ঢাকা ১০:৩৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
দ্বীপবর্তিকার ইফতার মাহফিল সম্পন্ন জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে কালিমার ক্যালিগ্রাফি টেকনাফে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা গ্রেফতার, র‌্যাবের ২টি মোটরসাইকেলে আগুন উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৫ জন হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আরসা সন্ত্রাসী গ্রেফতার লবণ চাষীদের গলা কাটছে ইজারাদার রামুতে অগ্নিকাণ্ডে বসতবাড়ি পুড়ে ছাই: প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি কউকে ভাঙ্গল ‘রিশাদ’ সিন্ডিকেট, ঘুষ ছাড়া মিলত না ভবন তৈরির অনুমতি লবণচাষীদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার দাবিতে মহেশখালী রান ২০২৬, রেজিস্ট্রেশন শুরু নাহিদের গতির ঝড় আর তানজিদের ব্যাটিং তাণ্ডবে পাকিস্তানকে হারাল বাংলাদেশ খেজুর দূর করবে রোজার ক্লান্তি সাগরে নি’হত কুতুবদিয়ার দুই জেলে পরিবার পেলো সহায়তার ৫০ হাজার টাকা উখিয়ায় সেহেরির সময় দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে গৃহবধূর মৃত্যু সংসদে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি : সালাহউদ্দিন আহমদ গর্জনিয়ায় তাঁতীদলের উদ্যোগে ইফতার ও দোয়া মাহফিল আরেক মামলায় আনিস আলমগীরের জামিন, মুক্তিতে ‘বাধা নেই’
মন্তব্য কলাম

আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে মাত্র ২.৮% অগ্রগতি: পাঁচ বছরে এমন স্থবিরতায় গভীর উদ্বেগ

আয়োডাইজড লবণ ব্যবহারে দেশের অগ্রগতি সাম্প্রতিক বছর গুলোতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) প্রকাশিত সর্বশেষ (নভেম্বর ২০২৫) MICS7 জরিপের প্রাথমিক প্রতিবেদনের তথ্য।

২০১৯ সালের MICS6-এর তুলনায় ২০২৫ সালের MICS7–এ আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে মাত্র ২.৮ শতাংশ বৃদ্ধির প্রক্ষেপণ এসেছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদদের কাছে একেবারেই অসন্তোষ জনক হবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

২০১২-১৩ সালে আয়োডাইজড লবণের ব্যবহার ছিল ৭৩.৭ শতাংশ। ২০১৯ সালে তা দাঁড়ায় ৭৬ শতাংশে, অর্থাৎ ছয় বছরে বৃদ্ধি মাত্র ২.৩ শতাংশ। এরপর ২০২৫ সালে ব্যবহার হবে ৭৮.৬ শতাংশ, পুনরায় পাঁচ বছরে বৃদ্ধি মাত্র ২.৬ শতাংশ। এই ধীরগতিকে ‘গুরুতর নীতিগত ব্যর্থতা’ বলে ধারনা করা হচ্ছে।

আইন আছে, কাঠামো আছে কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। আয়োডিন অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধ আইন ১৯৮৯ আইন রহিতক্রমে পরবর্তী ২০২১ সালে “আয়োডিন যুক্ত লবণ আইন ২০২১” এর পরও উৎপাদক থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল কার্যত কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং দুর্বল, মান নিয়ন্ত্রণে শিথিলতা এবং শুল্ক মুক্ত কাঁচা লবণ প্রবেশের সুযোগে এখনো অ-আইোডাইজড বা অপর্যাপ্ত আয়োডিনযুক্ত লবণ বাজারজাত হচ্ছে বলে ধারনা। প্রশ্ন উঠেছে, যখন দেশে ৯৫ শতাংশ লবণ উৎপাদক আয়োডিন মেশানোর সক্ষমতা রাখে, তখন মাত্র ৭৮ শতাংশ পরিবার আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করছে কেন?

সচেতনতা প্রচারেও শূন্যতা। সরকার ও বেসরকারি কার্যক্রমের প্রচার তুলনামূলক কমে গেছে। গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে উপকূলীয় ও পাহাড়ি এলাকায় বহু পরিবার এখনো জানে না আয়োডিন ঘাটতি কীভাবে শিশুর মেধা, থাইরয়েড ও গর্ভবতী নারীর স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। ২০২২ সালে ইসলামপুর ইউনিয়নে দুই দিনের জন্য লবণ চাষীদের ঈএকটি শুমারি পরিচালিত করে সেখানেও এই রকম তথ্য পাওয়া যায়। অত্যন্ত কম খরচের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক হওয়া সত্ত্বেও কমিউনিটি-লেভেল প্রচারণা প্রায় অচল।

নীতি-ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা ও জবাবদিহির অভাব।‌ অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ইউনিভার্সাল সল্ট আয়োডাইজেশন (USI) কর্মসূচি এখন দায় সারা কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। বার্ষিক মূল্যায়ন নেই, মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার উপযুক্ত মাত্রায় কার্যকর নয়, জেলা পর্যায়ে কোনো বাধ্যতামূলক মনিটরিং কাঠামো নেই এবং আইন লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে।

ফলাফল, পাঁচ বছরে মাত্র ২.৮ শতাংশ বৃদ্ধি। সামান্য অগ্রগতি নয়, এটি সতর্কবার্তাও। এই অগ্রগতি উদযাপন যোগ্য নয়, বরং বিপরীত ভাবে গভীর উদ্বেগ জনক। যেসব দেশে আয়োডিন ঘাটতি একসময় প্রকট ছিল, যেমন নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম; তারা এখন ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। সেখানে বাংলাদেশ এখনো ৮০ শতাংশেও পৌঁছাতে পারেনি।

এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের মনে করেন, যতদিন মাঠ পর্যায়ে কঠোর মনিটরিং, উৎপাদকদের ওপর জবাবদিহি, এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে দৃশ্যমান আইনি প্রয়োগ শুরু না হবে, ততদিন আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব নয়।

জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে পাঁচ বছরে মাত্র ২.৮ শতাংশ উন্নতি, এটি স্বাভাবিক নয়, বরং সুস্পষ্ট নীতি ব্যর্থতার প্রতিফলন।

লেখক- শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক, লবণ চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বিশেষজ্ঞ।

ট্যাগ :

দ্বীপবর্তিকার ইফতার মাহফিল সম্পন্ন

মন্তব্য কলাম

আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে মাত্র ২.৮% অগ্রগতি: পাঁচ বছরে এমন স্থবিরতায় গভীর উদ্বেগ

আপডেট সময় : ০২:২০:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫

আয়োডাইজড লবণ ব্যবহারে দেশের অগ্রগতি সাম্প্রতিক বছর গুলোতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) প্রকাশিত সর্বশেষ (নভেম্বর ২০২৫) MICS7 জরিপের প্রাথমিক প্রতিবেদনের তথ্য।

২০১৯ সালের MICS6-এর তুলনায় ২০২৫ সালের MICS7–এ আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে মাত্র ২.৮ শতাংশ বৃদ্ধির প্রক্ষেপণ এসেছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদদের কাছে একেবারেই অসন্তোষ জনক হবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

২০১২-১৩ সালে আয়োডাইজড লবণের ব্যবহার ছিল ৭৩.৭ শতাংশ। ২০১৯ সালে তা দাঁড়ায় ৭৬ শতাংশে, অর্থাৎ ছয় বছরে বৃদ্ধি মাত্র ২.৩ শতাংশ। এরপর ২০২৫ সালে ব্যবহার হবে ৭৮.৬ শতাংশ, পুনরায় পাঁচ বছরে বৃদ্ধি মাত্র ২.৬ শতাংশ। এই ধীরগতিকে ‘গুরুতর নীতিগত ব্যর্থতা’ বলে ধারনা করা হচ্ছে।

আইন আছে, কাঠামো আছে কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। আয়োডিন অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধ আইন ১৯৮৯ আইন রহিতক্রমে পরবর্তী ২০২১ সালে “আয়োডিন যুক্ত লবণ আইন ২০২১” এর পরও উৎপাদক থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল কার্যত কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং দুর্বল, মান নিয়ন্ত্রণে শিথিলতা এবং শুল্ক মুক্ত কাঁচা লবণ প্রবেশের সুযোগে এখনো অ-আইোডাইজড বা অপর্যাপ্ত আয়োডিনযুক্ত লবণ বাজারজাত হচ্ছে বলে ধারনা। প্রশ্ন উঠেছে, যখন দেশে ৯৫ শতাংশ লবণ উৎপাদক আয়োডিন মেশানোর সক্ষমতা রাখে, তখন মাত্র ৭৮ শতাংশ পরিবার আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করছে কেন?

সচেতনতা প্রচারেও শূন্যতা। সরকার ও বেসরকারি কার্যক্রমের প্রচার তুলনামূলক কমে গেছে। গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে উপকূলীয় ও পাহাড়ি এলাকায় বহু পরিবার এখনো জানে না আয়োডিন ঘাটতি কীভাবে শিশুর মেধা, থাইরয়েড ও গর্ভবতী নারীর স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। ২০২২ সালে ইসলামপুর ইউনিয়নে দুই দিনের জন্য লবণ চাষীদের ঈএকটি শুমারি পরিচালিত করে সেখানেও এই রকম তথ্য পাওয়া যায়। অত্যন্ত কম খরচের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক হওয়া সত্ত্বেও কমিউনিটি-লেভেল প্রচারণা প্রায় অচল।

নীতি-ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা ও জবাবদিহির অভাব।‌ অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ইউনিভার্সাল সল্ট আয়োডাইজেশন (USI) কর্মসূচি এখন দায় সারা কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। বার্ষিক মূল্যায়ন নেই, মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার উপযুক্ত মাত্রায় কার্যকর নয়, জেলা পর্যায়ে কোনো বাধ্যতামূলক মনিটরিং কাঠামো নেই এবং আইন লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে।

ফলাফল, পাঁচ বছরে মাত্র ২.৮ শতাংশ বৃদ্ধি। সামান্য অগ্রগতি নয়, এটি সতর্কবার্তাও। এই অগ্রগতি উদযাপন যোগ্য নয়, বরং বিপরীত ভাবে গভীর উদ্বেগ জনক। যেসব দেশে আয়োডিন ঘাটতি একসময় প্রকট ছিল, যেমন নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম; তারা এখন ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। সেখানে বাংলাদেশ এখনো ৮০ শতাংশেও পৌঁছাতে পারেনি।

এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের মনে করেন, যতদিন মাঠ পর্যায়ে কঠোর মনিটরিং, উৎপাদকদের ওপর জবাবদিহি, এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে দৃশ্যমান আইনি প্রয়োগ শুরু না হবে, ততদিন আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব নয়।

জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে পাঁচ বছরে মাত্র ২.৮ শতাংশ উন্নতি, এটি স্বাভাবিক নয়, বরং সুস্পষ্ট নীতি ব্যর্থতার প্রতিফলন।

লেখক- শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক, লবণ চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বিশেষজ্ঞ।