সাম্প্রতিক সময়ে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনায় রোহিঙ্গাদের মাঝে যেখানে আতঙ্ক কাজ করছে, এমন সময়ে ক্যাম্পের বিভিন্ন জায়গায় এখনো থামেনি পাহাড় কাটা।
উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালীর শফিউল্লাহকাটা ১৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বি-৩ ব্লকের বেশ কয়েকটি পাহাড় কেটে মাটি পাচার করা হয়েছে। পাহাড়ের নিচের অংশ পুরোপুরি কেটে মাটি সরিয়ে ফেলায় উপরে থাকা রোহিঙ্গাদের বসতিগুলো যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
১৬ নম্বর ক্যাম্পের বি-৩ ব্লকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি উঁচু পাহাড়ের চারপাশের মাটি কেটে সরিয়ে ফেলে সেখানে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় জাফর আলমের ছেলে সাইফুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের মাটি কেটে ড্রাম ট্রাকে করে পাচার করে আসছেন। ফলে ৪/৫টি ঘর পুরোপুরি ভেঙে গেছে এবং ঝুঁকিতে আছে আরও ৯টি ঘর।
জানা গেছে, পালংখালী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি সাইফুল ইসলাম পাহাড় কেটে বহুতল ভবন গড়ে তুলেছেন। তাঁর তিনতলা ভবনের ঠিক দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের পুরো পাহাড়টির মাটির বেশিরভাগ অংশই কেটে সরানো হয়েছে।
এদিকে সাইফুল ইসলাম নিজেকে পালংখালী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং পাশাপাশি ৫ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি বলে পরিচয় দিয়েছেন।
পালংখালী ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির আবুল আলা রোমান টিটিএন-কে জানিয়েছেন, মাস দেড়েক আগে সাইফুলকে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে পাহাড় কাটা কিংবা মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়ে এমন কাজ করা দলীয়ভাবে নিষেধ আছে বলে জানান তিনি।
১৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) মোঃ মানোয়ার হোসাইন জানান, বিষয়টি বনবিভাগকে জানানো হয়েছে। পাহাড় কেটে মাটি পাচারের বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান শরণার্থী কমিশনের এ কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে উখিয়া রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) শাহিনুর রহমান টিটিএন-কে জানান, “যেহেতু ক্যাম্পে আলাদা প্রশাসন কাজ করে, তাই কাঁটাতারের ভেতরের বিষয়গুলো ক্যাম্প প্রশাসনই দেখে। তবুও তারা যদি আমাদের সহযোগিতা চায়, তখন আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
এদিকে থাইংখালীর বিট কর্মকর্তা আরাফাত মাহমুদ টিটিএন-কে জানান, ইতোমধ্যে সিআইসি অফিস থেকে পাহাড় কাটার বিষয়টি জানানো হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ৬ জুলাই উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসের পৃথক ঘটনায় ৮ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার একদিন পর ৮ জুলাই কুতুপালং ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি মহিলা হেফজখানায় পাহাড়ধসে শিশুসহ ৫ জনের মৃত্যু হয়। এসব ঘটনায় আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মাঝে চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পাহাড়ধসের ঘটনায় শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোঃ মিজানুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমকে জানান, প্রায় ২ লাখের কাছাকাছি রোহিঙ্গা পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় পাহাড় কেটে মাটি সরানোর কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে। তিনি আরও জানান, কিছু লোভী ব্যক্তি পাহাড় কেটে নতুন রোহিঙ্গাদের জন্য ঘর তৈরি করে বিক্রি করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে তিনি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহযোগিতা চেয়েছেন।
উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বেশিরভাগ বসতিই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। রোহিঙ্গা আগমনের আগে যে পাহাড়গুলোতে ঘন জঙ্গল ছিল, সেগুলোতে এখন রোহিঙ্গাদের বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ও পাহাড়খেকো চক্র সহজেই পাহাড় কেটে মাটি পাচার করছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















