ঢাকা ০৩:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ২৬ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রামুতে পুকুরে ডুবে কিশোরের মৃত্যু কালবৈশাখী ঝড়ে গলল ‘সাদা সোনা’, কোটি টাকার ক্ষতিতে দিশেহারা চাষি ২০০৯ সালের মানবাধিকার কমিশন আইন বহাল শৈবাল-গ্রিন মাসেল চাষে সম্ভাবনা আবু সাঈদ হত্যা: দুই পুলিশ সদস্যর মৃত্যুদণ্ড, অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা অস্ত্র মামলায় ফয়সাল করিমের ১০ বছরের কারাদণ্ড বাসের ধাক্কায় কিশোরের মৃত্যু, আহত ৫ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় দুপুরে ‘ডাকাত’ ধরে গণধোলাই, পরে পুলিশে সোপর্দ স্ত্রীকে নির্যাতন শেষে ‘ঝুলিয়ে’ হত্যার অভিযোগ, স্বামী পলাতক কক্সবাজারে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের গণবিজ্ঞপ্তি: আবেদনের সময়সীমা ১৫ এপ্রিল এখন টেলিভিশনের কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি হয়েছেন মোহাম্মদ মোরশেদ বুদ্ধ পূর্ণিমা উদযাপন পরিষদ-২০২৬ গঠিত: জ্যোতিসেন মহাথেরো সভাপতি, কানন বড়ুয়া সম্পাদক ওসমান হাদি হত্যার দুই আসামিকে ফেরত পাঠাতে সম্মত ভারত ‎ঈদগাঁও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটি গঠন
বাজার সংকটে থমকে যাচ্ছে উদ্যোক্তারা

শৈবাল-গ্রিন মাসেল চাষে সম্ভাবনা

  • ইমরান হোসাইন
  • আপডেট সময় : ০১:৪২:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
  • 87

কক্সবাজার শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে মাত্র চার কিলোমিটার এগোলেই খুরুশকুল-মহেশখালী চ্যানেলের উপকূল। চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অন্য পৃথিবী। জোয়ার-ভাটার ওঠানামা, লোনা বাতাস, আর বিস্তীর্ণ জলরাশি। প্রকৃতি যেন এখানে নিজেই আঁকেছে সম্ভাবনার নকশা।

এই উপকূলেই গড়ে উঠতে পারত সামুদ্রিক শৈবাল (সি-উইড) ও গ্রিন মাসেল চাষভিত্তিক নতুন অর্থনীতি। যা বদলে দিতে পারত হাজারো মানুষের জীবন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সম্ভাবনার এই আলো এখনো পুরোপুরি ছড়াতে পারেনি। বাজার সংকট, পরিকল্পনার অভাব আর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় থমকে আছে এই খাত।

স্বপ্ন, ঝুঁকি আর এক উদ্যোক্তার গল্প :

এই সম্ভাবনার গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন স্থানীয় উদ্যোক্তা আনোয়ার মিয়া। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ২০১৮ সালে তিনি নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে ঝুঁকির পথে হাঁটেন।

শুরুতে ছিল মাত্র কয়েকটি ভেলা। তাতে শৈবাল চাষ। তারপর ধীরে ধীরে যুক্ত হয় গ্রিন মাসেল (সবুজ ঝিনুক) এবং কোরাল মাছ। একসময় তিনি একই ভেলায় তিন ধরনের উৎপাদনের সমন্বিত মডেল দাঁড় করান। যা দেশের জন্য নতুন এক দৃষ্টান্ত।

জোয়ার-ভাটার ছন্দে গড়ে ওঠা এই চাষ পদ্ধতি এখন ভালো ফলন দিচ্ছে। খরচ কম, পরিবেশবান্ধব, রোগবালাইও তুলনামূলক কম। কিন্তু সমস্যা একটাই, বাজার।

আনোয়ার মিয়ার কণ্ঠে হতাশা, “উৎপাদন হচ্ছে, কিন্তু বিক্রি করতে পারি না। অনেক সময় শৈবাল আর ঝিনুক নষ্ট হয়ে যায়। এতে বড় লোকসান হয়।”

সম্ভাবনার ভাণ্ডার, কিন্তু নেই বাজার :

বিশ্বজুড়ে শৈবাল এখন ‘সুপারফুড’ হিসেবে পরিচিত। খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, এমনকি টেক্সটাইল ও বায়োটেক শিল্পেও এর ব্যবহার বাড়ছে। গ্রিন মাসেলও উচ্চ পুষ্টিগুণের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাসম্পন্ন।

