ঢাকা ০১:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
জাতিসংঘ কেন অপ্রয়োজনীয়? কক্সবাজারে ঠিকাদারকে ‘মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর’ অভিযোগ, এসপির কাছে স্ত্রীর আবেদন মহেশখালীতে সড়ক দুর্ঘটনা: যুবক নিহত খুনিয়াপালংয়ে বেপরোয়া ডাম্পারের ধাক্কায় দুই শিশুর মৃত্যু! উখিয়া কোর্টবাজারে র‌্যাব ও ভোক্তা অধিকারের যৌথ অভিযান: ৪ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা জেলা সংগীত শিল্পী পরিষদের ইফতার সম্পন্ন অধিধ্বনির উদ্যোগে শিশুদের নাট্য কর্মশালা ‘অভিনয়ের হাতেখড়ি’র উদ্বোধন নিজেকে নির্দোষ দাবি টেকনাফের ফরিদের: র‍্যাব বলছে ১৭ মামলার পলাতক আসামী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্দেশ বাস্তবায়নে সৈকতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু জেলা প্রশাসনের অপহরণের দুই দিন পর কিশোর উদ্ধার, গ্রেপ্তার ১ গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে: সংসদে রাষ্ট্রপতি সংসদে বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন, নেতৃত্বে যারা রাষ্ট্রপতির ৩ অপরাধে ভাষণ বর্জন : জামায়াত আমির ইরানি ড্রোনের আঘাতে কুয়েতের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিধ্বস্ত প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলের প্রতিবাদ-ওয়াক আউট

আরসা প্রধান আতাউল্লাহ : আরাকানে উত্থান, রহস্যে ঘেরা যত কর্মকান্ড

দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত-সমালোচিত সশস্ত্র রোহিঙ্গা সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)-র প্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি অবশেষে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন। তার গ্রেপ্তারের খবরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।

পাকিস্তানে জন্ম, তালেবানের প্রশিক্ষণ

আতাউল্লাহর জন্ম পাকিস্তানে হলেও তার শৈশব কেটেছে সৌদি আরবে। সেখানে কিছু সময় কাটানোর পর তিনি তালেবান সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন এবং সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। কথিত আছে, সৌদি আরবে থাকা অবস্থায় তিনি রোহিঙ্গাদের কিছু পরিবার দ্বারা প্রভাবিত হন এবং তাদের সহায়তায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে প্রবেশ করেন।

আল-ইয়াকিন থেকে আরসা গঠন

মিয়ানমারে প্রবেশের পর তিনি আল-ইয়াকিন নামে একটি গোষ্ঠী গড়ে তোলেন, যা পরে আরসা নামে পরিচিত হয়। শুরুতে তারা স্থানীয় ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক এবং সুশীল সমাজের ব্যক্তিদের টার্গেট করে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নির্যাতন চালায়। ভারী অস্ত্র হাতে ছবি তুলে রোহিঙ্গা তরুণদের সংগঠনে যোগ দিতে বাধ্য করত তারা। একসময় সংগঠনটি বড় আকার ধারণ করে এবং মিয়ানমারের নিরাপত্তা চৌকিগুলোতে হামলা চালায়।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কের সন্দেহ

২০১৭ সালে যখন আরসা মিয়ানমারের পুলিশের চেকপোস্টে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখনই প্রশ্ন ওঠে—কেন মিয়ানমার সেনাবাহিনী আগেভাগে এ হামলা প্রতিহত করেনি? অনেকেই সন্দেহ করেন, আতাউল্লাহ হয়তো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গোপন চর হিসেবে কাজ করছিল। তার এই কর্মকাণ্ডের জের ধরে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন শুরু করে, যার ফলে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে, যা এখন বেড়ে ১২ লাখেরও বেশি।

ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মুহিবল্লাহ হত্যার অভিযোগ

আতাউল্লাহর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা মাস্টার মুহিবুল্লাহকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। যিনি আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও দেখা করেন এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেনএছাড়া রোহিঙ্গা মানবাধিকারকর্মী ও মাঝিদের হত্যার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

মাদক, অপহরণ ও নারী নির্যাতনের অভিযোগ

আরসার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক পাচার, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং নারী নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে তার সংগঠন নানাভাবে সহিংসতা চালিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে হত্যা

সর্বশেষ, আতাউল্লাহ ও তার সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের এক উর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগ উঠে। এ ঘটনার পরই বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আরও কঠোর হয় এবং অবশেষে তাকে আটক করতে সক্ষম হয়।

আটকের পর স্বস্তি

আতাউল্লাহর গ্রেপ্তারের পর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় বাংলাদেশিদের মধ্যে স্বস্তির আবহ বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা সহিংসতা, ভয়ভীতি এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে মুক্তি পেতে তারা আশাবাদী।

মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ডের অন্যতম আসামী আতাউল্লাহ গ্রেফতারের খবরে মুহিবুল্লাহর এক নিকট আত্মীয় বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রত্যাশা করেন অচিরেই মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ডে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের বিচার করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুহিবুল্লাহ’র আরেক সহকর্মী বলেন, ” জুনুনিই সরাসরি মাস্টার মুহিবুল্লাহকে হুমকি দিয়েছিলো। তার নির্দেশে হত্যাকান্ড হয়েছে, সে মুহিবুল্লাহকে মাথা ব্যাথার কারণ হিসেবে দেখতো।”

আরসার হাতে গুমের শিকার হয়েছিলেন ১২ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মোহাম্মদ আমিন, প্রায় ৩ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরলে এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন নির্যাতনের চিহ্ন।

আমিন বলেন, ” আতাউল্লাহ রোহিঙ্গাদের মাথা বিক্রি করেছে, তার গ্রেফতারে আমরা খুশি হয়েছি। আশা করছি তাকে বাংলাদেশ কঠোর শাস্তি দিবে।”

এদিকে বাংলাদেশ সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, কোনো অপরাধীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

ট্যাগ :

জাতিসংঘ কেন অপ্রয়োজনীয়?

