ঢাকা ০৯:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি চর্চায় বিশ্বাসী’ – হিন্দু ক্যাম্পে ত্রাণ সচিব টেকনাফের বাহারছড়ায় বাড়িতে ঢুকে অস্ত্রের মুখে কৃষক রফিককে অপহরণ ধর্মের পরিচয়ে নয়, নাগরিক হিসেবে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান” মহানবমীতে মন্ডপে মন্ডপে মানুষের ঢল ঘরে ঘরে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করার চিন্তা রয়েছে সরকারের: মাতামুহুরীতে প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ‎ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কে গণডাকাতির ঘটনায় ‎ছাবের ডাকাতের স্ত্রী সন্তান গ্রেফতার : লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার দেশের বৃহত্তম প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠান সৈকতে : প্রধান অতিথি ভূমি প্রতিমন্ত্রী টেকনাফে পৃথক অভিযানে ৪ লাখ ৬০ হাজার ইয়াবাসহ আটক ৪ পেকুয়ায় ক্রীড়া সংস্থার কমিটি অনুমোদন: সভাপতি রফিকুল, সম্পাদক ছাফওয়ান সবাইকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে : প্রধানমন্ত্রী ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার: প্রধানমন্ত্রী মহানবমী আজ, শুরু দেবীর বিদায়ের ক্ষণগণনা আমাকে দেখলে তো লোকে সংবিধান বলে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিশেষ অভিযানে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার ৯ আইডিইবির সদস্যপদ পেলেন কক্সবাজারের ডিপ্লোমা প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল নোমান
বাঁকখালী উচ্ছেদ:

“আমরা খাজনা দিয়েছি, উচ্ছেদ করলে খাজনা নিলেন কেনো?”

  • আফজারা রিয়া
  • আপডেট সময় : ০৪:৪৫:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • 939

কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর তীরে উচ্ছেদ অভিযান তৃতীয় দিনে এসে বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় পেশকার পাড়ার বাসিন্দাদের বাঁধার মুখে শুরু করাই সম্ভব হয়নি অভিযান।

বুধবার সকালে বিআইডব্লিউটিএ ও জেলা প্রশাসনের বুলডোজারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সড়ক অবরোধ করে আটকে দেয় স্থানীয়রা। পরে পেছনে এসে নদীর অংশ থেকে অভিযান শুরু করার চেষ্টা করলে সেখানেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। শত-শত জনতা উভয় পাশে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এসব জায়গার বৈধ কাগজ ও খতিয়ান রয়েছে। তারা প্রাণ দিবেন তবে উচ্ছেদ অভিযান করতে দেবেন না। ফলে বেলা ৩ টা পর্যন্ত অভিযান শুরু করতে পারেননি প্রশাসন। ঘটনাস্থলে বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব ও সেনা বাহিনীর সদস্যের উপস্থিতিতে নির্বাহী ম্যাজিষ্টেট জনতাকে সরে যাওয়ার জন্য বার বার আহবান জানালেও তাদের সরানো যায়নি। স্থানীয়রা বিক্ষোভ করতে থাকেন।

এসময় স্থানীয় বাসিন্দা ওমর আলী বলেন, “হাসিনা জনগণের ওপর জুলুম করেছিল বলে বিতাড়িত হয়েছে। এখন ইউনুস সরকারও একই কাজ করছে। কোনো সরকার নিজের দেশের মানুষকে ঘরছাড়া করে না। আমরা কোনো অবস্থাতেই এই জায়গা ছাড়বো না।”

উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনাকারীদের পায়ে পড়ে আকুতি জানিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এক নারী বলেন, “আমি মুদি দোকান করে সংসার চালাই। স্বামী নেই, ছোট ছোট বাচ্চা আছে। দয়া করে আমার মাথার ছাদ কেড়ে নেবেন না।”

মাটি হাতে নিয়ে সাজেদা আক্তার বলেন, “এই ভিটা আমি অনেক কষ্টের পর পেয়েছি। আমার কাছে তো যাবতীয় সব কাগজপত্রও আছে। তবুও কেন আমার ভিটেমাটি ভাঙবেন?”

