ঢাকা ১০:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
টেকনাফে যৌথবাহিনীর চিরুনি অভিযান: অপহরণ চক্র ও পাহাড়ে সন্ত্রাস দমনে তৎপরতা জোরদার আগুন দেখতে গিয়ে প্রাণ গেল শিশু রাইয়ানের সংকটেও বিদ্যুৎ গিলছে টমটম-ইজিবাইক স্লোগান, সুবিধা ও বাস্তবতার রাজনীতি নিখোঁজ সন্ন্যাসীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার কারচুপির অভিযোগে হামিদুর রহমানের মামলা: কক্সবাজার-২ আসনের নির্বাচনী নথি হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ শুভেচ্ছা দূত হিসেবে ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে তাহসানের চুক্তি নবায়ন ঈদগড়ের ইউপি সদস্য অপহৃত, মুক্তিপণ দাবি চকরিয়ায় বেড়িবাঁধ থেকে যুবকের মরদেহ উদ্ধার প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের পাটজাত ব্যাগ এবং স্কুল ড্রেস দেবে সরকার অভাব ও অন্ধকার ভবিষ্যৎ রোহিঙ্গাদের সমুদ্রে ঠেলে দিচ্ছে ‘ভাগ্যের জুয়ায়’ টেকনাফের হ্নীলায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: পুড়ে ছাই ১০-১২টি বসতবাড়ি কক্সবাজার শহরে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ১ সাত বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণ, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার পাচারকারীর ফেলে যাওয়া বস্তায় ১৮ কেজি গাঁজা

সংকটেও বিদ্যুৎ গিলছে টমটম-ইজিবাইক

বৈশাখের তীব্র তাপদাহে যখন দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে জনজীবন অতিষ্ঠ, তখন বিদ্যুৎ সংকট যেন পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে। দিন-রাত মিলিয়ে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং, জাতীয় গ্রিড থেকে কম সরবরাহ, উৎপাদন ঘাটতি। সব মিলিয়ে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এক ধরনের নীরব বিপর্যয়। এর মধ্যেই শহরে চলাচল করা হাজার হাজার টমটম ও ইজিবাইকের ব্যাটারি চার্জ দিতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হওয়ায় সংকট আরও তীব্র হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) কক্সবাজারের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৪৫ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ৩০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় গ্রামীণ এলাকায় চাহিদা প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে গড়ে ১০০ মেগাওয়াটের মতো। সব মিলিয়ে কক্সবাজার জেলায় মোট চাহিদা প্রায় ১৯০ মেগাওয়াট হলেও ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বড় একটি অংশ।

পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গনি বলেন, “জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি খুরুশকুল উইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে যে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, সেটিও পুরোপুরি বাতাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দিনের পিক আওয়ারে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।”

টানা লোডশেডিংয়ে স্থবির জনজীবন :

শহর এলাকায় প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। উপজেলাগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। অনেক জায়গায় ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে। দিন ও রাতের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎহীনতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে প্রায় ২৮ লাখ স্থানীয় মানুষ এবং ১৫ লাখ রোহিঙ্গা।

কক্সবাজার শহরের বার্মিজ মার্কেট এলাকার গৃহিনী আসমা বেগম বলেন, “দিনের বেলায় গরমে থাকা যায় না। আবার রাতেও অন্ধকারে কাটাতে হয়। ঘনঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় ফ্রিজ, টিভিসহ অনেক জিনিস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”

কক্সবাজার সদরের লিংক রোড এলাকার বাসিন্দা আকবর অভিযোগ করেন, “বিদ্যুৎ বিতরণে বৈষম্য আছে। কিছু ভবনে অবৈধভাবে দ্বৈত সংযোগ দেওয়া হয়েছে, আর সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে।”

টমটম-ইজিবাইকের বাড়তি চাপ :

এই সংকটের মধ্যেই শহরের প্রায় ২৩ হাজার টমটম ও ইজিবাইক প্রতিদিন ব্যাটারি চার্জ দিতে ২ থেকে ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করছে। অথচ এসব বাহনের অনুমোদিত সংখ্যা এর এক-চতুর্থাংশেরও কম।

শহরের ঝাউতলা, কলাতলী, বাস টার্মিনাল, সমিতিপাড়া, বৈদ্যঘোনা, পাহাড়তলীসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অন্তত ৩০০টির বেশি ব্যাটারি চার্জিং গ্যারেজ। এর মধ্যে অনেক গ্যারেজে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং ব্যবস্থাই শহরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