কিন্তু খুরুশকুলের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নেই স্থায়ী ক্রেতা, নেই প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, নেই সংরক্ষণাগার, নেই রপ্তানি চেইন। ফলে উৎপাদিত পণ্যের বড় অংশই অবিক্রীত থেকে যায়। সময়মতো বিক্রি না হওয়ায় পচে যায় শৈবাল ও ঝিনুক।

উদ্যোক্তাদের ভাষায়, “উৎপাদনের চেয়ে বড় সমস্যা এখন বিক্রি।”

নারীনির্ভর এক নতুন অর্থনীতি :

এই খাতের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক, নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় প্রায় এক হাজার চাষি শৈবাল উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। যাদের বড় অংশই নারী। নুনিয়াছড়া, রেজুখাল, সোনাদিয়া, শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকায় শত শত নারী এখন শৈবাল চাষ করছেন। মরিয়ম, আনোয়ারা, মমতাজদের মতো নারীরা পরিবারে নতুন আয়ের উৎস তৈরি করেছেন।

মরিয়ম বলেন, “আগে সংসারে টানাটানি ছিল। আয় হচ্ছে। কিন্তু, দাম না পাওয়ায় লাভ কমে যাচ্ছে।”

কীভাবে হয় এই চাষ :

শৈবাল চাষের প্রধান দুই পদ্ধতি। লং লাইন পদ্ধতি: দড়িতে নির্দিষ্ট দূরত্বে চারা বেঁধে পানিতে ভাসিয়ে রাখা। আর ভাসমান ভেলা পদ্ধতি: বাঁশ বা পাইপের ভেলায় দড়ি ঝুলিয়ে চাষ। নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মৌসুমে চাষ করা হয়। ১৫-২১ দিনের মধ্যেই প্রথম ফসল পাওয়া যায়। প্রায় ৯ কেজি ভেজা শৈবাল শুকিয়ে ১ কেজি হয়।

কেজিপ্রতি বাজারে দাম, তাজা শৈবাল: ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। শুকনা শৈবাল: ৩০০ থেকে ১০০০ টাকা। তবে মৌসুমে ফলন বেশি হলে দাম পড়ে যায়। যা চাষিদের বড় ক্ষতির কারণ।

গবেষণা, প্রকল্প আর সীমাবদ্ধতা :

২০১৬ সাল থেকে শৈবাল চাষ নিয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। এতে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা।

প্রশিক্ষণ, চারা ও উপকরণ সরবরাহ করা হলেও বড় সমস্যা রয়ে গেছে ধারাবাহিকতা ও বাজার সংযোগের অভাব।

কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আকতারুজ্জামানের মতে, বীজ উৎপাদনেও ঘাটতি রয়েছে। পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরো জানান, এ খাতের বিশ্ববাজারে বিশাল সুযোগ। বিশ্বে শৈবালের বাজার এখন বিলিয়ন ডলারের। চীন, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এই খাতে এগিয়ে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বছরে ৩৬ মিলিয়ন টনের বেশি শৈবাল উৎপাদিত হয়।

বাংলাদেশের রয়েছে, ৭১০ কিলোমিটার উপকূলরেখা ও প্রায় ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা। সঠিক পরিকল্পনায় বছরে ২০-৩০ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি আয় সম্ভব।

উদ্যোক্তা মারিয়ার ভিন্ন পথচলা :

কক্সবাজারের উদ্যোক্তা মারিয়া রে শৈবালকে নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়। তিনি শৈবাল দিয়ে তৈরি করছেন, সাবান, গুঁড়া এবং স্যুপ ও বিভিন্ন খাবার। ২০২৫ সালে প্রায় দুই লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন তিনি। বর্তমানে দেড় একর জমিতে চাষ করছেন এবং ৩০ লাখ টাকার বিক্রির লক্ষ্য নিয়েছেন।

তার খামারে কাজ করছেন স্থানীয় নারীরা। যা এই খাতকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করছে।

পরিবেশ ও জলবায়ুর দ্বৈত উপকার :

বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাইন্টিফিক অফিসার মীর কাশেম বললেন, শৈবাল শুধু অর্থনৈতিক নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি কেজি শৈবাল প্রায় ০.৭ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, সমুদ্রের পানি পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে এবং জলজ প্রাণীর আবাসস্থল তৈরি করে। অর্থাৎ এটি ‘ব্লু কার্বন’ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এখন যা দরকার :

বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাদের মতে, খাতটিকে এগিয়ে নিতে জরুরি হলো  প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, কোল্ড স্টোরেজ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সহজ শর্তে ঋণ, রপ্তানি বাজার তৈরি, স্থানীয় বাজারে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গভীর সমুদ্রে বছরব্যাপী চাষের উদ্যোগ।

সম্ভাবনা বনাম বাস্তবতা :

