গত সপ্তাহে আন্দামান সাগরে একটি ট্রলারডুবির ঘটনায় শিশুসহ অন্তত ২৫০ জন যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিখোঁজদের মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশাপাশি বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) জাতিসংঘের শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক সংস্থাগুলো এই তথ্য জানিয়েছে।
সংস্থাগুলো জানায়, ট্রলারটি বাংলাদেশ থেকে যাত্রা শুরু করেছিল এবং এর গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া। তীব্র বাতাস, উত্তাল সমুদ্র এবং অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই করার কারণে ট্রলারটি ডুবে গেছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ কোস্টগার্ড সংবাদ সংস্থা এএফপি-কে জানিয়েছে, গত ৯ এপ্রিল তাদের একটি জাহাজ ওই ট্রলার থেকে নয়জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে। তবে ট্রলারটি ঠিক কখন ডুবেছে তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রাণঘাতী অভিযানের পর থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
বাংলাদেশে জীবনযাপনের মান অত্যন্ত কষ্টকর হওয়ায় অনেক রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাদাগাদি করা নৌকায় কিংবা ট্রলারে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন। মুসলিম প্রধান দেশ হওয়ায় এই অঞ্চলের অনেক রোহিঙ্গাই মালয়েশিয়াকে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে মনে করেন।
উদ্ধার হওয়াদের একজন, ৪০ বছর বয়সী রফিকুল ইসলাম এএফপি-কে জানান, উদ্ধারের আগে তিনি প্রায় ৩৬ ঘণ্টা সাগরে ভেসে ছিলেন। তিনি বলেন, ট্রলার থেকে ছড়িয়ে পড়া তেলের আগুনে তার শরীর পুড়ে গেছে।
তিনি জানান, মূলত মালয়েশিয়ায় ভালো কাজের প্রলোভনেই তিনি ওই ট্রলারে চড়েছিলেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই মর্মান্তিক ঘটনা রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি এবং এর কোনো স্থায়ী সমাধান না থাকার ভয়াবহ চিত্রই ফুটিয়ে তুলছে।’
সংস্থাগুলো জানায়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতার কারণে অদূর ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের আশা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। ক্যাম্পে কমতে থাকা মানবিক সহায়তা এবং মানবেতর জীবনযাপনের কারণেই রোহিঙ্গারা ‘নিরাপত্তা ও সুযোগের সন্ধানে’ সমুদ্রপথে এ ধরণের বিপজ্জনক যাত্রা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
পাচারের কাজে ব্যবহৃত ট্রলারগুলো সাধারণত ছোট ও গাদাগাদি করে ভরা থাকে, যেখানে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের মতো মৌলিক সুবিধারও অভাব থাকে। ফলে সব ট্রলার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। অনেকে মাঝপথেই মারা যান, আবার অনেককে আটক বা বিতাড়িত করা হয়।
এমনকি মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছালেও অনেক সময় সে দেশের কর্তৃপক্ষ বা স্থানীয়রা তাদের ফিরিয়ে দেয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মালয়েশিয়া খাবার ও পানি দেওয়ার পর প্রায় ৩০০ শরণার্থী বহনকারী দুটি নৌকা ফিরিয়ে দিয়েছিল।
কক্সবাজারের একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছিলেন, ‘মানুষ লড়াইয়ে মরছে, না খেয়ে মরছে। তাই অনেকে মনে করে, এখানে ধুঁকে ধুঁকে মরার চেয়ে সাগরে মরে যাওয়াই ভালো।’
মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা এবং তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশ যখন নতুন বছর উদযাপন করছে, তখন এই ট্র্যাজেডি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মিয়ানমারের এই বাস্তুচ্যুতি সমস্যার মূল কারণগুলো খুঁজে বের করা এবং রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও সম্মানের সাথে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।’
সূত্র: বিবিসি
টিটিএন ডেস্ক: 






















