কক্সবাজারের মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে আবারও বাড়ছে অস্থিরতা। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও একটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় নাফ নদীতে মাছ ধরতে থাকা বাংলাদেশি জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সোমবার (১৮ মে) সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা সংলগ্ন নাফ নদীর পূর্ব পাশে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় জেলে ও সীমান্তবাসীরা জানিয়েছেন, শতাধিক রাউন্ড গুলির শব্দে পুরো সীমান্ত এলাকা কেঁপে ওঠে।
নাফ নদীতে মাছ ধরতে থাকা কয়েকজন জেলে জানিয়েছেন, সকালে মাছ ধরার সময় তারা নদীর উত্তর পাশ দিয়ে একটি লাল রঙের স্পিডবোট যেতে দেখেন। এর কিছুক্ষণ পরই মিয়ানমারের ভেতর থেকে হঠাৎ গুলির শব্দ শুরু হয়। আতঙ্কিত জেলেরা দ্রুত নৌকা ঘুরিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে আসেন।
জেলে মো. ছবুর বলেছেন, “প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম হয়তো টহল চলছে। পরে একের পর এক গুলির শব্দ শুনে বুঝতে পারি বড় কিছু হচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে দ্রুত নদী ছেড়ে চলে আসি।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, হ্নীলা ইউনিয়নের বিপরীত পাশের রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীকে সরিয়ে সেখানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। তবে ওই এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তের ওপারে চলমান সংঘাতের প্রভাব এখন সরাসরি এপারের জনজীবনে পড়ছে। গুলির শব্দ, অস্ত্রধারীদের তৎপরতা এবং সীমান্তঘেঁষা এলাকায় অনিরাপত্তা সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সীমান্তবাসীদের ধারণা, সোমবারের গোলাগুলির ঘটনাটি আরাকান আর্মি ও একটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। যদিও দুপুর পর্যন্ত বাংলাদেশের ভেতরে গুলি এসে পড়া বা হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ টেকনাফ ব্যাটালিয়নের (২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়ার ভাষ্য, ‘‘হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা সীমান্তের পূর্ব পাশে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মি ও একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সম্ভাব্য গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কারণে সেখানে প্রায়ই এ ধরনের সংঘর্ষ হয়ে থাকে।’’
তিনি নিশ্চিত করেছেন, “সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে। নাফনদীতেও নিয়মিত নজরদারি চলছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি প্রস্তুত রয়েছে।”
এদিকে সীমান্তে উত্তেজনার এই আবহের মধ্যেই শনিবার (১৬ মে) বিকেলে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তসংলগ্ন ফাইশ্যাখালী এলাকায় হামলার শিকার হন মো. তারেক নামে এক যুবক।
স্থানীয়রা জানিয়েছে, বিকেলে সীমান্তসংলগ্ন বেড়িবাঁধ এলাকায় মাছ ধরতে যান তারেক। এ সময় আগে থেকে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এর সদস্যরা তাকে লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ে। গুলি তার শরীরে না লাগলেও পরে নৌকার বৈঠা দিয়ে মাথায় আঘাত করা হলে তিনি গুরুতর আহত হন।
আহত তারেক পালংখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আঞ্জুমানপাড়া এলাকার আবদুস সালামের ছেলে। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে কোটবাজারের অরিজিন হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের পরিচালক দরবেশ আলী নিশ্চিত করেছিলেন, বিকেল ৫টার দিকে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি বাড়ি ফিরে যান।
তবে উখিয়া ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম এ ঘটনা বাংলাদেশ অংশে নয় দাবি করেছেন।
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা শামিমুল ইসলামের ভাষ্য, “আগে চোরাচালান বা ছোটখাটো সংঘর্ষের খবর শুনতাম। এখন অস্ত্রধারীরা সাধারণ মানুষকেও টার্গেট করছে। আমরা খুব ভয়ের মধ্যে আছি।”
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরীর দাবি, “আঞ্জুমানপাড়ার সীমান্তঘেঁষা এলাকা এখন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।”
তার ভাষ্য, ‘‘সীমান্তে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না করা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।’’
উল্লেখ্য, এর আগেও মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মি ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষের জেরে একাধিকবার বাংলাদেশের ভেতরে গুলি এসে পড়েছে। সবশেষ গত ১১ জানুয়ারি টেকনাফের হোয়াইক্যং তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া গুলিতে আহত হয় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী হুজাইফা আফনান। পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যু হয়।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলামের মতে, নতুন করে সহিংসতা বাড়তে থাকায় এখন আতঙ্কে দিন কাটছে সীমান্ত এলাকায় বসবাস করা মানুষদের।
তার ভাষ্য, ‘‘মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের আর সীমান্তবাসীর কণ্ঠে একটাই প্রশ্ন, মিয়ানমারের যুদ্ধের আগুন আর কতটা ছড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশের ভেতরে ?’’
বিশেষ প্রতিবেদক: 






















