অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয় ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ। সেই কঠিন বাস্তবতার প্রমাণ পাওয়া যায় পরিসংখ্যানেই। গত চারটি অ্যাশেজ সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২০টি টেস্ট খেলে ইংল্যান্ড জিততে পেরেছে মাত্র একটি। সেই ইংল্যান্ড দলে ছিলেন অ্যালেস্টার কুক, কেভিন পিটারসেন, ইয়ান বেল, জো রুট, জনি বেয়ারস্টো, বেন স্টোকস, মইন আলি, জিমি অ্যান্ডারসন, স্টুয়ার্ট ব্রড, মার্ক উড ও ক্রিস ওকসের মতো বিশ্বমানের ক্রিকেটাররা।
কেউ ছিলেন কিংবদন্তি, কেউ ছিলেন সময়ের সেরা ক্রিকেটার। অথচ তারাও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ধারাবাহিক সাফল্য এনে দিতে পারেননি। এই বাস্তবতাই বলে দেয়, অস্ট্রেলিয়ায় একটি টেস্ট জয় কতটা কঠিন।
সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে প্রথম টেস্টেই জয় তুলে নিয়ে বাংলাদেশ লিখেছে এক অনন্য ইতিহাস। এটি শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়, বরং বিশ্ব ক্রিকেটের কাছে বাংলাদেশের সামর্থ্যের বড় এক ঘোষণা।
অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট জয়ের কঠিন পথের উদাহরণ আরও অনেক। ভারত সর্বশেষ সফরে পাঁচ টেস্ট খেলে একটি জয় পেয়েছে। নিউজিল্যান্ড গত দুটি অস্ট্রেলিয়া সফরে পাঁচ টেস্ট খেলেও জিততে পারেনি কোনো ম্যাচ। দক্ষিণ আফ্রিকাও সর্বশেষ সফরে তিন টেস্টে জয়হীন ছিল। পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সর্বশেষ টেস্ট জিতেছে ১৯৯৫ সালে, এরপর তাদের হারতে হয়েছে টানা ১৭ টেস্টে। শ্রীলঙ্কা এখনো অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট জয় পায়নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঐতিহাসিক জয়ও এসেছিল দীর্ঘ অপেক্ষার পর, শামার জোসেফের অসাধারণ পারফরম্যান্সে।
এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, বাংলাদেশের অর্জন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।
তবে সিরিজের শেষ ম্যাচে এসে হতাশ করেছে বাংলাদেশের ব্যাটিং। আগের দিনের তুলনায় উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য কিছুটা ভালো ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি টাইগার ব্যাটাররা। কে কার চেয়ে বাজে শট খেলেছেন, সেটি নিয়েই যেন তৈরি হয়েছিল অদৃশ্য প্রতিযোগিতা।
এক টেস্টে দুই ইনিংসে প্রথমবারের মতো ১০০ রানের নিচে অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গত ৯৪ বছরের মধ্যে এটিও অন্যতম সংক্ষিপ্ত টেস্ট। যদিও এই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ব্যর্থতারও ভূমিকা ছিল। তারা যদি দীর্ঘ সময় ব্যাট করতে পারত, তাহলে ম্যাচের দৈর্ঘ্য আরও বাড়তে পারত। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
এই ব্যর্থতার মধ্যে আলাদা করে আলোচনায় আসবেন লিটন দাস। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে ভালো করার মতো সব ধরনের দক্ষতা তার ব্যাটিংয়ে রয়েছে। তাই তাকে ঘিরে প্রত্যাশাও ছিল অনেক বেশি।
প্রথম টেস্টে দীর্ঘ বিরতির পর মাঠে নামার কারণে কিছুটা জড়তা থাকতেই পারে বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টের দুই ইনিংসে তার ব্যাটিং ছিল হতাশাজনক। অথচ এর আগের ম্যাচেই দলের কঠিন সময়ে অসাধারণ সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। তার পরের ইনিংসেও করেছিলেন ৬৯ রান। এর আগের টেস্টেও ছিল শতরানের ইনিংস।
তবুও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বড় পারফরম্যান্স একজন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়। সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় হতাশ হবেন লিটন নিজেও।
কিন্তু একটি খারাপ ম্যাচ বা কিছু ব্যর্থতা বাংলাদেশের পুরো সফরের অর্জনকে ম্লান করতে পারে না। সফর শুরুর আগে যদি বলা হতো, বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ায় একটি টেস্ট জিতবে এবং সিরিজ ড্র করবে, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে সবাই আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করতেন।
কারণ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি টেস্ট জয়ই অনেক বড় অর্জন। আর বাংলাদেশের সেই জয় কোনো ভাগ্যের সহায়তায় পাওয়া জয় ছিল না। পুরো ম্যাচে একটি সেশনও পুরোপুরি পিছিয়ে না থেকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দাপট দেখিয়ে জয় তুলে নিয়েছিল বাংলাদেশ।
টেস্ট জয় কখনো ফ্লুক হয় না। বিশেষ করে যখন একটি দল পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে, তখন সেটি যোগ্যতারই প্রমাণ।
বাংলাদেশের সেই জয় অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট মহল, বিশ্বজুড়ে ক্রিকেট বিশ্লেষক ও সাবেক ক্রিকেটারদের প্রশংসা পেয়েছে। ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে যেভাবে আলোচনা হয়েছে, যেভাবে নতুন করে সম্মান তৈরি হয়েছে, তা দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম বড় অর্জন।
গত ২৫ টেস্টে বাংলাদেশের ১২টি জয় দেখাচ্ছে, দলটি ধীরে ধীরে উন্নতি ও ধারাবাহিকতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটির জয় ছিল সেই উন্নতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
শেষ ম্যাচে হারের পরও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকাররা বাংলাদেশের লড়াইয়ের প্রশংসা করেছেন। সাবেক অস্ট্রেলিয়ান পেসার ও ধারাভাষ্যকার ব্রেন্ডন জুলিয়ানও বলেছেন, দুই ইনিংসে ১০০ রানের নিচে অলআউট হলেও বাংলাদেশ মাথা উঁচু করেই দেশে ফিরতে পারে।
সিরিজ জয়ের সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আক্ষেপ থাকবে। বিশেষ করে ম্যাকাই টেস্টে ব্যাটিং ব্যর্থতা নিয়ে আত্মসমালোচনার জায়গাও আছে। কিন্তু সেই হতাশার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক অর্জন।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের এই জয় শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসের জয়। এটি প্রমাণ করেছে, বিশ্বাস, পরিকল্পনা ও লড়াইয়ের মানসিকতা থাকলে বিশ্বের যেকোনো শক্তিশালী দলের বিপক্ষেই ইতিহাস তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশের সেই জয় ইতিহাসে লেখা থাকবে। থাকবে গর্বের এক অধ্যায় হয়ে।
সায়ন্তন ভট্টাচার্য 






















