আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত (৫৮ দিন) বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রজনন মৌসুমে ২২ দিন ইলিশ আহরণ বন্ধ রাখা হবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সোমবার (৬ এপ্রিল) সকালে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এ ঘোষণা দেন।
মন্ত্রী বলেন, ইলিশ সম্পদ রক্ষা ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে সরকার সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত দেশব্যাপী ‘জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ ২০২৬’ উদযাপিত হবে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জিয়া হায়দার চৌধুরীসহ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
প্রাণিসম্পদমন্ত্রী বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগে ইলিশের টেকসই উৎপাদন বৃদ্ধিসহ ইলিশ মাছের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য বর্তমান সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ লক্ষ্যে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এর মধ্যে জাটকা ও প্রজননক্ষম ইলিশ সংরক্ষণ, নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা, অভয়াশ্রম স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা এবং মৎস্য সংরক্ষণ আইনের সফল বাস্তবায়ন অন্যতম। এসব কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়নের ফলে ইলিশ উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৫ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, নদী ভরাট, জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দূষণ ও মৎস্যসম্পদের ওপর ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধির ফলে ইলিশ মাছ উৎপাদনের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সকলকে সঙ্গে নিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এগিয়ে যাবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ইলিশ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। জনসাধারণের পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জেলেদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইলিশ মাছের গুরুত্ব অপরিসীম।
মন্ত্রী বলেন, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ। দেশজ জিডিপিতে ইলিশের অবদান প্রায় ১ শতাংশ। বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আহরিত হয় এ দেশের নদ-নদী, মোহনা ও সাগর থেকে। ইলিশ আহরণকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষ স্থানে রয়েছে।
আমিন উর রশিদ বলেন, বাংলাদেশের ইলিশ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশের প্রায় ৬ লাখ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ২০-২৫ লাখ লোক ইলিশ পরিবহণ, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি ইত্যাদি কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তাই ইলিশ সম্পদের উন্নয়নের মাধ্যমে সারাদেশের মানুষের হাতের নাগালে ইলিশ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচি দেশের ইলিশসমৃদ্ধ ২০টি জেলায় পালিত হবে। এ লক্ষ্যে তিন দিনব্যাপী কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ৭ এপ্রিল চাঁদপুর সদরে সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘জাটকা ধরা থামাই যদি, ইলিশে ভরবে সাগর-নদী’।
ইলিশ রক্ষায় সরকারের কার্যক্রম তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ইলিশ সম্পদের টেকসই উন্নয়নে সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত (৫৮ দিন) বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা, প্রজনন মৌসুমে ২২ দিন ইলিশ আহরণ বন্ধ রাখা। ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা ধরা, পরিবহণ ও বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ৬টি ইলিশ অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা ও নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধ, ৩ হাজার ১৮৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় সামুদ্রিক সংরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা এবং জেলেদের জন্য ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ’ ও ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নসহ আইন সংশোধন ও কঠোর প্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ইলিশের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে আমিন উর রশিদ বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি করা। উৎপাদন বাড়লে সরবরাহ বাড়বে ও সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে ইলিশের দাম কমে আসবে। ইলিশের উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে আগের চেয়ে আরও উন্নত ও কার্যকর করার জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
পাশের দেশে ইলিশ পাচার ও অবৈধ রপ্তানি বন্ধে সরকার কোনো উদ্যোগ নেবে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এর মধ্যে আপনি দেখেছেন, আমরা বিভিন্ন আইনশৃখলা বাহিনীর সঙ্গেও আমরা প্রতিনিয়ত মিটিং করি। কালকের পর থেকে সমস্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের সহযোগিতা করবে। একেবারে গভীর সমুদ্র থেকে শুরু করে উপরের বাজার পর্যন্ত আমরা তদারকি করছি। এখানে ঝাটকা বিক্রি করে কি না আরও তদারকি করছি, ঘাট তদারকি করছি। আর মাছ ধরা বন্ধ করার জন্য নদী বা সমুদ্রে তো আমাদের কোস্টগার্ড বা নৌবাহিনী এবং নৌপুলিশ সবাই আছে।
ইলিশ রপ্তানি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ইলিশ রপ্তানি বাংলাদেশ সরকার করে না। এটা কিছু কিছু সময় ভারতে যায় যখন পূজা হয়। উনারাও বাঙালি, আপনার যেমন ইলিশের প্রতি একটা দুর্বলতা আছে, একইভাবে তাদেরও একটা দুর্বলতা আছে। ওটা সৌজন্যমূলক সরকার-টু-সরকার। ইলিশের বাণিজ্যিক রপ্তানি না থাকলেও বিশেষ ক্ষেত্রে সৌজন্যমূলকভাবে প্রতিবেশী দেশে সীমিত পরিমাণ ইলিশ রপ্তানি হয়। যদি পাঠায় এটা সরকারপ্রধান জানেন।
অন্যদিকে, জেলেদের সহায়তায় সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, গত দুই মাসে ৪০ হাজার জেলে পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এই সহায়তার মধ্যে রয়েছে ৮০ কেজি চাল, ১২ কেজি আটা, ১০ কেজি তেল, ৪ কেজি চিনি, ৮ কেজি ডাল এবং ১৬ কেজি আলু, যার মোট মূল্য প্রায় ৬ হাজার টাকা।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, অতীতে জেলেরা এত পরিমাণ খাদ্য সহায়তা পায়নি। এরপরও স্থানীয় সংসদ সদস্যরা জেলেদের সহযোগিতা করে যাবেন। সরকার কোনো অনিয়মকে প্রশ্রয় দেবে না এবং যেখানে অনিয়ম পাওয়া যাবে, সেখানে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সুত্র: এনটিভি
টিটিএন ডেস্ক 


















