টেকনাফের পাহাড়ঘেঁষা বাহারছড়া এলাকায় অপহরণ, মাদক ও মানবপাচার দমনে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর পাহাড়ে পরিচালিত অভিযানের আদলে বিশেষ যৌথ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অপহরণপ্রবণ (হটস্পট) এলাকায় পুলিশ চৌকি স্থাপন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে চিরুনি অভিযান জোরদার এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে অনিয়ন্ত্রিত চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
শনিবার টেকনাফে জেলা ও উপজেলার শীর্ষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত চার ঘণ্টাব্যাপী বিশেষ আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এসব সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব উঠে আসে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী। সভায় বিজিবি রামু সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ, জেলা পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান, র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুস্তাফিজুর রহমান, টেকনাফের ইউএনও এস. এম. অনীক চৌধুরীসহ জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় অংশ নেওয়া এক সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাদক, মানবপাচার ও অপহরণ প্রতিরোধে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব এসেছে। আলোচনায় বাহারছড়া এলাকার অপহরণ ও মুক্তিপণ-বাণিজ্যের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কয়েকজন অংশগ্রহণকারী এলাকাটির বর্তমান অবস্থার সঙ্গে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর পাহাড়ে একসময়ে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী আস্তানার তুলনা করেন। এ কারণে বাহারছড়াকে অপহরণ ও সশস্ত্র সন্ত্রাসমুক্ত করতে সলিমপুরে পরিচালিত অভিযানের আদলে দ্রুত সমন্বিত যৌথ অভিযান চালানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি অপহরণপ্রবণ এলাকায় পুলিশ চৌকি স্থাপন ও টহল জোরদারের প্রস্তাবও এসেছে।
বৈঠক শেষে এমপি শাহজাহান চৌধুরী বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে সংঘটিত অপহরণ, মাদক ও অন্যান্য অপরাধ দমনে করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যেই এই বিশেষ আইনশৃঙ্খলা সভা হয়েছে। খুব শিগগিরই অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বাহারছড়াসহ অপহরণপ্রবণ এলাকায় অপরাধ দমনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সহজে জামিনে বের হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়ানোর সুযোগ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে টেকনাফকে অপরাধমুক্ত, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জনপদ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন বলেন, সভায় বাহারছড়াবাসীকে অপহরণ আতঙ্ক থেকে মুক্ত করতে একটি যৌথ বাহিনী গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছি। পাশাপাশি অপহরণ স্পটে চৌকি স্থাপনের কথা তুলে ধরেছি। অন্যথায় এটি রোধ করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও জানান, অপহরণকারী ও মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান পরিচালনার আশ্বাস দিয়েছে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের তথ্যমতে, গত তিন বছরে টেকনাফের বাহারছড়াসহ পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় অন্তত ৩২০ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। গত এক বছরেই ১৫টি ঘটনায় অপহৃত হন প্রায় ১৫৫ জন, যাদের মধ্যে ৯৬ জন রোহিঙ্গা। একই সময়ে হত্যা, গুলিবর্ষণ ও লাশ উদ্ধারের ঘটনাও বেড়েছে। সর্বশেষ গত এক সপ্তাহ আগে অপহৃত হওয়া বাহারছড়ার পল্লী চিকিৎসক কামাল উদ্দিন এখনো উদ্ধার হননি।
টেকনাফ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জিহাদ বলেন, সভায় তিনি রোহিঙ্গাদের যানবাহন ও বাড়ির মালিকানা এবং মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহারে কড়া নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের শনাক্তে টেকনাফের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পুনরায় যাচাইয়েরও আহ্বান জানান।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















