ঢাকা ০২:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বিডিআর হত্যাকাণ্ড দেশের জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী লামায় বন্য হাতির আক্রমনে একজনের মৃত্যু শহীদ সেনাসদস্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন নবনিযুক্ত আইজিপি যাকাত ও ফিতরার মধ্যে পার্থক্য কী? মশার যন্ত্রণা থেকে নগরবাসীকে দ্রুত স্বস্তি দিতে কাজ চলছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিডিআর হত্যাকাণ্ডে নতুন কোনো তদন্ত কমিশন হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পিলখানা ট্র্যাজেডির ১৭ বছর, জাতীয় শহীদ সেনা দিবস আজ মারামারির মামলায় সেন্টমার্টিনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে দুই বছর কারাদন্ড জনপ্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষায় আরও পরিবর্তন আসছে পিলখানা হত্যাকাণ্ড: বিস্ফোরক মামলার ফের তদন্ত চায় আসামিপক্ষ, রাষ্ট্রপক্ষ চায় দ্রুত বিচার বরকতময় খাবার সেহরি ​টেকনাফে ছাত্রদল নেতা আয়াছুল আলমের ইফতার বিতরণ টেকনাফে এক জালে ১১০০ লাল কোরাল, ৩১ লাখ টাকায় বিক্রি সামনের ইউপি নির্বাচনে সেন্টমার্টিনের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী যারা!

জনপ্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষায় আরও পরিবর্তন আসছে

  • টিটিএন ডেস্ক:
  • আপডেট সময় : ১১:১৪:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • 66

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দ্রুত পরিবর্তন শুরু হয়েছে। জনপ্রশাসন, পুলিশ ও শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে বড় রদবদল চলছে। ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

চুক্তিতে থাকা ৯ জন সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবের নিয়োগ বাতিল, কয়েকজন সচিবকে সংযুক্ত করা এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য হয়ে পড়ায় প্রশাসনে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। সামনে আরও সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও আইজিপি পদে নতুন নিয়োগ। চুক্তিতে থাকা নয়জন সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল।

এখন ১২টি সচিব পদ ফাঁকা

সচিবালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, চুক্তি বাতিল ও সংযুক্ত করার ফলে বর্তমানে অন্তত ১২টি সচিব ও সমপর্যায়ের পদ শূন্য হয়েছে। এসব পদে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। জেলা প্রশাসক (ডিসি) পর্যায়েও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও ধাপে ধাপে পরিবর্তন আসতে পারে।

এর মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সচিব মো. আবদুর রহমান তরফদারকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে বদলি করা হয়েছে। আর শ্রমসচিব মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়াকে পিএসসির সচিব করা হয়েছে।

এ ছাড়া গতকাল অবসরপ্রাপ্ত সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব পদে চুক্তি ভিত্তিতে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

পদায়ন নিয়ে আলোচনা

প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনে কিছু পরিবর্তন স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু বড় প্রশ্নটি হলো, নিয়োগ ও পদায়নে যেন মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আবার কেউ যেন অহেতুক সমস্যায় না পড়েন, সেটিও দেখা উচিত। পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। পদায়ন ও বদলি নিয়ে তদবির বেড়েছে বলেও কর্মকর্তারা জানান।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাপক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়টিও এখন আলোচনার মধ্যে রয়েছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, ওই সময় চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া অনেক কর্মকর্তার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে একান্ত অপরিহার্য ছাড়া নতুন করে আর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দেওয়ার কথাও বলছেন অনেকে।

জনপ্রশাসনে প্রথম ধাপের রদবদল

সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যেই জনপ্রশাসনে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়। গত সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে তিন সচিবকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। তাঁরা হলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন।

একই সঙ্গে চুক্তিতে থাকা নয়জন সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়েছে। এর আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে সরে যান। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক এই তিন অতিরিক্ত সচিবকে চুক্তি ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে পদোন্নতির মাধ্যমে এসব পদে দায়িত্ব দিয়েছিল।

নতুন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে চুক্তি ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, যিনি আগে বিএনপি চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব ছিলেন।

পুলিশের নেতৃত্বে পরিবর্তন

প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীতেও পরিবর্তন শুরু হয়েছে। গতকাল পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আলী হোসেন ফকির। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদ থেকে পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে আইজিপি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পুলিশের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসতে পারে। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার পদ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও বাহিনীর প্রতি জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা—এই দুটি বিষয় সামনে রেখে যেন পরিবর্তনগুলো হয়, সেই প্রত্যাশাও আছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশের নেতৃত্বে পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। তবে পেশাদারত্ব বজায় রাখা ও বাহিনীকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) মহাপরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মোহাম্মদ আবদুর রকিবকে। তিনি এত দিন এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের কর কমিশনারের চলতি দায়িত্বে ছিলেন।