পর্যটন শিল্পে ধসের আশঙ্কা :

বিদ্যুৎ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে পর্যটন খাতে। সৈকত এলাকার পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও গেস্টহাউসে বিদ্যুৎ না থাকায় পর্যটকেরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেকেই বুকিং বাতিল করে ফিরে যাচ্ছেন।

হোটেল ব্যবসায়ী মুকিম খান বলেন, “দিনে তিন থেকে পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যায়। জেনারেটর চালাতে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”

হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি হাজী আবুল কাশেম সিকদার বলেন, “একদিকে বিদ্যুৎ নেই, অন্যদিকে জ্বালানির দাম বেশি। পুরো পর্যটন খাত বড় সংকটে পড়েছে।”

জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত কৃষি :

বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের ঘাটতি। ফলে জেলার ৭ হাজার ১৪৬টি সেচ পাম্পের মধ্যে ৪ হাজার ২০০টির বেশি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে অন্তত ২৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান চাষ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।

চকরিয়া উপজেলার খুটাখালি ইউনিয়নের কৃষক সাঈদুল ইসলাম আলম বলেন, “এক মাস ধরে পাম্প চালাতে পারছি না। এই অবস্থা চললে ধানগাছ বাঁচানো যাবে না।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, চলমান সংকট অব্যাহত থাকলে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিপাকে :

লোডশেডিংয়ের কারণে বরফকল, চিংড়ি হ্যাচারি, পোলট্রি খামারসহ হাজারো ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে পড়ছে। কক্সবাজার পোলট্রি ফার্ম মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দুই হাজারের বেশি খামার বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে প্রায় ১৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে।

উৎপাদন ঘাটতির কারণ :

১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মাতারবাড়ি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কয়লা সংকটে পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে ১৫০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াটে। জাতীয় গ্রিড থেকেও চাহিদামতো বিদ্যুৎ সরবরাহ মিলছে না।

এছাড়া নবায়নযোগ্য উৎস হিসেবে খুরুশকুল উইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে যে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, তা পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

বাড়ছে অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতা :

দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকার কারণে শহরের বিভিন্ন এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি।

সমাধান কোথায় ?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, তিন চাকার যান নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না করলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে কক্সবাজার যেন একসঙ্গে তিনটি সংকটে জর্জরিত- বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও যানজট। এই ত্রিমুখী চাপ দ্রুত নিরসন না হলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রটির অর্থনীতি ও জনজীবন দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।”

এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মান্নান দাবি করেন, “জ্বালানি সংকট একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এটি যতটা সাশ্রয়ী হয়ে মোকাবেলা করা যায়, সে ব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ে কার্যকরে আমাদের কার্যক্রম চলছে। আর অবৈধ বৈদ্যুতিক বাহন সড়কে চলাচল বন্ধে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।”

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

সংকটেও বিদ্যুৎ গিলছে টমটম-ইজিবাইক

আপডেট সময় : ০৭:৪২:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬

বৈশাখের তীব্র তাপদাহে যখন দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে জনজীবন অতিষ্ঠ, তখন বিদ্যুৎ সংকট যেন পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে। দিন-রাত মিলিয়ে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং, জাতীয় গ্রিড থেকে কম সরবরাহ, উৎপাদন ঘাটতি। সব মিলিয়ে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এক ধরনের নীরব বিপর্যয়। এর মধ্যেই শহরে চলাচল করা হাজার হাজার টমটম ও ইজিবাইকের ব্যাটারি চার্জ দিতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হওয়ায় সংকট আরও তীব্র হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) কক্সবাজারের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৪৫ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ৩০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় গ্রামীণ এলাকায় চাহিদা প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে গড়ে ১০০ মেগাওয়াটের মতো। সব মিলিয়ে কক্সবাজার জেলায় মোট চাহিদা প্রায় ১৯০ মেগাওয়াট হলেও ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বড় একটি অংশ।

পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গনি বলেন, “জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি খুরুশকুল উইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে যে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, সেটিও পুরোপুরি বাতাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দিনের পিক আওয়ারে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।”

টানা লোডশেডিংয়ে স্থবির জনজীবন :