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে বসবাসের কথা উল্লেখ করে শায়েমা খাতুন বলেন, “বাপ-দাদার আমল থেকে আমরা এখানে আছি। এখন যদি উচ্ছেদ করেন তাহলে মেয়েদের বিষ খাইয়ে আমিও বিষ খেয়ে মরবো।”

এলাকাবাসীর দাবি, তারা বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও আজ রোহিঙ্গাদের মতো আচরণের শিকার হচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, খতিয়ান ও খাজনার কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে।

বিক্ষুব্ধরা বলেন, ” আমরা বাংলাদেশের নাগরিক, আমরা তো রোহিঙ্গা না। দেশের মানুষ হয়েও যদি এভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় তাহলে আমরা আর কি দাম পেলাম সরকারের কাছে।”

“সরকার আমাদেরকে মগের মুল্লুক পেয়েছে। নির্বাচন হলে কি আমরা ভোট দেব না বলেছি? কেন এমন জুলুম করছে আমাদের ওপর।”

“আমরা খাজনা দিয়েছি। এখন যদি উচ্ছেদ হয় তাহলে আমরা খাজনা কাকে দিলাম? এটা গরিব মানুষকে হয়রানি ছাড়া আর কিছু না।”

নিলামের বিষয়ে সরকারের কাছে জবাব চেয়ে আরেক বাসিন্দা বলেন, “আমাদের কাছে হোল্ডিং ট্যাক্সের কপি আছে। এই জায়গা যদি অবৈধ হয় তাহলে পৌরসভা ট্যাক্স নিল কেন? আর এই জায়গা গুলোর মালিক কি সরকার? তারা কোন অধিকারে এগুলো নিলাম করছে। আমাদেরকে জবাব দিতে হবে।”

এক পর্যায়ে বিকাল সোয়া ৩ টার দিকে বিআইডব্লিটিএ কর্তৃপক্ষ এবং আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযানস্থল থেকে সরে আসেন। এতে তৃতীয়দিনে কোন ধরণের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি।

সোমবার শুরু হয় বাঁকখালী নদীর তীরে অবৈধভাবে দখল করে তৈরি স্থাপনা উচ্ছেদের অভিযান। দুই দিনে অন্তত যেখানে ৭০ একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে।

দ্বিতীয় দিন অভিযানের শুরুতে অবৈধ দখলদারদের ছোঁড়া ইটের আঘাতে পুলিশের এক সদস্য আহত হয়েছে। এসময়  ৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এব্যাপারে পুলিশ বাদি হয়ে সরকারি কাজে বাঁধা প্রদান ও পুলিশের উপ হামলার আইনে মামলা করে ৪ জনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার সদর থানার ওসি ইলিয়াস খান।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ সূত্র জানিয়েছে, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে উৎপত্তি হয়ে ৮১ কিলোমিটারের বাঁকখালী নদীটি রামু ও কক্সবাজার সদর হয়ে শহরের কস্তুরাঘাট-নুনিয়াছটা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। নুনিয়ারছড়া থেকে মাঝিরঘাট পর্যন্ত ছয় কিলোমিটারে সবচেয়ে বেশি দখলের ঘটনা ঘটেছে। গত ১০ থেকে ১২ বছরে এই ছয় কিলোমিটারে ১ হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় ভূমি অফিস এবং বিআইডব্লিউটিএ যৌথভাবে বাঁকখালী নদীর অবৈধ দখলদারদের পৃথক তালিকা তৈরি করেছে । সহস্রাধিক অবৈধ দখলদার থাকলেও দুই তালিকায় স্থান পেয়েছে প্রায় সাড়ে ৩০০ জন প্রভাবশালী।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি চর্চায় বিশ্বাসী’ – হিন্দু ক্যাম্পে ত্রাণ সচিব

বাঁকখালী উচ্ছেদ:

“আমরা খাজনা দিয়েছি, উচ্ছেদ করলে খাজনা নিলেন কেনো?”

আপডেট সময় : ০৪:৪৫:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫

কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর তীরে উচ্ছেদ অভিযান তৃতীয় দিনে এসে বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় পেশকার পাড়ার বাসিন্দাদের বাঁধার মুখে শুরু করাই সম্ভব হয়নি অভিযান।

বুধবার সকালে বিআইডব্লিউটিএ ও জেলা প্রশাসনের বুলডোজারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সড়ক অবরোধ করে আটকে দেয় স্থানীয়রা। পরে পেছনে এসে নদীর অংশ থেকে অভিযান শুরু করার চেষ্টা করলে সেখানেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। শত-শত জনতা উভয় পাশে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এসব জায়গার বৈধ কাগজ ও খতিয়ান রয়েছে। তারা প্রাণ দিবেন তবে উচ্ছেদ অভিযান করতে দেবেন না। ফলে বেলা ৩ টা পর্যন্ত অভিযান শুরু করতে পারেননি প্রশাসন। ঘটনাস্থলে বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব ও সেনা বাহিনীর সদস্যের উপস্থিতিতে নির্বাহী ম্যাজিষ্টেট জনতাকে সরে যাওয়ার জন্য বার বার আহবান জানালেও তাদের সরানো যায়নি। স্থানীয়রা বিক্ষোভ করতে থাকেন।