শিক্ষা প্রশাসনেও নতুন সমীকরণ

পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে উচ্চশিক্ষা প্রশাসনেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খান অব্যাহতির আবেদন জমা দিয়েছেন। এখানে নতুন উপাচার্য নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে। বিএনপিপন্থী বেশ কিছু শিক্ষকের মধ্যে পদ পাওয়ার তৎপরতা বেড়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রায় অর্ধশত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মধ্যে বেশ কিছু পদে পরিবর্তন আসতে পারে।

এদিকে শিক্ষা খাতের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্বহীন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে গত বছরের ১৫ অক্টোবর থেকে মহাপরিচালকের পদ শূন্য। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডেও চেয়ারম্যান নেই। এসব পদে দ্রুত নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে।

শিক্ষকেরা বলছেন, শিক্ষা প্রশাসনে স্থিতিশীল নেতৃত্ব না থাকলে কোনো সংস্কার টেকসই হয় না। তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও পেশাগত সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

অতীত অভিজ্ঞতা ও পুনর্বিন্যাস

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছরের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এরপর প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তন হয়। প্রথম ছয় মাসেই জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদে ১৪ জন, গ্রেড-১ পদের ১ জন ও অতিরিক্ত সচিব পদের ১৯ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। একই সময়ে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদের ২৩ জন, গ্রেড-১ পদের ২ জন ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের ৫১ কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। এরপর আরও বেশ কিছু কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়।

অন্যদিকে সচিবসহ বেশ কিছু পদে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এখনো বেশ কয়েকজন সচিব চুক্তিতে আছেন। আবার ডিসি নিয়োগসহ বিভিন্ন পদে পদায়নে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমনকি এ নিয়ে হট্টগোল ও ধাক্কাধাক্কির মতো ঘটনাও ঘটে।

প্রশাসনের ভেতরে কিছু কর্মকর্তার অভিযোগ, তখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে সঠিক বাছবিচার ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যা অসন্তোষ সৃষ্টি করে। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের বড় কোনো সুপারিশও বাস্তবায়ন করে যেতে পারেনি সেই সরকার। কিছু মুখকে সরিয়ে দেওয়া ছাড়া জনপ্রশাসনে সেই পুরোনো চর্চাই অব্যাহত ছিল। ফলে এবার প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য বজায় রাখার প্রত্যাশা বেড়েছে।

‘দলীয়করণ নয়

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন সরকার প্রশাসনে পরিবর্তন আনবে, এটি স্বাভাবিক। তবে অতীতের মতো দলীয়করণের অভিযোগ যেন না ওঠে, সেটিই এখন বড় প্রত্যাশা। ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে প্রশাসনে নিয়োগ–বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা, দক্ষতাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনার প্রতিশ্রুতির কথা রয়েছে। বলা হয়েছে, ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ–বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে প্রশাসন গুছিয়ে নেওয়ার প্রবণতা থাকে। এটা হতেই পারে। কিন্তু গুছিয়ে নেওয়ার সময় দেখা হয় ‘আমাদের সঙ্গে ছিল কি না’। এ ক্ষেত্রে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মকর্তা ভুক্তভোগী হয়ে যান। এবার নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, আগের মতো যেন না হয়। নিরপেক্ষতা ও যোগ্যতা দেখেই যেন পরিবর্তনগুলো হয় এবং যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেউ যেন বঞ্চিত না হন।

সূত্র:প্রথম আলো

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

বিডিআর হত্যাকাণ্ড দেশের জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী

This will close in 6 seconds

জনপ্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষায় আরও পরিবর্তন আসছে

আপডেট সময় : ১১:১৪:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দ্রুত পরিবর্তন শুরু হয়েছে। জনপ্রশাসন, পুলিশ ও শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে বড় রদবদল চলছে। ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

চুক্তিতে থাকা ৯ জন সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবের নিয়োগ বাতিল, কয়েকজন সচিবকে সংযুক্ত করা এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য হয়ে পড়ায় প্রশাসনে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। সামনে আরও সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও আইজিপি পদে নতুন নিয়োগ। চুক্তিতে থাকা নয়জন সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল।

এখন ১২টি সচিব পদ ফাঁকা

সচিবালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, চুক্তি বাতিল ও সংযুক্ত করার ফলে বর্তমানে অন্তত ১২টি সচিব ও সমপর্যায়ের পদ শূন্য হয়েছে। এসব পদে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। জেলা প্রশাসক (ডিসি) পর্যায়েও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও ধাপে ধাপে পরিবর্তন আসতে পারে।

এর মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সচিব মো. আবদুর রহমান তরফদারকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে বদলি করা হয়েছে। আর শ্রমসচিব মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়াকে পিএসসির সচিব করা হয়েছে।

এ ছাড়া গতকাল অবসরপ্রাপ্ত সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব পদে চুক্তি ভিত্তিতে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

পদায়ন নিয়ে আলোচনা

প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনে কিছু পরিবর্তন স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু বড় প্রশ্নটি হলো, নিয়োগ ও পদায়নে যেন মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আবার কেউ যেন অহেতুক সমস্যায় না পড়েন, সেটিও দেখা উচিত। পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। পদায়ন ও বদলি নিয়ে তদবির বেড়েছে বলেও কর্মকর্তারা জানান।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাপক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়টিও এখন আলোচনার মধ্যে রয়েছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, ওই সময় চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া অনেক কর্মকর্তার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে একান্ত অপরিহার্য ছাড়া নতুন করে আর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দেওয়ার কথাও বলছেন অনেকে।

