ঢাকা ০৭:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
চট্টগ্রামে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে চকরিয়ার যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মাঠপর্যায়ের ধারণা নিলেন ৫৮ জন বিসিএস কর্মকর্তা এরশাদের স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিকের ২ বছরের কারাদণ্ড রোহিঙ্গাদের জন্য এ বছর চাওয়া হয়েছে ৭১০ মিলিয়ন ডলার লামায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহে বর্ণাঢ্য র‍্যালি আওয়ামী লীগ ছিলই, ‘ব্যাক’ করেছে তাদের দম্ভ: আসিফ নজরুল বিদ্যুৎ বিভ্রাট, হাসি নেই কামারদের মুখে খুরুশকুলে কথা কাটাকাটির জেরে ছুরিকাঘাতে এক ব্যক্তি নিহত আগামীতে ফুটবলের মাধ্যমেই বাংলাদেশকে চিনবে বিশ্ববাসী ‘বাবার বুকে তুমি চিরদিন থাকবে, আল্লাহ তোমাকে বেহেশত নসিব করুক’ বিদ্যুতের দাম ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব পিডিবির বিশ্ব মেট্রোলজি দিবসের আলোচনা সভায় জেলা প্রশাসক-বেশী লাভের আশায় ওজনে কম দেয়া যাবে না উখিয়ায় ডাম্পারের চাপায় নারীর মৃত্যু; শিশুসহ আহত ৩ সেনা কর্মকর্তা তানজিম হত্যা মামলায় ৪ আসামির মৃত্যুদণ্ড, ৯ জনের যাবজ্জীবন নাফ নদী পেরিয়ে ইয়াবার চালান, পিস্তলসহ পাচারকারী আটক

বিদ্যুৎ বিভ্রাট, হাসি নেই কামারদের মুখে

হারাপের হাওয়ায় কয়লা জ্বালিয়ে রেখে গরম করা হতো লোহা। তাকে দেয়া হতো দা-ছুরির অবয়ব। যেখানে কায়িকশ্রমের আধিক্য ছিলো বেশি। সেসব চিত্র এখন আর দেখা মেলে না। বেড়েছে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার। তেমনই কক্সবাজার শহরের বড় বাজার এলাকার কামারপল্লীতে সকাল গড়াতেই শুরু হয় আগুন আর লোহার লড়াই। কয়লার চুল্লিতে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন, তাতে তপ্ত হয়ে লাল হয়ে ওঠা লোহা মুহূর্তেই হাতুড়ির আঘাতে রূপ নিচ্ছে দা, বটি, চাপাতি আর ধারালো ছুরিতে। টুংটাং শব্দে মুখর চারপাশ। কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম। আর মাত্র কয়েকদিন পর পবিত্র ঈদুল আজহা। তাই কক্সবাজারের কামারশালাগুলোতে এখন যেন দম ফেলারও সময় নেই। তবে বাড়তি কাজের মধ্যেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে চিন্তায় রয়েছেন তারা।

শহরের বড় বাজার, লিংক রোড, কলাতলী, পিটি স্কুল বাজার ও সদর উপজেলা বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার কামারপল্লীগুলো ঘুরে দেখা গেছে, কোরবানির পশু জবাই ও গোশত কাটার সরঞ্জাম কিনতে কিংবা পুরোনো দা-ছুরি শান দিতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। কেউ নতুন চাপাতি কিনছেন, কেউ আবার পুরোনো বটি ধারালো করতে অপেক্ষা করছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

লিংক রোড থেকে বড় বাজারে দা-ছুরি কিনতে আসা মিজানুর রহমানের ভাষ্য, “প্রতি বছর কোরবানির আগে বড় বাজারে আসি। আগে অনেক কম সময়ে কাজ হতো, এবার তুলনামূলক ভিড় আর ঝামেলা বেশি। তবে দাম কিছুটা বেড়েছে।”

শহরের লারপাড়া এলাকার বাসিন্দা রাকিব বললেন, “প্রতি বছরের মতো এবারও কামারদের কাছে এসেছি বটি আর চাপাতি কিনতে। অন্যবারের তুলনায় অপেক্ষা বেশি করতে হচ্ছে।”

কামারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে পশুর চামড়া ছাড়ানোর ছুরি বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। দা ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা, বটি ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা, পশু জবাইয়ের ছুরি ৩০০ থেকে এক হাজার টাকা এবং চাপাতি ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পুরোনো ছুরি বা দা শান দিতে ৫০ টাকা থেকে শুরু করে কাজের ধরন অনুযায়ী ১৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

