বৃহস্পতিবার মানেই কারও কারও কাছে চাঁদরাত।কর্মজীবী মানুষদের জন্য এই দিনটি যেন একটা বিশেষ দিন। মনে হয় পুরো জাতি দিনটিকে নিয়ে একই আবেগে আক্রান্ত।
এ রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই নিউজ ফিডে ভেসে আসতে থাকে বিশেষ এক ধরনের পোস্ট। কেউ লিখেন— ‘মহান বৃহস্পতিবারের শুভেচ্ছা!’ আবার কেউ লিখেন— ‘আজ মহান বৃহস্পতিবার’।
সোমবার যে মানুষটি এক্সেল শিট দেখে জীবনের সব স্বপ্ন হারিয়ে ফেলেছিলেন, বৃহস্পতিবার দুপুরের পর তাকেই হঠাৎ প্রাণবন্ত লাগে। অফিস শেষে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার তাড়া নেই, অফিসের মেইল এলেও বুক ধড়ফড় করে না, অ্যালার্ম দেয়ার তাড়া নেই। ‘পরের দিনই তো ছুটি’—এই একটি বাক্য কর্মজীবী মানুষের সবচেয়ে বড় মানসিক ওষুধ।
বৃহস্পতিবারে বস হঠাৎ নতুন কাজ দিলেও মানুষ ভাবে, ‘ঠিক আছে, পরশু দেখা যাবে।’ ট্রাফিকে দুই ঘণ্টা আটকে থাকলেও কেউ খুব একটা বিরক্ত হন না। কারণ বৃহস্পতিবারের ট্রাফিকও এক ধরনের রোমাঞ্চকর কষ্ট। বাসার পথে যেতে যেতে মানুষের মাথায় তখন শুধু একটাই চিন্তা—আজ রাতে আর তাড়াতাড়ি ঘুমাতে হবে না।
বৃহস্পতিবার বিকেলেই দেখা যায় কেউ চুপচাপ ট্যুরের প্ল্যান করছে।কেউ বন্ধুকে মেসেজ দিচ্ছে, ‘আজকে বের হবি?’, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করার পরিকল্পনা করেন। আবার কেউ কাজের ভান করে ইউটিউবে বেস্ট উইকেন্ড মুভিজ সার্চ করছে। যে মানুষটি পুরো সপ্তাহ গম্ভীর ছিলেন, বৃহস্পতিবার রাতে তিনিও হঠাৎ করে হাসিখুশি হয়ে যান। যেন জীবনের সব কাজ সাময়িকভাবে মওকুফ হয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার রাত মধ্যবিত্তদের ‘স্বাধীনতা দিবস’
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত জীবনে খুব বড় আনন্দের সুযোগ কম। বছরে দুইবার ঈদ, কয়েকটা সরকারি ছুটি, আর সপ্তাহ শেষে এই বৃহস্পতিবার রাত। এই রাতেই মানুষ নিজের মতো বাঁচতে চায়। কেউ রাত জেগে সিরিজ দেখে,কেউ ছাদে উঠে গান শোনে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের দোকানে বসে পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান করে ফেলে। আবার কেউ শুধু এই ভেবেই শান্তি পায় যে, আগামীকাল সকাল সকাল অ্যালার্ম দিয়ে ঘুম থেকে উঠতে হবে না।
স্যোশাল মিডিয়ায় কেন আলোচনায় বৃহস্পতিবার
আজকাল মানুষ ক্লান্ত, ভয়ঙ্কর রকমের ক্লান্ত। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ, ট্রাফিক, টেনশন, টার্গেট, ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা সব মিলিয়ে মানুষ যেন এক অদৃশ্য চাকার মধ্যে আটকে গেছে। এই ব্যস্ত জীবনে বৃহস্পতিবার হয়ে উঠেছে ছোট্ট এক মানসিক আশ্রয়, একদিনের জন্য হলেও মানুষ মনে করতে চায় জীবন শুধু অফিস, কাজ আর দায়িত্ব নয়। তাই বৃহস্পতিবার এলেই মানুষ মজা করে একে ‘মহান’ বলে।
বৃহস্পতিবার রাতের কিছু অলিখিত সত্য
এ রাতে ডায়েট করার পরিকল্পনা ভেঙে যায়। ‘আজকে তাড়াতাড়ি ঘুমাবো’, বলা মানুষরাই রাত ৩টা পর্যন্ত নিশ্চিন্তে রিলস দেখে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই রাতে মানুষ হঠাৎ করেই জীবনের প্রতি একটু বেশি ইতিবাচক হয়ে যায়।কারণ তারা জানে, অন্তত একদিনের জন্য হলেও সে একটু বিশ্রাম পাবে।
এ বিষয়ে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী নেহাল বলেন, ‘বৃহস্পতিবার মূলত চাকরিজীবীদের জন্য চাঁদরাতের মতো। ঈদের আগের রাতে যেমন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলে। বৃহস্পতিবার অফিসে থাকা অবস্থায়ই সেই ধরনের অনুভূতি তৈরি হয়। কখন অফিস ছুটি হবে, কখন বাসায় যাওয়া হবে ভেবে শুরু হয় সেই তোড়জোড়। কেউ কেউ যান গ্রামের বাড়ি, কেউ যান একদিনের ট্যুরে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মাতেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে কাটান একান্তে সময়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাতে সিনেমা প্রেমীরা বসেন প্রিয় সিরিজ নিয়ে, শখের রাঁধুনীরা আবার প্ল্যান করেন ছুটির দিনে কী কী রান্না করবেন সেগুলো নিয়ে।’
বৃহস্পতিবারকে ‘মহান’ বলাটা কোনো সরকারি উপাধি নয়। কোনো ইতিহাসের বইয়েও লেখা নেই। তবু কর্মজীবী মানুষ নিজেরাই বৃহস্পতিবারকে ‘মহান’ বানিয়ে ফেলেছে। কারণ এই দিনটি তাদের মানসিকভাবে বাঁচিয়ে রাখে।
বাস্তবতা যত কঠিনই হোক, মানুষ এখনও ছোট ছোট আনন্দ খুঁজে নিতে জানে। আর সেই ছোট আনন্দগুলোর মধ্যেই সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম,‘মহান বৃহস্পতিবার’।
সুত্র: স্টার নিউজ
টিটিএন ডেস্ক 



















