ঢাকা ১১:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ইসলামী ব্যাংকের পুরো বোর্ড ভেঙে দিলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার নাম করে আনছিলো ইয়াবা : আটক  যুবদল নেতা, দল থেকে বহিস্কার কক্সবাজারে দুইশ কিলোমিটার ড্রাইভ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ১৫ বছর পরও স্মৃতিতে অমলিন নেতা শাহ আলম সরকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবান্ধব শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে- এমপি কাজল সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার আত্মসমর্পণ করতে আদালতে আসছেন এমপি আমির হামজা একই পরিবারের ৪ সদস্যের আত্মহত্যা ১২ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার নিজ বাড়ি থেকে মা-মেয়ের মরদেহ উদ্ধার নজরুল বর্ষ ঘিরে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান হবে ৬৪ জেলায়: সংস্কৃতিমন্ত্রী দুর্ভিক্ষপীড়িত রাষ্ট্রকে টেনে তুলেছিলেন জিয়াউর রহমান: মির্জা ফখরুল ‘এগিয়ে চলো ব্রাজিল’, সতীর্থদের প্রতি নেইমার বিশ্বকাপ জিততে এসেছি, ব্যক্তিগত পুরস্কার নয়: ভিনিসিয়ুস প্রায় ১৪ ঘণ্টার সফর শেষে ঢাকা ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সম্পাদকীয়

হামে মৃত্যু, সামনে ডেঙ্গু, এ কেমন জীবন?

একটি পরিবার। বৈবাহিক জীবনের দীর্ঘ ১১ বছরের অপেক্ষা। অসংখ্য প্রার্থনা, চিকিৎসা, সামাজিক চাপ আর অগণিত মানসিক যুদ্ধের পর ঘরে আসে একটি সন্তান। সেই সন্তানই হয়ে ওঠে পরিবারের স্বপ্ন, বেঁচে থাকার কারণ, ভবিষ্যতের আলো। অথচ মাত্র দশ মাস বয়সে হামে আক্রান্ত হয়ে সেই শিশুর মৃত্যু!

এই একটি মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সামষ্টিক সচেতনতার ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।

একসময় আমরা ভেবেছিলাম হাম অতীতের রোগ। টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু আজ বাস্তবতা আবারও আমাদের সামনে কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে, কেন একটি প্রতিরোধ যোগ্য রোগে এখনো শিশু মারা যায়? কেন একটি মা-বাবাকে ১১ বছরের প্রতীক্ষার পর সন্তানের লাশ বুকে নিতে হয়?

হাম শুধু একটি ভাইরাস নয়; এটি আমাদের অবহেলা, বৈষম্য ও দুর্বল জনস্বাস্থ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহর-গ্রাম বিভাজন, অপুষ্টি, টিকা সম্পর্কে ভুল তথ্য, স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, সবকিছু মিলেই এই বিপদকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে। অনেক এলাকায় এখনো সময়মতো টিকা পৌঁছায় না, আবার কোথাও সচেতনতার অভাবে অভিভাবকেরা টিকা নিতে দেরি করেন। ফল ভোগ করে নিরীহ শিশুরা।

আর ঠিক এই সময়েই সামনে আসছে ডেঙ্গুর মৌসুম। হাম শেষ না হতেই ডেঙ্গুর আতঙ্ক।
একদিকে শিশুর জ্বর, অন্যদিকে মশার উপদ্রব। হাসপাতালের বেড সংকট, চিকিৎসার ব্যয়, মানুষের উদ্বেগ, সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন যেন এক অনিশ্চয়তার নাম।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, আমরা ধীরে ধীরে মৃত্যু ও দুর্ভোগের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। সংবাদে শিশু মৃত্যুর খবর দেখি, কিছুক্ষণ কষ্ট পাই, তারপর আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই। কিন্তু যে মা তার একমাত্র সন্তান হারান, তার কাছে পৃথিবী আর কখনো স্বাভাবিক হয় না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু হাসপাতাল নির্মাণ নয়; প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা। টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া, এগুলো আর কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়, মানবিক দায়িত্ব।

আমাদেরও দায় আছে। গুজব নয়, বিজ্ঞানের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। সময় মতো টিকা নিশ্চিত করতে হবে। নিজের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। কারণ জনস্বাস্থ্য কেবল সরকারের একার বিষয় নয়; এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়বদ্ধতা।

একটি শিশুর মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের বড় বড় গল্পের আড়ালেও মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা এখনো ভঙ্গুর। আজ হাম, কাল ডেঙ্গু, এভাবে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই কি আমাদের বেঁচে থাকতে হবে?