তবে কাজের চাপ বাড়লেও মুখে হাসি নেই কামারদের। কারণ, বাড়তি আয় হলেও বেড়েছে উৎপাদন খরচ। বিশেষ করে কয়লা, শ্রমিক মজুরি ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধিতে লাভের অঙ্ক কমে গেছে অনেকটাই। শহরের লিংক রোড বাজারের কামার স্বপন পাল বলেছেন, “বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় কোরবানির ঈদের সময় কাজ অনেক বেড়ে যায়। লোহার দাম তেমন না বাড়লেও কয়লার দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। এই মৌসুমেই কিছুটা লাভ হয়।”

সদর উপজেলা বাজারের কামার মন সং জানিয়েছেন, “আমাদের বাপ-দাদার পেশা এটা। শত কষ্ট হলেও এই পেশা ছাড়ার সুযোগ নেই।”

বড় বাজারের কাজল কর্মকার জানান, বছরের এই সময়টিই তাদের প্রধান আয়ের মৌসুম। তার মতে, “ঈদের কয়েকটা দিনের আয়ের উপরই পুরো বছরের হিসাব নির্ভর করে। কাঁচামালের দাম বেড়েছে, শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী লাভ হয় না।”

তপন কর্মকার নামে আরেক কামার বলেছেন, “গত এক মাস ধরে বিরামহীন কাজ করছি। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষ দা-ছুরি শান দিতে ভিড় করছে।”

কামাররা জানান, আগে যেখানে একটি দোকানে দুইজন শ্রমিক কাজ করতেন, এখন সেখানে ৫ থেকে ৬ জন শ্রমিক নিয়োগ দিতে হচ্ছে। তবুও সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। ইতোমধ্যে অনেকেই নতুন অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।

তাদের অভিযোগ, কর্মব্যস্ততার মধ্যেও বড় দুশ্চিন্তার নাম বিদ্যুৎ বিভ্রাট। ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বৈদ্যুতিক শান মেশিন ও অন্যান্য সরঞ্জাম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে কাজের গতি কমে যাচ্ছে, বাড়ছে সময় ও খরচ।

তাদের দাবি, ঈদের আগে সবচেয়ে ব্যস্ত এই সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় নির্ধারিত সময়ে অর্ডার বুঝিয়ে দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারা সরকারের কাছে অন্তত ঈদের আগের কয়েকদিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, ঈদকে কেন্দ্র করে দা, চাপাতি ও ছুরির দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও কামারদের দাবি, কয়লা, শ্রমিক ও অন্যান্য কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণেই দাম কিছুটা বাড়াতে হয়েছে।

কামার স্বপন পালের মতে, বছরের অধিকাংশ সময় অবহেলায় কাটলেও ঈদুল আজহাকে ঘিরেই আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে শতবর্ষী এই পেশা। তবে কর্মচাঞ্চল্যের এই মৌসুমেও বিদ্যুৎ সংকট আর বাড়তি খরচের চাপ কামারদের মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছে।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রামে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে চকরিয়ার যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু

বিদ্যুৎ বিভ্রাট, হাসি নেই কামারদের মুখে

আপডেট সময় : ০৫:৪০:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

হারাপের হাওয়ায় কয়লা জ্বালিয়ে রেখে গরম করা হতো লোহা। তাকে দেয়া হতো দা-ছুরির অবয়ব। যেখানে কায়িকশ্রমের আধিক্য ছিলো বেশি। সেসব চিত্র এখন আর দেখা মেলে না। বেড়েছে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার। তেমনই কক্সবাজার শহরের বড় বাজার এলাকার কামারপল্লীতে সকাল গড়াতেই শুরু হয় আগুন আর লোহার লড়াই। কয়লার চুল্লিতে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন, তাতে তপ্ত হয়ে লাল হয়ে ওঠা লোহা মুহূর্তেই হাতুড়ির আঘাতে রূপ নিচ্ছে দা, বটি, চাপাতি আর ধারালো ছুরিতে। টুংটাং শব্দে মুখর চারপাশ। কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম। আর মাত্র কয়েকদিন পর পবিত্র ঈদুল আজহা। তাই কক্সবাজারের কামারশালাগুলোতে এখন যেন দম ফেলারও সময় নেই। তবে বাড়তি কাজের মধ্যেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে চিন্তায় রয়েছেন তারা।

