কক্সবাজারের পেকুয়া থানায় ঢুকে হট্টগোল, পুলিশের সঙ্গে হাতাহাতি, আত্মহত্যার হুমকি এবং নিজেদের আঘাত করে পুলিশকে ফাঁসানোর চেষ্টার অভিযোগে এক কলেজছাত্রী ও তাঁর মাকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পুলিশের দাবি, পূর্বপরিকল্পিতভাবে থানায় গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে পুলিশ সদস্যদের ভুক্তভোগী বানানোর চেষ্টা করেছিলেন ওই মা–মেয়ে।
গত বুধবার (৪ মার্চ) বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে পেকুয়া থানায় ঘটে এই নাটকীয় ঘটনা। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন কলেজছাত্রী জুবাইদা জন্নাত (২৩) ও তাঁর মা রেহেনা মোস্তফা রানু (৩৮)। জুবাইদা চট্টগ্রাম সিটি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁরা পেকুয়া উপজেলার সাবেক গুলদি এলাকার মৃত নুরুল আবছারের মেয়ে ও স্ত্রী।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, জুবাইদা জন্নাতের পৈতৃক বসতভিটা নিয়ে চকরিয়া আদালতে একটি মামলা চলমান রয়েছে। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পেকুয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব ঘোষ। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে মা–মেয়ে থানায় গিয়ে তর্কাতর্কি শুরু করেন বলে জানায় পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে তাঁরা তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যেই বিষয়টি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং মা–মেয়ে উচ্চস্বরে চিৎকার–চেঁচামেচি শুরু করেন। এতে থানার ভেতরে উপস্থিত অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে আতঙ্ক ও অস্বস্তির সৃষ্টি হয়।
এদিকে শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তিনটি ভিডিওতে দেখা যায়, জুবাইদা জন্নাত ও তাঁর মা পেকুয়া থানার দ্বিতীয় তলায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল আলমের কক্ষের সামনে গিয়ে উচ্চস্বরে চিৎকার করতে থাকেন। একপর্যায়ে তাঁরা উত্তেজিত আচরণ করতে থাকেন এবং থানার পরিবেশ অস্থির হয়ে ওঠে।
পুলিশের দাবি, ওই সময় মা–মেয়ে থানার ভেতরেই বিষপান করে আত্মহত্যার হুমকি দেন। পাশাপাশি নিজেদের শরীরে আঘাত করে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এগিয়ে গেলে তাঁরা পুলিশের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।
পুলিশ সূত্রের দাবি, মা–মেয়ে একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে গালিগালাজ করেন এবং মারধরের চেষ্টা করেন। এতে কিছু সময়ের জন্য থানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, পরিস্থিতি একপর্যায়ে আরও নাটকীয় রূপ নেয়। ওসি তাঁদের শান্ত হয়ে কথা বলার আহ্বান জানালে জুবাইদা জন্নাত আরো বিশৃঙ্খল আচরণ করেন। এতে থানার ভেতরে উপস্থিত সবাই বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন। পরে নারী পুলিশ সদস্যরা তাঁদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে মা–মেয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা ধাওয়া করে তাঁদের আটক করেন।
পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল আলম বলেন,
“পরিকল্পিতভাবে থানায় এসে তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। নারী হওয়ার সুযোগ নিয়ে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। পুলিশকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেই পুরো নাটক সাজানো হয়েছিল।”
ঘটনার সময় উপস্থিত উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব ঘোষ বলেন,
“আমি পুরো সময় ওসি স্যারের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভিডিওতেও সেটি স্পষ্ট। পুলিশ তাঁদের মারধর করেনি। বরং তাঁরা নারী পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, জমি সংক্রান্ত মামলায় কাগজপত্রের বাইরে গিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এ কারণে তাঁরা ক্ষুব্ধ হয়ে এমন আচরণ করেছেন।
বুধবারের এ ঘটনার পর খবর পেয়ে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুল আলম থানায় যান এবং সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।
ইউএনও মাহবুবুল আলম বলেন, থানায় সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং দায়িত্ব পালনরত পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনায় তাঁদের এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
তবে জুবাইদা জন্নাতের পরিবারের দাবি ভিন্ন। তাঁদের অভিযোগ, জমি সংক্রান্ত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন তাঁদের পক্ষে দেওয়ার আশ্বাসে ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে বিপক্ষে প্রতিবেদন দেওয়ায় তাঁরা টাকা ফেরত চাইতে থানায় যান।
পরিবারের দাবি, টাকা ফেরত চাইতে গেলে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় এবং মারধর করা হয়। পরে উল্টো তাঁদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অভিযুক্ত মা-মেয়ের এক নিকটাত্মীয়ের একটি ভিডিও বক্তব্যের মাধ্যমে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। প্রথমদিকে ভুক্তভোগীর ওই আত্মীয়ের কথা শুনে অনেকেই পুলিশকে দায়ী করে ফেইসবুক পোস্ট দিতে থাকেন এবং মা–মেয়ের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন।
কিন্তু শুক্রবার ঘটনার মূল ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনার ভিন্ন চিত্র সামনে আসে বলে দাবি স্থানীয় সচেতন মহলের।
পেকুয়ার সচেতন মহলের কয়েকজনের মতে, ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায় মা–মেয়ে থানার ভেতরে উত্তেজিত আচরণ করছেন এবং বারবার পরিস্থিতি অস্থির করে তুলছেন। তাঁদের মতে, ঘটনাস্থলের ভিডিওগুলো প্রকাশ্যে না এলে একতরফাভাবে পুলিশকে দায়ী করে জনমত তৈরি হতে পারত।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মা–মেয়ে পরিকল্পিতভাবে থানায় ঢুকে যে ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছেন, তা কল্পনাতীত। একই সঙ্গে ভিডিওতে পুলিশ সদস্যদের ধৈর্যশীল আচরণও চোখে পড়েছে।
ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মন্তব্য করছেন, আংশিক ভিডিও বা একতরফা তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত মতামত দেওয়া কতটা বিভ্রান্তিকর হতে পারে, এই ঘটনা তার একটি উদাহরণ।
স্থানীয়দের মতে, পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তবে থানার ভেতরে এমন নাটকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশেষ প্রতিবেদক 


