জনপ্রশাসনে প্রথম ধাপের রদবদল

সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যেই জনপ্রশাসনে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়। গত সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে তিন সচিবকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। তাঁরা হলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন।

একই সঙ্গে চুক্তিতে থাকা নয়জন সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়েছে। এর আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে সরে যান। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক এই তিন অতিরিক্ত সচিবকে চুক্তি ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে পদোন্নতির মাধ্যমে এসব পদে দায়িত্ব দিয়েছিল।

নতুন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে চুক্তি ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, যিনি আগে বিএনপি চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব ছিলেন।

পুলিশের নেতৃত্বে পরিবর্তন

প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীতেও পরিবর্তন শুরু হয়েছে। গতকাল পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আলী হোসেন ফকির। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদ থেকে পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে আইজিপি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পুলিশের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসতে পারে। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার পদ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও বাহিনীর প্রতি জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা—এই দুটি বিষয় সামনে রেখে যেন পরিবর্তনগুলো হয়, সেই প্রত্যাশাও আছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশের নেতৃত্বে পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। তবে পেশাদারত্ব বজায় রাখা ও বাহিনীকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) মহাপরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মোহাম্মদ আবদুর রকিবকে। তিনি এত দিন এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের কর কমিশনারের চলতি দায়িত্বে ছিলেন।

শিক্ষা প্রশাসনেও নতুন সমীকরণ

পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে উচ্চশিক্ষা প্রশাসনেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খান অব্যাহতির আবেদন জমা দিয়েছেন। এখানে নতুন উপাচার্য নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে। বিএনপিপন্থী বেশ কিছু শিক্ষকের মধ্যে পদ পাওয়ার তৎপরতা বেড়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রায় অর্ধশত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মধ্যে বেশ কিছু পদে পরিবর্তন আসতে পারে।

এদিকে শিক্ষা খাতের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্বহীন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে গত বছরের ১৫ অক্টোবর থেকে মহাপরিচালকের পদ শূন্য। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডেও চেয়ারম্যান নেই। এসব পদে দ্রুত নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে।

শিক্ষকেরা বলছেন, শিক্ষা প্রশাসনে স্থিতিশীল নেতৃত্ব না থাকলে কোনো সংস্কার টেকসই হয় না। তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও পেশাগত সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

অতীত অভিজ্ঞতা ও পুনর্বিন্যাস

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছরের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এরপর প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তন হয়। প্রথম ছয় মাসেই জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদে ১৪ জন, গ্রেড-১ পদের ১ জন ও অতিরিক্ত সচিব পদের ১৯ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। একই সময়ে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদের ২৩ জন, গ্রেড-১ পদের ২ জন ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের ৫১ কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। এরপর আরও বেশ কিছু কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়।

অন্যদিকে সচিবসহ বেশ কিছু পদে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এখনো বেশ কয়েকজন সচিব চুক্তিতে আছেন। আবার ডিসি নিয়োগসহ বিভিন্ন পদে পদায়নে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমনকি এ নিয়ে হট্টগোল ও ধাক্কাধাক্কির মতো ঘটনাও ঘটে।

প্রশাসনের ভেতরে কিছু কর্মকর্তার অভিযোগ, তখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে সঠিক বাছবিচার ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যা অসন্তোষ সৃষ্টি করে। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের বড় কোনো সুপারিশও বাস্তবায়ন করে যেতে পারেনি সেই সরকার। কিছু মুখকে সরিয়ে দেওয়া ছাড়া জনপ্রশাসনে সেই পুরোনো চর্চাই অব্যাহত ছিল। ফলে এবার প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য বজায় রাখার প্রত্যাশা বেড়েছে।

‘দলীয়করণ নয়

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন সরকার প্রশাসনে পরিবর্তন আনবে, এটি স্বাভাবিক। তবে অতীতের মতো দলীয়করণের অভিযোগ যেন না ওঠে, সেটিই এখন বড় প্রত্যাশা। ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে প্রশাসনে নিয়োগ–বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা, দক্ষতাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনার প্রতিশ্রুতির কথা রয়েছে। বলা হয়েছে, ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ–বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে প্রশাসন গুছিয়ে নেওয়ার প্রবণতা থাকে। এটা হতেই পারে। কিন্তু গুছিয়ে নেওয়ার সময় দেখা হয় ‘আমাদের সঙ্গে ছিল কি না’। এ ক্ষেত্রে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মকর্তা ভুক্তভোগী হয়ে যান। এবার নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, আগের মতো যেন না হয়। নিরপেক্ষতা ও যোগ্যতা দেখেই যেন পরিবর্তনগুলো হয় এবং যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেউ যেন বঞ্চিত না হন।

সূত্র:প্রথম আলো