আরসা প্রধান আতাউল্লাহ : আরাকানে উত্থান, রহস্যে ঘেরা যত কর্মকান্ড

আপডেট সময় : ০৭:৫৮:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ মার্চ ২০২৫

দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত-সমালোচিত সশস্ত্র রোহিঙ্গা সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)-র প্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি অবশেষে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন। তার গ্রেপ্তারের খবরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।

পাকিস্তানে জন্ম, তালেবানের প্রশিক্ষণ

আতাউল্লাহর জন্ম পাকিস্তানে হলেও তার শৈশব কেটেছে সৌদি আরবে। সেখানে কিছু সময় কাটানোর পর তিনি তালেবান সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন এবং সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। কথিত আছে, সৌদি আরবে থাকা অবস্থায় তিনি রোহিঙ্গাদের কিছু পরিবার দ্বারা প্রভাবিত হন এবং তাদের সহায়তায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে প্রবেশ করেন।

আল-ইয়াকিন থেকে আরসা গঠন

মিয়ানমারে প্রবেশের পর তিনি আল-ইয়াকিন নামে একটি গোষ্ঠী গড়ে তোলেন, যা পরে আরসা নামে পরিচিত হয়। শুরুতে তারা স্থানীয় ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক এবং সুশীল সমাজের ব্যক্তিদের টার্গেট করে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নির্যাতন চালায়। ভারী অস্ত্র হাতে ছবি তুলে রোহিঙ্গা তরুণদের সংগঠনে যোগ দিতে বাধ্য করত তারা। একসময় সংগঠনটি বড় আকার ধারণ করে এবং মিয়ানমারের নিরাপত্তা চৌকিগুলোতে হামলা চালায়।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কের সন্দেহ

২০১৭ সালে যখন আরসা মিয়ানমারের পুলিশের চেকপোস্টে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখনই প্রশ্ন ওঠে—কেন মিয়ানমার সেনাবাহিনী আগেভাগে এ হামলা প্রতিহত করেনি? অনেকেই সন্দেহ করেন, আতাউল্লাহ হয়তো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গোপন চর হিসেবে কাজ করছিল। তার এই কর্মকাণ্ডের জের ধরে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন শুরু করে, যার ফলে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে, যা এখন বেড়ে ১২ লাখেরও বেশি।

ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মুহিবল্লাহ হত্যার অভিযোগ

আতাউল্লাহর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা মাস্টার মুহিবুল্লাহকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। যিনি আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও দেখা করেন এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেনএছাড়া রোহিঙ্গা মানবাধিকারকর্মী ও মাঝিদের হত্যার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

মাদক, অপহরণ ও নারী নির্যাতনের অভিযোগ

আরসার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক পাচার, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং নারী নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে তার সংগঠন নানাভাবে সহিংসতা চালিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে হত্যা

সর্বশেষ, আতাউল্লাহ ও তার সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের এক উর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগ উঠে। এ ঘটনার পরই বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আরও কঠোর হয় এবং অবশেষে তাকে আটক করতে সক্ষম হয়।

আটকের পর স্বস্তি

আতাউল্লাহর গ্রেপ্তারের পর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় বাংলাদেশিদের মধ্যে স্বস্তির আবহ বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা সহিংসতা, ভয়ভীতি এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে মুক্তি পেতে তারা আশাবাদী।

মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ডের অন্যতম আসামী আতাউল্লাহ গ্রেফতারের খবরে মুহিবুল্লাহর এক নিকট আত্মীয় বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রত্যাশা করেন অচিরেই মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ডে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের বিচার করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুহিবুল্লাহ’র আরেক সহকর্মী বলেন, ” জুনুনিই সরাসরি মাস্টার মুহিবুল্লাহকে হুমকি দিয়েছিলো। তার নির্দেশে হত্যাকান্ড হয়েছে, সে মুহিবুল্লাহকে মাথা ব্যাথার কারণ হিসেবে দেখতো।”

আরসার হাতে গুমের শিকার হয়েছিলেন ১২ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মোহাম্মদ আমিন, প্রায় ৩ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরলে এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন নির্যাতনের চিহ্ন।

আমিন বলেন, ” আতাউল্লাহ রোহিঙ্গাদের মাথা বিক্রি করেছে, তার গ্রেফতারে আমরা খুশি হয়েছি। আশা করছি তাকে বাংলাদেশ কঠোর শাস্তি দিবে।”

এদিকে বাংলাদেশ সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, কোনো অপরাধীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।