শহরের বড় বাজার, লিংক রোড, কলাতলী, পিটি স্কুল বাজার ও সদর উপজেলা বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার কামারপল্লীগুলো ঘুরে দেখা গেছে, কোরবানির পশু জবাই ও গোশত কাটার সরঞ্জাম কিনতে কিংবা পুরোনো দা-ছুরি শান দিতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। কেউ নতুন চাপাতি কিনছেন, কেউ আবার পুরোনো বটি ধারালো করতে অপেক্ষা করছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

লিংক রোড থেকে বড় বাজারে দা-ছুরি কিনতে আসা মিজানুর রহমানের ভাষ্য, “প্রতি বছর কোরবানির আগে বড় বাজারে আসি। আগে অনেক কম সময়ে কাজ হতো, এবার তুলনামূলক ভিড় আর ঝামেলা বেশি। তবে দাম কিছুটা বেড়েছে।”

শহরের লারপাড়া এলাকার বাসিন্দা রাকিব বললেন, “প্রতি বছরের মতো এবারও কামারদের কাছে এসেছি বটি আর চাপাতি কিনতে। অন্যবারের তুলনায় অপেক্ষা বেশি করতে হচ্ছে।”

কামারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে পশুর চামড়া ছাড়ানোর ছুরি বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। দা ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা, বটি ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা, পশু জবাইয়ের ছুরি ৩০০ থেকে এক হাজার টাকা এবং চাপাতি ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পুরোনো ছুরি বা দা শান দিতে ৫০ টাকা থেকে শুরু করে কাজের ধরন অনুযায়ী ১৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

তবে কাজের চাপ বাড়লেও মুখে হাসি নেই কামারদের। কারণ, বাড়তি আয় হলেও বেড়েছে উৎপাদন খরচ। বিশেষ করে কয়লা, শ্রমিক মজুরি ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধিতে লাভের অঙ্ক কমে গেছে অনেকটাই। শহরের লিংক রোড বাজারের কামার স্বপন পাল বলেছেন, “বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় কোরবানির ঈদের সময় কাজ অনেক বেড়ে যায়। লোহার দাম তেমন না বাড়লেও কয়লার দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। এই মৌসুমেই কিছুটা লাভ হয়।”

সদর উপজেলা বাজারের কামার মন সং জানিয়েছেন, “আমাদের বাপ-দাদার পেশা এটা। শত কষ্ট হলেও এই পেশা ছাড়ার সুযোগ নেই।”

বড় বাজারের কাজল কর্মকার জানান, বছরের এই সময়টিই তাদের প্রধান আয়ের মৌসুম। তার মতে, “ঈদের কয়েকটা দিনের আয়ের উপরই পুরো বছরের হিসাব নির্ভর করে। কাঁচামালের দাম বেড়েছে, শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী লাভ হয় না।”

তপন কর্মকার নামে আরেক কামার বলেছেন, “গত এক মাস ধরে বিরামহীন কাজ করছি। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষ দা-ছুরি শান দিতে ভিড় করছে।”

কামাররা জানান, আগে যেখানে একটি দোকানে দুইজন শ্রমিক কাজ করতেন, এখন সেখানে ৫ থেকে ৬ জন শ্রমিক নিয়োগ দিতে হচ্ছে। তবুও সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। ইতোমধ্যে অনেকেই নতুন অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।

তাদের অভিযোগ, কর্মব্যস্ততার মধ্যেও বড় দুশ্চিন্তার নাম বিদ্যুৎ বিভ্রাট। ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বৈদ্যুতিক শান মেশিন ও অন্যান্য সরঞ্জাম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে কাজের গতি কমে যাচ্ছে, বাড়ছে সময় ও খরচ।

তাদের দাবি, ঈদের আগে সবচেয়ে ব্যস্ত এই সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় নির্ধারিত সময়ে অর্ডার বুঝিয়ে দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারা সরকারের কাছে অন্তত ঈদের আগের কয়েকদিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, ঈদকে কেন্দ্র করে দা, চাপাতি ও ছুরির দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও কামারদের দাবি, কয়লা, শ্রমিক ও অন্যান্য কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণেই দাম কিছুটা বাড়াতে হয়েছে।

কামার স্বপন পালের মতে, বছরের অধিকাংশ সময় অবহেলায় কাটলেও ঈদুল আজহাকে ঘিরেই আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে শতবর্ষী এই পেশা। তবে কর্মচাঞ্চল্যের এই মৌসুমেও বিদ্যুৎ সংকট আর বাড়তি খরচের চাপ কামারদের মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছে।