আমার খুব ইচ্ছে, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে ছোট্ট একটা জমি কিনব, সেখানে নিজের একটা বাড়ি করব। জানি না, সেই স্বপ্ন কোনো দিন পূরণ হবে কি না। তবে স্বপ্নটা আমার আছে।
ধরুন, আমি জমি কিনলাম। বাড়ি করার টাকাও জোগাড় করলাম। কিন্তু বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে আমাকে কোথায় কোথায় অনুমোদনের জন্য যেতে হবে?
উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন দপ্তরে দৌড়াতে হবে। প্রতিটি দপ্তরের অনুমোদন নিতে গিয়ে যদি বছরের পর বছর কেটে যায়, তাহলে একজন সাধারণ মানুষ কিংবা উদ্যোক্তা কীভাবে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন? আমি বলছি না, অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণ করতে হবে। পরিবেশ রক্ষা করতে হবে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, আইন মেনেই স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু সেই অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করাও জরুরি।
কেউ নিয়ম মেনে অনুমোদন নিতে চাইলেন, কিন্তু যথাসময়ে প্রয়োজনীয় সেবা পেলেন না। অথচ তাঁর স্বপ্ন আছে, বিনিয়োগের সামর্থ্য আছে। শেষ পর্যন্ত তিনি যদি নিয়মের বাইরে গিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করেন, তাহলে শুধু তাঁকে দায়ী করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।
সম্প্রতি কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে বিভিন্ন স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযান ও ভাঙচুরের খবর সামনে এসেছে। টুকটুক রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনাও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, পর্যটন স্থাপনায় নিরাপত্তার বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
এই দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণ করতে হবে তদন্তের মাধ্যমে। যেসব স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা কিংবা অন্য কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেই, সেগুলোর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। পর্যটকদের জীবন নিয়ে কোনো আপস করা যাবে না।
কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন হচ্ছে, পরিবেশবান্ধব পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগগুলোকে আমরা কীভাবে উৎসাহিত করছি? পরিবেশের ক্ষতি না করে, আইন মেনে এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যাঁরা বিনিয়োগ করতে চান, তাঁদের জন্য কি পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে?
কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শুধু হোটেল-মোটেল নির্মাণ করলেই হবে না। প্রয়োজন পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট, পরিকল্পিত বিনোদনকেন্দ্র, মানসম্মত পর্যটনসেবা এবং পরিবার নিয়ে ঘোরাফেরা করার উপযোগী জায়গা।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে নানা ধরনের বিনোদন ও অবকাশযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদেরও নিজেদের পরিবেশ, সংস্কৃতি ও আইনকে সম্মান করে পর্যটনসেবার বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। মানুষ এখানে বেড়াতে আসবে, সমুদ্র দেখবে, প্রকৃতি উপভোগ করবে, পরিবার নিয়ে সময় কাটাবে। তাদের সেই চাহিদার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কক্সবাজারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত না করে বরং তাঁদের জন্য সহজ শর্তে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অনুমোদনের ব্যবস্থা করা উচিত। যাঁরা আইন ভাঙবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর যাঁরা নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে চান, তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
এবার আসি সাংবাদিকদের প্রসঙ্গে..
সম্প্রতি কক্সবাজারের কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাঁরা বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি করছেন কিংবা অর্থের বিনিময়ে অবস্থান নিচ্ছেন। সাংবাদিকদের একটি অংশের মধ্যে এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। এমনকি প্রেসক্লাবেও এ নিয়ে কথাকাটাকাটির খবর পাওয়া গেছে।
তবে অভিযোগ উঠলেই কাউকে দোষী বলা যায় না। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি। কেউ অপরাধ করলে তাঁর পরিচয় সাংবাদিক হলেও তদন্ত ও জবাবদিহির বাইরে থাকার সুযোগ নেই।
সাংবাদিকতার কাজ কাউকে অন্যায়ভাবে হয়রানি করা নয়। আবার অনিয়মের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করাও সাংবাদিকতার অপরিহার্য দায়িত্ব। তাই ব্যক্তিগত স্বার্থ, আর্থিক লেনদেন কিংবা পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে থেকে সত্য তুলে ধরতে হবে।
সবশেষে বলতে চাই, কক্সবাজার শুধু আমাদের একটি পর্যটন শহর নয়, এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পর্যটন সম্ভাবনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে পরিবেশ রক্ষা, পর্যটকদের নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।
শুধু স্থাপনা ভেঙে কিংবা উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে পর্যটনের উন্নয়ন সম্ভব নয়। আবার আইন অমান্য করে, পরিবেশ ধ্বংস করে কিংবা মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলেও পর্যটনের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
আমাদের প্রয়োজন পরিকল্পিত উন্নয়ন, স্বচ্ছ প্রশাসন, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং পর্যটন খাতে দেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার কার্যকর উদ্যোগ।
আসুন, আমরা সবাই মিলে কক্সবাজারকে ভালোবাসি। কক্সবাজারকে এমন একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলি, যেখানে প্রকৃতি সুরক্ষিত থাকবে, পর্যটকরা নিরাপদ থাকবেন, উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন এবং স্থানীয় মানুষও উন্নয়নের সুফল পাবেন।
লেখক
তৌফিক লিপু
সিইও
টিটিএন
তৌফিক লিপু 




