শহর এলাকায় প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। উপজেলাগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। অনেক জায়গায় ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে। দিন ও রাতের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎহীনতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে প্রায় ২৮ লাখ স্থানীয় মানুষ এবং ১৫ লাখ রোহিঙ্গা।

কক্সবাজার শহরের বার্মিজ মার্কেট এলাকার গৃহিনী আসমা বেগম বলেন, “দিনের বেলায় গরমে থাকা যায় না। আবার রাতেও অন্ধকারে কাটাতে হয়। ঘনঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় ফ্রিজ, টিভিসহ অনেক জিনিস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”

কক্সবাজার সদরের লিংক রোড এলাকার বাসিন্দা আকবর অভিযোগ করেন, “বিদ্যুৎ বিতরণে বৈষম্য আছে। কিছু ভবনে অবৈধভাবে দ্বৈত সংযোগ দেওয়া হয়েছে, আর সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে।”

টমটম-ইজিবাইকের বাড়তি চাপ :

এই সংকটের মধ্যেই শহরের প্রায় ২৩ হাজার টমটম ও ইজিবাইক প্রতিদিন ব্যাটারি চার্জ দিতে ২ থেকে ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করছে। অথচ এসব বাহনের অনুমোদিত সংখ্যা এর এক-চতুর্থাংশেরও কম।

শহরের ঝাউতলা, কলাতলী, বাস টার্মিনাল, সমিতিপাড়া, বৈদ্যঘোনা, পাহাড়তলীসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অন্তত ৩০০টির বেশি ব্যাটারি চার্জিং গ্যারেজ। এর মধ্যে অনেক গ্যারেজে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং ব্যবস্থাই শহরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

পর্যটন শিল্পে ধসের আশঙ্কা :

বিদ্যুৎ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে পর্যটন খাতে। সৈকত এলাকার পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও গেস্টহাউসে বিদ্যুৎ না থাকায় পর্যটকেরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেকেই বুকিং বাতিল করে ফিরে যাচ্ছেন।

হোটেল ব্যবসায়ী মুকিম খান বলেন, “দিনে তিন থেকে পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যায়। জেনারেটর চালাতে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”

হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি হাজী আবুল কাশেম সিকদার বলেন, “একদিকে বিদ্যুৎ নেই, অন্যদিকে জ্বালানির দাম বেশি। পুরো পর্যটন খাত বড় সংকটে পড়েছে।”

জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত কৃষি :

বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের ঘাটতি। ফলে জেলার ৭ হাজার ১৪৬টি সেচ পাম্পের মধ্যে ৪ হাজার ২০০টির বেশি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে অন্তত ২৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান চাষ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।

চকরিয়া উপজেলার খুটাখালি ইউনিয়নের কৃষক সাঈদুল ইসলাম আলম বলেন, “এক মাস ধরে পাম্প চালাতে পারছি না। এই অবস্থা চললে ধানগাছ বাঁচানো যাবে না।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, চলমান সংকট অব্যাহত থাকলে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিপাকে :

লোডশেডিংয়ের কারণে বরফকল, চিংড়ি হ্যাচারি, পোলট্রি খামারসহ হাজারো ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে পড়ছে। কক্সবাজার পোলট্রি ফার্ম মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দুই হাজারের বেশি খামার বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে প্রায় ১৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে।

উৎপাদন ঘাটতির কারণ :

১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মাতারবাড়ি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কয়লা সংকটে পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে ১৫০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াটে। জাতীয় গ্রিড থেকেও চাহিদামতো বিদ্যুৎ সরবরাহ মিলছে না।

এছাড়া নবায়নযোগ্য উৎস হিসেবে খুরুশকুল উইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে যে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, তা পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

বাড়ছে অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতা :

দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকার কারণে শহরের বিভিন্ন এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি।

সমাধান কোথায় ?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, তিন চাকার যান নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না করলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে কক্সবাজার যেন একসঙ্গে তিনটি সংকটে জর্জরিত- বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও যানজট। এই ত্রিমুখী চাপ দ্রুত নিরসন না হলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রটির অর্থনীতি ও জনজীবন দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।”

এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মান্নান দাবি করেন, “জ্বালানি সংকট একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এটি যতটা সাশ্রয়ী হয়ে মোকাবেলা করা যায়, সে ব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ে কার্যকরে আমাদের কার্যক্রম চলছে। আর অবৈধ বৈদ্যুতিক বাহন সড়কে চলাচল বন্ধে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।”