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বললেন, “খুরুশকুলের উপকূলে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে দুটি দৃশ্য দেখা যায়। একদিকে সম্ভাবনার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে বাস্তবতার কঠিন সীমাবদ্ধতা। আনোয়ার মিয়া, মরিয়ম বা মারিয়ার মতো উদ্যোক্তারা প্রতিদিন জোয়ার-ভাটার সঙ্গে লড়াই করে স্বপ্ন বুনছেন।

তাঁর দাবি, উদ্যোক্তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দরকার শুধু নীতিগত সহায়তা, পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং নিশ্চিত বাজার। তাহলেই খুরুশকুলের এই উপকূল একদিন হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির শক্তিশালী কেন্দ্র। যেখানে সমুদ্রই হবে জীবিকার সবচেয়ে বড় ভরসা।”

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

বাজার সংকটে থমকে যাচ্ছে উদ্যোক্তারা

শৈবাল-গ্রিন মাসেল চাষে সম্ভাবনা

আপডেট সময় : ০১:৪২:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

কক্সবাজার শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে মাত্র চার কিলোমিটার এগোলেই খুরুশকুল-মহেশখালী চ্যানেলের উপকূল। চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অন্য পৃথিবী। জোয়ার-ভাটার ওঠানামা, লোনা বাতাস, আর বিস্তীর্ণ জলরাশি। প্রকৃতি যেন এখানে নিজেই আঁকেছে সম্ভাবনার নকশা।

এই উপকূলেই গড়ে উঠতে পারত সামুদ্রিক শৈবাল (সি-উইড) ও গ্রিন মাসেল চাষভিত্তিক নতুন অর্থনীতি। যা বদলে দিতে পারত হাজারো মানুষের জীবন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সম্ভাবনার এই আলো এখনো পুরোপুরি ছড়াতে পারেনি। বাজার সংকট, পরিকল্পনার অভাব আর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় থমকে আছে এই খাত।

স্বপ্ন, ঝুঁকি আর এক উদ্যোক্তার গল্প :

এই সম্ভাবনার গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন স্থানীয় উদ্যোক্তা আনোয়ার মিয়া। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ২০১৮ সালে তিনি নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে ঝুঁকির পথে হাঁটেন।

শুরুতে ছিল মাত্র কয়েকটি ভেলা। তাতে শৈবাল চাষ। তারপর ধীরে ধীরে যুক্ত হয় গ্রিন মাসেল (সবুজ ঝিনুক) এবং কোরাল মাছ। একসময় তিনি একই ভেলায় তিন ধরনের উৎপাদনের সমন্বিত মডেল দাঁড় করান। যা দেশের জন্য নতুন এক দৃষ্টান্ত।

জোয়ার-ভাটার ছন্দে গড়ে ওঠা এই চাষ পদ্ধতি এখন ভালো ফলন দিচ্ছে। খরচ কম, পরিবেশবান্ধব, রোগবালাইও তুলনামূলক কম। কিন্তু সমস্যা একটাই, বাজার।

আনোয়ার মিয়ার কণ্ঠে হতাশা, “উৎপাদন হচ্ছে, কিন্তু বিক্রি করতে পারি না। অনেক সময় শৈবাল আর ঝিনুক নষ্ট হয়ে যায়। এতে বড় লোকসান হয়।”

সম্ভাবনার ভাণ্ডার, কিন্তু নেই বাজার :

বিশ্বজুড়ে শৈবাল এখন ‘সুপারফুড’ হিসেবে পরিচিত। খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, এমনকি টেক্সটাইল ও বায়োটেক শিল্পেও এর ব্যবহার বাড়ছে। গ্রিন মাসেলও উচ্চ পুষ্টিগুণের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাসম্পন্ন।

কিন্তু খুরুশকুলের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নেই স্থায়ী ক্রেতা, নেই প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, নেই সংরক্ষণাগার, নেই রপ্তানি চেইন। ফলে উৎপাদিত পণ্যের বড় অংশই অবিক্রীত থেকে যায়। সময়মতো বিক্রি না হওয়ায় পচে যায় শৈবাল ও ঝিনুক।

উদ্যোক্তাদের ভাষায়, “উৎপাদনের চেয়ে বড় সমস্যা এখন বিক্রি।”

নারীনির্ভর এক নতুন অর্থনীতি :

এই খাতের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক, নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় প্রায় এক হাজার চাষি শৈবাল উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। যাদের বড় অংশই নারী। নুনিয়াছড়া, রেজুখাল, সোনাদিয়া, শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকায় শত শত নারী এখন শৈবাল চাষ করছেন। মরিয়ম, আনোয়ারা, মমতাজদের মতো নারীরা পরিবারে নতুন আয়ের উৎস তৈরি করেছেন।

