বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের পরও থামছে না ইয়াবা, আইস, স্বর্ণের বার, বার্মিজ গরুসহ বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালান। প্রায় প্রতিদিনই সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক ও চোরাই পণ্য জব্দ হলেও এসব অবৈধ বাণিজ্যের নেপথ্যের মূল সমন্বয়কারীদের নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।
সম্প্রতি সীমান্ত এলাকার চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ে অনুসন্ধানে স্থানীয়দের অভিযোগ, মামলার নথি এবং পুলিশের অপরাধ তথ্য (পিসিপিআর) পর্যালোচনায় উঠে এসেছে রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান এমইউপি সদস্য শাহাজাহান সিরাজ শাকিলের নাম।
অনুসন্ধানে পাওয়া পিসিপিআর অনুযায়ী, শাকিলের বিরুদ্ধে কক্সবাজারের রামু ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় অন্তত সাতটি মামলা রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে বিশেষ ক্ষমতা আইন, সরকারি কাজে বাধা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, অনধিকার প্রবেশ, হামলা এবং হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাও রয়েছে। নথি অনুযায়ী, কয়েকটি মামলায় তদন্ত শেষে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং অন্যগুলো বিচারাধীন বা তদন্তাধীন রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুইজন স্থানীয় বাসিন্দা, যাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় ও বক্তব্য নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। তারা দাবি করেন যে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে সীমান্তকেন্দ্রিক অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত কয়েকজনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম, জারুলিয়াছড়ি, ফুলতলি, লেবুছড়িসহ বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা, আইস, স্বর্ণের বার, বার্মিজ গরু বাংলাদেশে প্রবেশ করে। একইভাবে বাংলাদেশ থেকে চাল, ডাল, তেল, ঔষধ, সিমেন্ট, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন পণ্য সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে পাচার করা হয়।
তাদের দাবি, সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় একাধিক সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্রের সঙ্গে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি যুক্ত রয়েছেন। তাদের অভিযোগ, আওয়ামীলীগ আমলে তাদের সাথে সুসম্পর্ক আর বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের সাখে সুসম্পর্ক রেখে এই অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রন করেন শাকিল। এসব সিন্ডিকেটের অন্যতম সমন্বয়কারী তিনি। এছাড়া সীমান্তের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত ডাকাত শাহিনের সবকিছু তদারকি করেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। শাহীন কারাগারে থাকায় সীমান্তের আরেক চোরা কারবারি ডাকাত আব্দুর রহিমের সাথেও রয়েছে সখ্যতা।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পণ্য বহনের সময় যাদের আটক করা হয়, তাদের অধিকাংশই কেবল বহনকারী। স্থানীয়দের ভাষ্য, অল্প টাকার বিনিময়ে দরিদ্র মানুষকে ব্যবহার করা হলেও মূল অর্থদাতা ও পরিকল্পনাকারীরা অধিকাংশ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাগালের বাইরে থেকে যান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কয়েক বছর আগেও শাকিল স্থানীয়ভাবে বাঁশ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে স্থানীয় রাজনীতির পাশাপাশি সীমান্তকেন্দ্রিক ব্যবসায় সম্পৃক্ত হওয়ার পর তার আর্থিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। বর্তমানে তার সম্পদের উৎস নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সীমান্তে বিজিবির সাথে গরু পাচার নিয়েও সংঘর্ষ হলে বিজিবির করা মামলার আসামিও হোন এই বিতর্কিত ইউপি সদস্য শাকিল।
সীমান্ত চোরাচালানকে কেন্দ্র করে গত এক দশকে হত্যাকাণ্ড, সংঘর্ষ, অপহরণ, মাইন বিস্ফোরণ এবং সশস্ত্র সহিংসতার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সীমান্তবাসী নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন বলে দাবি করেন।
স্থানীয় রাফি (ছদ্মনাম, প্রতিবেদকের কাছে বক্তব্য সংরক্ষিত) অভিযোগ করেন, সীমান্তের কয়েকটি চোরাচালান চক্র ও আরাকান আর্মির সঙ্গে শাকিলের ব্যবসায়িক যোগাযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদন প্রকাশের আগে এমইউপি সদস্য শাহাজাহান সিরাজ শাকিলের বক্তব্য নেওয়া হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, একটি কুচক্রী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
সীমান্ত দিয়ে পণ্য পাচারের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে শাকিল বলেন, তিনি বৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং চোরাচালানের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধি হওয়ায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে। তবে প্রতিবেদকের কাছে থাকা পিসিপিআরে উল্লেখিত সাতটি মামলার বিষয়ে তিনি একমত নন। তিনি কেবল একটি মামলার কথা স্বীকার করেন।
এ বিষয়ে রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির ভূঁইয়া বলেন, “বর্তমানে সীমান্তে নতুন করে চোরাচালানের বিষয়ে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে শাকিল মেম্বারকে ঘিরে যেসব অভিযোগ শোনা যাচ্ছে, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্তে চোরাচালান ও মাদক পাচার রোধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