প্রশ্নটি এখন শুধু একটি পরিবারের নয়; পুরো জাতির।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদকীয়

হামে মৃত্যু, সামনে ডেঙ্গু, এ কেমন জীবন?

আপডেট সময় : ০৮:৫৫:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬

একটি পরিবার। বৈবাহিক জীবনের দীর্ঘ ১১ বছরের অপেক্ষা। অসংখ্য প্রার্থনা, চিকিৎসা, সামাজিক চাপ আর অগণিত মানসিক যুদ্ধের পর ঘরে আসে একটি সন্তান। সেই সন্তানই হয়ে ওঠে পরিবারের স্বপ্ন, বেঁচে থাকার কারণ, ভবিষ্যতের আলো। অথচ মাত্র দশ মাস বয়সে হামে আক্রান্ত হয়ে সেই শিশুর মৃত্যু!

এই একটি মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সামষ্টিক সচেতনতার ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।

একসময় আমরা ভেবেছিলাম হাম অতীতের রোগ। টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু আজ বাস্তবতা আবারও আমাদের সামনে কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে, কেন একটি প্রতিরোধ যোগ্য রোগে এখনো শিশু মারা যায়? কেন একটি মা-বাবাকে ১১ বছরের প্রতীক্ষার পর সন্তানের লাশ বুকে নিতে হয়?

হাম শুধু একটি ভাইরাস নয়; এটি আমাদের অবহেলা, বৈষম্য ও দুর্বল জনস্বাস্থ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহর-গ্রাম বিভাজন, অপুষ্টি, টিকা সম্পর্কে ভুল তথ্য, স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, সবকিছু মিলেই এই বিপদকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে। অনেক এলাকায় এখনো সময়মতো টিকা পৌঁছায় না, আবার কোথাও সচেতনতার অভাবে অভিভাবকেরা টিকা নিতে দেরি করেন। ফল ভোগ করে নিরীহ শিশুরা।

আর ঠিক এই সময়েই সামনে আসছে ডেঙ্গুর মৌসুম। হাম শেষ না হতেই ডেঙ্গুর আতঙ্ক।
একদিকে শিশুর জ্বর, অন্যদিকে মশার উপদ্রব। হাসপাতালের বেড সংকট, চিকিৎসার ব্যয়, মানুষের উদ্বেগ, সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন যেন এক অনিশ্চয়তার নাম।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, আমরা ধীরে ধীরে মৃত্যু ও দুর্ভোগের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। সংবাদে শিশু মৃত্যুর খবর দেখি, কিছুক্ষণ কষ্ট পাই, তারপর আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই। কিন্তু যে মা তার একমাত্র সন্তান হারান, তার কাছে পৃথিবী আর কখনো স্বাভাবিক হয় না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু হাসপাতাল নির্মাণ নয়; প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা। টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া, এগুলো আর কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়, মানবিক দায়িত্ব।

আমাদেরও দায় আছে। গুজব নয়, বিজ্ঞানের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। সময় মতো টিকা নিশ্চিত করতে হবে। নিজের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। কারণ জনস্বাস্থ্য কেবল সরকারের একার বিষয় নয়; এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়বদ্ধতা।

একটি শিশুর মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের বড় বড় গল্পের আড়ালেও মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা এখনো ভঙ্গুর। আজ হাম, কাল ডেঙ্গু, এভাবে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই কি আমাদের বেঁচে থাকতে হবে?

প্রশ্নটি এখন শুধু একটি পরিবারের নয়; পুরো জাতির।