বিয়ের প্রতিশ্রুতি, গর্ভে অনাগত সন্তান আর প্রিয় মানুষের স্বীকৃতি চেয়ে শেষ পর্যন্ত থানায় অভিযোগ করেছিলেন সুমাইয়া আক্তার ওরফে ইশরাত। অভিযোগ ছিল, প্রেমিক সাইফুল ইসলাম হৃদয় তাকে বিয়ের আশ্বাসে সঙ্গে রাখলেও অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর গর্ভপাতের জন্য চাপ দেন। এতে রাজি না হওয়ায় মারধর, ভয়ভীতি ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছিলেন তিনি।
মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক লাইভে নিজের অসহায়ত্ব, নিরাপত্তাহীনতা ও বিচার পাওয়ার আকুতি তুলে ধরেছিলেন সুমাইয়া। এর পরদিনই কক্সবাজার শহরের পেশকার পাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ।
রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুরে পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে। নিহত সুমাইয়া চৌফলদণ্ডীর সিকদার পাড়া এলাকার মৃত মোক্তার আহম্মদের মেয়ে।
সুমাইয়ার ৪ আগস্ট কক্সবাজার সদর মডেল থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় এক বছর আগে সাইফুল ইসলাম হৃদয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
অভিযোগে বলা হয়, চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি থেকে বিয়ের আশ্বাসে সাইফুল তাকে কক্সবাজার পৌরসভার গোলদীঘির পাড় এলাকার একটি ভাড়া বাসায় রাখেন। সেখানে তারা স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করতেন।
একপর্যায়ে সুমাইয়া অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। এরপর থেকেই সম্পর্কের অবনতি শুরু হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। গর্ভের সন্তান নষ্ট করার জন্য সাইফুল চাপ দিতে থাকেন এবং এতে রাজি না হওয়ায় তাকে মারধর ও ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে থানায় দেওয়া অভিযোগে উল্লেখ করেন সুমাইয়া।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই বিকেলে কলাতলী এলাকার একটি হোটেলে নিয়ে গিয়েও অনাগত সন্তান নষ্ট করার উদ্দেশ্যে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। সন্তান নষ্ট করতে অস্বীকৃতি জানালে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে সাইফুলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদনও করেছিলেন সুমাইয়া।
থানায় অভিযোগ দেওয়ার পাশাপাশি নিজের ওপর কথিত নির্যাতনের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুক লাইভে তুলে ধরেন সুমাইয়া। মৃত্যুর আগে টিটিএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও তিনি মারধর, হুমকি ও ভয়ভীতির অভিযোগ করেছিলেন।
স্বজনদের ভাষ্য, শুধু ভালোবাসার মানুষটির কাছেই নয়, সামাজিক স্বীকৃতির আশায় সুমাইয়া বিভিন্নজনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। এমনকি সাইফুলের বাড়িতেও গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে অপমান ও মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
সুমাইয়ার বড় বোনের দাবি, বিয়ের স্বীকৃতি ও অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে গেছেন তার বোন। কিন্তু সেই আকুতির কোনো সমাধান হয়নি।
সুমাইয়ার মৃত্যুর পর সাইফুল ইসলাম হৃদয় আত্মগোপনে রয়েছেন বলে দাবি করেছেন তার স্বজনরা। তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, কলাতলির সোহেল, বাহারছড়ার আরিফ ও তার স্ত্রী সেলিনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুমাইয়াকে নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট করলেও তার মৃত্যুর ঘটনায় নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন বলে জানা গেছে।
সুমাইয়ার স্বজনরা এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
তবে থানায় করা অভিযোগের সঙ্গে সুমাইয়ার মৃত্যুর সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটুকু এবং মৃত্যুর নেপথ্যে কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তদন্তের পরই তা স্পষ্ট হবে।
বেঁচে থাকতে সুমাইয়া লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। প্রকাশ্যে বিচার চেয়েছিলেন। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কথাও জানিয়েছিলেন। কিন্তু একদিন পরই তার কণ্ঠ থেমে গেল।
তার রেখে যাওয়া অভিযোগ, ফেসবুক লাইভ, স্বজনদের বক্তব্য এবং মৃত্যুর ঘটনাকে সামনে রেখে নিরপেক্ষ তদন্তই দিতে পারে সেই প্রশ্নের উত্তর।
ভালোবাসা, বিয়ের স্বীকৃতি আর অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ চেয়ে যে তরুণী শেষ পর্যন্ত দ্বারে দ্বারে ঘুরেছিলেন, তার মৃত্যু যেন আরেকটি অমীমাংসিত গল্প হয়ে না থাকে। সত্য উদঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন পরিবারের প্রধান দাবি।
শাহেদ হোছাইন মুবিন 

