মরিয়ম বলেন, “আগে সংসারে টানাটানি ছিল। আয় হচ্ছে। কিন্তু, দাম না পাওয়ায় লাভ কমে যাচ্ছে।”

কীভাবে হয় এই চাষ :

শৈবাল চাষের প্রধান দুই পদ্ধতি। লং লাইন পদ্ধতি: দড়িতে নির্দিষ্ট দূরত্বে চারা বেঁধে পানিতে ভাসিয়ে রাখা। আর ভাসমান ভেলা পদ্ধতি: বাঁশ বা পাইপের ভেলায় দড়ি ঝুলিয়ে চাষ। নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মৌসুমে চাষ করা হয়। ১৫-২১ দিনের মধ্যেই প্রথম ফসল পাওয়া যায়। প্রায় ৯ কেজি ভেজা শৈবাল শুকিয়ে ১ কেজি হয়।

কেজিপ্রতি বাজারে দাম, তাজা শৈবাল: ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। শুকনা শৈবাল: ৩০০ থেকে ১০০০ টাকা। তবে মৌসুমে ফলন বেশি হলে দাম পড়ে যায়। যা চাষিদের বড় ক্ষতির কারণ।

গবেষণা, প্রকল্প আর সীমাবদ্ধতা :

২০১৬ সাল থেকে শৈবাল চাষ নিয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। এতে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা।

প্রশিক্ষণ, চারা ও উপকরণ সরবরাহ করা হলেও বড় সমস্যা রয়ে গেছে ধারাবাহিকতা ও বাজার সংযোগের অভাব।

কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আকতারুজ্জামানের মতে, বীজ উৎপাদনেও ঘাটতি রয়েছে। পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরো জানান, এ খাতের বিশ্ববাজারে বিশাল সুযোগ। বিশ্বে শৈবালের বাজার এখন বিলিয়ন ডলারের। চীন, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এই খাতে এগিয়ে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বছরে ৩৬ মিলিয়ন টনের বেশি শৈবাল উৎপাদিত হয়।

বাংলাদেশের রয়েছে, ৭১০ কিলোমিটার উপকূলরেখা ও প্রায় ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা। সঠিক পরিকল্পনায় বছরে ২০-৩০ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি আয় সম্ভব।

উদ্যোক্তা মারিয়ার ভিন্ন পথচলা :

কক্সবাজারের উদ্যোক্তা মারিয়া রে শৈবালকে নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়। তিনি শৈবাল দিয়ে তৈরি করছেন, সাবান, গুঁড়া এবং স্যুপ ও বিভিন্ন খাবার। ২০২৫ সালে প্রায় দুই লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন তিনি। বর্তমানে দেড় একর জমিতে চাষ করছেন এবং ৩০ লাখ টাকার বিক্রির লক্ষ্য নিয়েছেন।

তার খামারে কাজ করছেন স্থানীয় নারীরা। যা এই খাতকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করছে।

পরিবেশ ও জলবায়ুর দ্বৈত উপকার :

বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাইন্টিফিক অফিসার মীর কাশেম বললেন, শৈবাল শুধু অর্থনৈতিক নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি কেজি শৈবাল প্রায় ০.৭ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, সমুদ্রের পানি পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে এবং জলজ প্রাণীর আবাসস্থল তৈরি করে। অর্থাৎ এটি ‘ব্লু কার্বন’ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এখন যা দরকার :

বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাদের মতে, খাতটিকে এগিয়ে নিতে জরুরি হলো  প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, কোল্ড স্টোরেজ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সহজ শর্তে ঋণ, রপ্তানি বাজার তৈরি, স্থানীয় বাজারে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গভীর সমুদ্রে বছরব্যাপী চাষের উদ্যোগ।

সম্ভাবনা বনাম বাস্তবতা :

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বললেন, “খুরুশকুলের উপকূলে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে দুটি দৃশ্য দেখা যায়। একদিকে সম্ভাবনার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে বাস্তবতার কঠিন সীমাবদ্ধতা। আনোয়ার মিয়া, মরিয়ম বা মারিয়ার মতো উদ্যোক্তারা প্রতিদিন জোয়ার-ভাটার সঙ্গে লড়াই করে স্বপ্ন বুনছেন।

তাঁর দাবি, উদ্যোক্তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দরকার শুধু নীতিগত সহায়তা, পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং নিশ্চিত বাজার। তাহলেই খুরুশকুলের এই উপকূল একদিন হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির শক্তিশালী কেন্দ্র। যেখানে সমুদ্রই হবে জীবিকার সবচেয়ে বড় ভরসা।”