এসময় স্থানীয় বাসিন্দা ওমর আলী বলেন, “হাসিনা জনগণের ওপর জুলুম করেছিল বলে বিতাড়িত হয়েছে। এখন ইউনুস সরকারও একই কাজ করছে। কোনো সরকার নিজের দেশের মানুষকে ঘরছাড়া করে না। আমরা কোনো অবস্থাতেই এই জায়গা ছাড়বো না।”

উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনাকারীদের পায়ে পড়ে আকুতি জানিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এক নারী বলেন, “আমি মুদি দোকান করে সংসার চালাই। স্বামী নেই, ছোট ছোট বাচ্চা আছে। দয়া করে আমার মাথার ছাদ কেড়ে নেবেন না।”

মাটি হাতে নিয়ে সাজেদা আক্তার বলেন, “এই ভিটা আমি অনেক কষ্টের পর পেয়েছি। আমার কাছে তো যাবতীয় সব কাগজপত্রও আছে। তবুও কেন আমার ভিটেমাটি ভাঙবেন?”

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে বসবাসের কথা উল্লেখ করে শায়েমা খাতুন বলেন, “বাপ-দাদার আমল থেকে আমরা এখানে আছি। এখন যদি উচ্ছেদ করেন তাহলে মেয়েদের বিষ খাইয়ে আমিও বিষ খেয়ে মরবো।”

এলাকাবাসীর দাবি, তারা বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও আজ রোহিঙ্গাদের মতো আচরণের শিকার হচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, খতিয়ান ও খাজনার কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে।

বিক্ষুব্ধরা বলেন, ” আমরা বাংলাদেশের নাগরিক, আমরা তো রোহিঙ্গা না। দেশের মানুষ হয়েও যদি এভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় তাহলে আমরা আর কি দাম পেলাম সরকারের কাছে।”

“সরকার আমাদেরকে মগের মুল্লুক পেয়েছে। নির্বাচন হলে কি আমরা ভোট দেব না বলেছি? কেন এমন জুলুম করছে আমাদের ওপর।”

“আমরা খাজনা দিয়েছি। এখন যদি উচ্ছেদ হয় তাহলে আমরা খাজনা কাকে দিলাম? এটা গরিব মানুষকে হয়রানি ছাড়া আর কিছু না।”

নিলামের বিষয়ে সরকারের কাছে জবাব চেয়ে আরেক বাসিন্দা বলেন, “আমাদের কাছে হোল্ডিং ট্যাক্সের কপি আছে। এই জায়গা যদি অবৈধ হয় তাহলে পৌরসভা ট্যাক্স নিল কেন? আর এই জায়গা গুলোর মালিক কি সরকার? তারা কোন অধিকারে এগুলো নিলাম করছে। আমাদেরকে জবাব দিতে হবে।”

এক পর্যায়ে বিকাল সোয়া ৩ টার দিকে বিআইডব্লিটিএ কর্তৃপক্ষ এবং আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযানস্থল থেকে সরে আসেন। এতে তৃতীয়দিনে কোন ধরণের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি।

সোমবার শুরু হয় বাঁকখালী নদীর তীরে অবৈধভাবে দখল করে তৈরি স্থাপনা উচ্ছেদের অভিযান। দুই দিনে অন্তত যেখানে ৭০ একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে।

দ্বিতীয় দিন অভিযানের শুরুতে অবৈধ দখলদারদের ছোঁড়া ইটের আঘাতে পুলিশের এক সদস্য আহত হয়েছে। এসময়  ৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এব্যাপারে পুলিশ বাদি হয়ে সরকারি কাজে বাঁধা প্রদান ও পুলিশের উপ হামলার আইনে মামলা করে ৪ জনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার সদর থানার ওসি ইলিয়াস খান।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ সূত্র জানিয়েছে, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে উৎপত্তি হয়ে ৮১ কিলোমিটারের বাঁকখালী নদীটি রামু ও কক্সবাজার সদর হয়ে শহরের কস্তুরাঘাট-নুনিয়াছটা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। নুনিয়ারছড়া থেকে মাঝিরঘাট পর্যন্ত ছয় কিলোমিটারে সবচেয়ে বেশি দখলের ঘটনা ঘটেছে। গত ১০ থেকে ১২ বছরে এই ছয় কিলোমিটারে ১ হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় ভূমি অফিস এবং বিআইডব্লিউটিএ যৌথভাবে বাঁকখালী নদীর অবৈধ দখলদারদের পৃথক তালিকা তৈরি করেছে । সহস্রাধিক অবৈধ দখলদার থাকলেও দুই তালিকায় স্থান পেয়েছে প্রায় সাড়ে ৩০০ জন প্রভাবশালী।