রাব্বানী চৌধুরী বলেন, “আমি যোগদানের আগে থেকেই আইনি জটিলতার কারণে নিলাম স্থগিত রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী বাজারটি খাস কালেকশনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। গত বছরে মোট ১ কোটি ২৭ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে।”
শিপ্ত বড়ুয়ার ভাষ্য, সব মিলিয়ে গর্জনিয়া বাজার এখন শুধু একটি বাজার নয়। এটি পরিণত হয়েছে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার বড় প্রশ্নে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে স্থানীয় মানুষ, আর অপেক্ষা করছে কার্যকর তদন্ত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের।
বিশেষ প্রতিবেদক 























