কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণার পরপরই জেলায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের ক্ষোভ, হতাশা ও বঞ্চনার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে, যা সংগঠনের ভেতরের বাস্তব চিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
কমিটি ঘোষণার পর সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক পোস্টে উঠে এসেছে ত্যাগের স্বীকৃতি না পাওয়া, পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত এবং নেতৃত্ব বাছাইয়ে প্রভাবশালী বলয়ের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ।
জেলা ছাত্রদলের এক পদপ্রত্যাশী মিজানুল আলম লিখেছেন,“আপনারা আমি এতিমকে অন্যায়ভাবে হারিয়ে দিলেন।”
আরেক পদপ্রত্যাশী সাইফুর রহমান নয়ন তার পোস্টে উল্লেখ করেন,“এমপি কাজল ভাইয়ের অনুসারী হয়ে ছাত্রদল করায় জেলা কমিটি থেকে বাদ পড়লাম। আমাদের ত্যাগ, পরিশ্রম, সময়-সবকিছুই কি মূল্যহীন?”
হুমায়ুন কবির হিমু লিখেছেন, “লাইফ রিক্স নিয়ে দলের দুঃসময়ে কেন্দ্রীয় ঘোষিত কর্মসূচি পালন, এমপি লুৎফুর রহমান কাজল অনুসারী হয়ে রাজনীতি করাই মনে হয় আমাদের বোকামি ছিল।” তিনি আরও লিখেন,“পদ-পদবীর দরকার নাই, আজীবন পাশে আছি।
ইনজামামুল হক আবেগঘন ভাষায় লেখেন,
“আমার মায়ের চোখের পানি-এটাই আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট… আমার সাথে যে অন্যায়টা হয়েছে, তার বিচার আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলাম… আমি থামিনি, থামবো না।”
আবু বক্কর ছিদ্দিক লিখেছেন,
“উপরে একজন আল্লাহ আছে, ভুলে গেলে চলবে না। ক্ষমতার দাম্ভিকতা আর কত?”
এ ধরনের অসংখ্য প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট হয়েছে, কমিটি গঠন নিয়ে তৃণমূলের পদপ্রত্যাশী একটি অংশ সন্তুষ্ট নয়।
এই বিতর্কের আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ কক্সবাজার জেলা শাখার আংশিক কমিটি অনুমোদন দেয়। শনিবার (০২ মে) ঘোষিত এ কমিটিতে সভাপতি করা হয়েছে ফাহিমুর রহমানকে এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন মোহাম্মদ সাঈদ আনোয়ার।
এছাড়া সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হোসেন মাদু, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহেদ নুর জিতু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মুহাম্মাদ সালমান বাপ্পি এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফ ইমরান দায়িত্ব পেয়েছেন।
কেন্দ্রীয় সভাপতি মোঃ রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নবঘোষিত সভাপতি ফাহিমুর রহমান জানায়, “ঐক্যবদ্ধভাবে ছাত্রদলকে এগিয়ে নেব।”
সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সাঈদ আনোয়ার বলেন, “এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করবো।” তিনি আরও যোগ করেন, “আগে গ্রুপিং ছিল, এখন আমরা গ্রুপিং বাদ দিয়ে কাজ করতে চাই।”
তবে এই ঐক্যের বার্তার বিপরীতে তৃণমূলের একাংশের প্রতিক্রিয়ায় উঠে এসেছে ভিন্ন বাস্তবতা। অনেকেই মনে করছেন, কমিটি গঠনে এখনো পুরনো গ্রুপভিত্তিক সমীকরণ পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজারে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতার অনুসারীদের মধ্যে বিভক্তি ছিল দৃশ্যমান। সাম্প্রতিক সময়ে তা কিছুটা কমে এলেও নতুন কমিটি ঘোষণার পর আবারও সেই বিভক্তির ইঙ্গিত মিলছে।
সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই দাবি করছেন, একটি নির্দিষ্ট বলয়ের অনুসারীরা কমিটিতে প্রাধান্য পেয়েছেন, অন্য অংশ উপেক্ষিত হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে দলীয়ভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে সদর–রামু আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলকে একটি ভিড়িও বার্তায় বলতে শোনা গেছে “জেলা ছাত্রদলের সদ্য ঘোষিত কমিটি নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।”
বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র সংগঠনের কমিটি গঠনকে ঘিরে ক্ষোভ-প্রতিক্রিয়া নতুন কিছু নয়। তবে এবার সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্য ও ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া সংগঠনের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
একদিকে নতুন নেতৃত্ব ঐক্যের বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে তৃণমূলের একটি অংশ নিজেদের বঞ্চিত মনে করছে-এই দ্বৈত বাস্তবতা ভবিষ্যতে সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন। এই প্রক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের কতটা সম্পৃক্ত করা যায় এবং সাংগঠনিক ভারসাম্য কতটা রক্ষা করা সম্ভব-সেদিকেই নজর থাকবে দলের অনেকেরই এমনটাই অভিমত।
সব মিলিয়ে, কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি যেমন নতুন নেতৃত্বের সূচনা করেছে, তেমনি ভেতরের অমীমাংসিত সমীকরণও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















