ঢাকা ০৩:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
দিল্লিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আটক মক্কা-মদিনার প্রশ্নে আপস নয়, মক্কা প‌্যা‌ক্টে যোগ দি‌তে আগ্রহী বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় আটক ৩ ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে আটক করল পুলিশ ট্রাম্পের নেভি-ব্লু স্যুট তৈরি নারায়ণগঞ্জের আদমজীতে সাগরে ১৩ অক্টোবরের মধ্যে লঘুচাপ সৃষ্টির আভাস শখের মাছ চাষে বিষ প্রয়োগ, লাখ টাকার ক্ষতি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাবেক সাধারণ সম্পাদক রোটনের মৃত্যু হোয়াইক্যংয়ে ট্রাক-সিএনজি সংঘর্ষে চালক নিহত, নারীসহ আহত ৫ আজ মহালয়া, দেবীপক্ষের সূচনায় শারদীয় দুর্গোৎসবের শুরু কক্সবাজারে বিপাকে সেই টুকু দ্য আগলি, স্কুটিতেও গুণেছেন ১৮ হাজার জরিমানা! সৌদি আরবে মৃত্যুর তিন সপ্তাহ পর দেশে এলো মনছুর আলমের মরদেহ, সকাল ১১টায় জানাজা গোমাতলী ভূমিহীন কৃষি সমবায় সমিতির নির্বাচন ঘিরে ইউএনওর ৮ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তিতে ৯ অক্টোবরের সংবাদ! কক্সবাজারের সমালোচনা হোক, অপপ্রচার নয় রামুতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত আসামি গ্রেফতার

শহীদ ইশমামের ২য় মৃত্যুবার্ষিকী : ছেলের ছবির সামনে মায়ের আহাজারি, মামলার রায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল আন্দোলনের রাজপথে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন লোহাগাড়ার তরুণ ইশমামুল হক।

৭ আগস্ট তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পরিবারের কাছে তিনি এখনও যেন ঘরেরই একজন—যে কোনো মুহূর্তে দরজা খুলে ফিরে আসবেন।তবে সেই অপেক্ষা আর ফুরোয়নি। এরই মধ্যে মামলার রায় হলেও তা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন স্বজনেরা।

ইশমামুল হক চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের দর্জিপাড়ার বাসিন্দা। তিনি প্রয়াত নুরুল হকের ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন মেজ।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ঢাকার চকবাজার থেকে শাহবাগমুখী ছাত্র-জনতার মিছিলে অংশ নেন ১৭ বছর বয়সী ইশমাম। মিছিলটি চানখাঁরপুল এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ গুলি চালায়। এ সময় পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৪টায় তাঁর মৃত্যু হয়।

ইশমামের বাবা নুরুল হক ২০১৭ সালে মারা যান। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে তাঁর পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে ২০২৩ সালে ঢাকায় গিয়ে চকবাজারের একটি জুয়েলারি দোকানে মাসিক চার হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন। অল্প আয়ের বড় একটি অংশ নিয়মিত মায়ের কাছে পাঠিয়ে সংসারের খরচে সহায়তা করতেন।

বৃহস্পতিবার ( ৬ আগস্ট ) রাতে ইসমামের বাসায় গিয়ে দেখা যায় মা শাহেদা বেগম এখনও ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আন্দোলনের পুরো সময়ই সে রাজপথে ছিল। ৫ আগস্ট সকালেও মিছিলে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর খবর পাই, ও গুলিবিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু সেদিন যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় লোহাগাড়া থেকে ঢাকায় যেতে পারিনি। পরদিন হাসপাতালে পৌঁছাই। আর তার পরদিনই আমার ছেলেটা চলে গেল।

তিনি বলেন, দুই বছর হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও মনে হয় দরজা খুলে আমার ছেলেটা ঘরে ঢুকবে। একজন মা সন্তানের মৃত্যু কোনো দিন ভুলতে পারে না। ছেলের ছবির দিকে তাকালেই শহীদ ইশমামের মায়ের চোখে অশ্রু নেমে আসে। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সন্তানের শূন্যতা আজও তাঁকে প্রতিনিয়ত কাঁদায়। বুকভরা স্মৃতি আর অসীম বেদনা নিয়েই তিনি এখনো ছেলের ছবিকে বুকে জড়িয়ে চোখের জল ফেলেন।

ইশমামের বড় ভাই মুহিবুল হক বলেন, ইশমাম শুধু আমার ছোট ভাই ছিল না, সে ছিল আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা। অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল। নিজের প্রয়োজন কমিয়ে মায়ের জন্য টাকা পাঠাত। আন্দোলনে যাবে জানতাম, কিন্তু কখনো ভাবিনি সে আর ফিরে আসবে না। দুই বছর কেটে গেলেও প্রতিটি মুহূর্তে তার শূন্যতা অনুভব করি।

তিনি আরও বলেন, আমরা চাই, ইশমামের আত্মত্যাগ যেন দেশের মানুষ চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। একই সঙ্গে শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে উঠুক।

মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, মামলার রায় হয়েছে। কিন্তু রায় বাস্তবায়নের জন্য এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। আমরা দ্রুত রায় কার্যকর করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।”

শহীদ ইশমামুল হকের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর স্মরণে পারিবারিকভাবে দোয়া মাহফিল, কোরআনখানি ও কবর জিয়ারতের আয়োজন করা হয়েছে। এতে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং আন্দোলনের সহযোদ্ধারা অংশ নেবেন।

লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: বায়েজীদ বিন আখন্দ বলেন, শহীদ ইশমামুল হকের পরিবারের খোঁজখবর নিয়মিত নেওয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সেই রক্তাক্ত দিনের দুই বছর পরও শহীদ ইশমামুল হকের আত্মত্যাগ লোহাগাড়ার মানুষের স্মৃতিতে অম্লান। পরিবারের কাছে তিনি হারানো এক সন্তান, আর অনেকের কাছে তিনি ন্যায়বিচার, অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী এক সাহসী তরুণ। সময় যতই পেরিয়ে যাক, তাঁর আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় এবং মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

শহীদ ইশমামের ২য় মৃত্যুবার্ষিকী : ছেলের ছবির সামনে মায়ের আহাজারি, মামলার রায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি

আপডেট সময় : ১২:০১:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল আন্দোলনের রাজপথে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন লোহাগাড়ার তরুণ ইশমামুল হক।

৭ আগস্ট তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পরিবারের কাছে তিনি এখনও যেন ঘরেরই একজন—যে কোনো মুহূর্তে দরজা খুলে ফিরে আসবেন।তবে সেই অপেক্ষা আর ফুরোয়নি। এরই মধ্যে মামলার রায় হলেও তা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন স্বজনেরা।

ইশমামুল হক চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের দর্জিপাড়ার বাসিন্দা। তিনি প্রয়াত নুরুল হকের ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন মেজ।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ঢাকার চকবাজার থেকে শাহবাগমুখী ছাত্র-জনতার মিছিলে অংশ নেন ১৭ বছর বয়সী ইশমাম। মিছিলটি চানখাঁরপুল এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ গুলি চালায়। এ সময় পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৪টায় তাঁর মৃত্যু হয়।

ইশমামের বাবা নুরুল হক ২০১৭ সালে মারা যান। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে তাঁর পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে ২০২৩ সালে ঢাকায় গিয়ে চকবাজারের একটি জুয়েলারি দোকানে মাসিক চার হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন। অল্প আয়ের বড় একটি অংশ নিয়মিত মায়ের কাছে পাঠিয়ে সংসারের খরচে সহায়তা করতেন।

বৃহস্পতিবার ( ৬ আগস্ট ) রাতে ইসমামের বাসায় গিয়ে দেখা যায় মা শাহেদা বেগম এখনও ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আন্দোলনের পুরো সময়ই সে রাজপথে ছিল। ৫ আগস্ট সকালেও মিছিলে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর খবর পাই, ও গুলিবিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু সেদিন যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় লোহাগাড়া থেকে ঢাকায় যেতে পারিনি। পরদিন হাসপাতালে পৌঁছাই। আর তার পরদিনই আমার ছেলেটা চলে গেল।

তিনি বলেন, দুই বছর হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও মনে হয় দরজা খুলে আমার ছেলেটা ঘরে ঢুকবে। একজন মা সন্তানের মৃত্যু কোনো দিন ভুলতে পারে না। ছেলের ছবির দিকে তাকালেই শহীদ ইশমামের মায়ের চোখে অশ্রু নেমে আসে। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সন্তানের শূন্যতা আজও তাঁকে প্রতিনিয়ত কাঁদায়। বুকভরা স্মৃতি আর অসীম বেদনা নিয়েই তিনি এখনো ছেলের ছবিকে বুকে জড়িয়ে চোখের জল ফেলেন।

ইশমামের বড় ভাই মুহিবুল হক বলেন, ইশমাম শুধু আমার ছোট ভাই ছিল না, সে ছিল আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা। অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল। নিজের প্রয়োজন কমিয়ে মায়ের জন্য টাকা পাঠাত। আন্দোলনে যাবে জানতাম, কিন্তু কখনো ভাবিনি সে আর ফিরে আসবে না। দুই বছর কেটে গেলেও প্রতিটি মুহূর্তে তার শূন্যতা অনুভব করি।

তিনি আরও বলেন, আমরা চাই, ইশমামের আত্মত্যাগ যেন দেশের মানুষ চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। একই সঙ্গে শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে উঠুক।

মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, মামলার রায় হয়েছে। কিন্তু রায় বাস্তবায়নের জন্য এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। আমরা দ্রুত রায় কার্যকর করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।”

শহীদ ইশমামুল হকের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর স্মরণে পারিবারিকভাবে দোয়া মাহফিল, কোরআনখানি ও কবর জিয়ারতের আয়োজন করা হয়েছে। এতে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং আন্দোলনের সহযোদ্ধারা অংশ নেবেন।

লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: বায়েজীদ বিন আখন্দ বলেন, শহীদ ইশমামুল হকের পরিবারের খোঁজখবর নিয়মিত নেওয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সেই রক্তাক্ত দিনের দুই বছর পরও শহীদ ইশমামুল হকের আত্মত্যাগ লোহাগাড়ার মানুষের স্মৃতিতে অম্লান। পরিবারের কাছে তিনি হারানো এক সন্তান, আর অনেকের কাছে তিনি ন্যায়বিচার, অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী এক সাহসী তরুণ। সময় যতই পেরিয়ে যাক, তাঁর আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় এবং মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।