টানা দুই দিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজার ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে নেমে এসেছে ভয়াবহ দুর্যোগ। পাহাড়ধস, পাহাড়ি ঢল ও দেয়াল ধসের ঘটনায় একদিনেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১১ জন। নিহতদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ৮ জন, কক্সবাজার শহরে ১ জন এবং পেকুয়া ও নাইক্ষ্যংছড়িতে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা, সড়ক ক্ষয়, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন লাখো মানুষ।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। সোমবার দিবাগত রাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জামতলী, কুতুপালং ও বালুখালী ক্যাম্পে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসের ঘটনায় নারী ও শিশুসহ ৮ রোহিঙ্গা নিহত হন।
প্রথমে রাত ১টা ১০ মিনিটে পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী ক্যাম্পের ডি-৬ ব্লকে পাহাড়ধসে মোহাম্মদ কামাল হোসাইন, তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস নিহত হন। আহত হন আরও দুইজন।
এরপর রাত ১টা ৪৫ মিনিটে কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে মাটি চাপা পড়ে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়।
সবশেষে রাত ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি-১১ ব্লকে পাহাড়ধসে উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩) নিহত হন। আহত হন আরও একজন। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের কয়েক ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানে হতাহতদের উদ্ধার করা হয়।
এদিকে কক্সবাজার শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তারঘোনা এলাকায় ভোররাতে পাহাড়ধসে একটি বসতঘর চাপা পড়ে। স্থানীয়রা পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে আলী আকবর নামে একজনকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের খলিফামুড়া এলাকায় সোমবার দুপুরে বাড়ির পাশের পাহাড় ধসে দেয়াল ভেঙে পড়ে। দেয়ালচাপায় নিহত হয় সাত বছর বয়সী মো. মিনহাজ উদ্দিন। সে স্থানীয় কলিম উল্লাহর ছেলে।
অন্যদিকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের রাঙ্গাঝিরি ছড়ায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভেসে মারা যায় পাঁচ বছর বয়সী আলিয়া সোলতানা। একই সঙ্গে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধস, সড়ক ক্ষয়, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও জলাবদ্ধতায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, টানা বর্ষণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। আগামী দুই দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে নতুন করে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
প্রতি বর্ষাতেই পাহাড়ধসের ঝুঁকির সতর্কতা দেওয়া হলেও প্রাণহানির মিছিল থামছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসতি উচ্ছেদ, নিরাপদ পুনর্বাসন এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত না হলে এমন ট্র্যাজেডি ভবিষ্যতেও পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















