মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর নৃশংস নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গার অধিকার আদায় এবং স্বদেশে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের মূল কণ্ঠস্বর রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহর হত্যাকাণ্ডের ৫ বছর পূর্ণ হলো
আজ (২৯ সেপ্টেম্বর)। ২০২১ সালের এই দিনে কুতুপালং ১-ইস্ট লম্বাশিয়া ক্যাম্পে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস এর কার্যালয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা।
স্বদেশে ফেরার স্বপ্নের অগ্রনায়ক:
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের পর সপরিবারে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন মুহিবুল্লাহ। শিক্ষক থেকে মানবাধিকার কর্মীতে পরিণত হওয়া এই নেতা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক রূপ দিয়েছিলেন। ২০১৯ সালে তিনি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে বক্তব্য দেন এবং হোয়াইট হাউসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিশ্ববাসীর নজর কাড়েন। শরণার্থী শিবিরে তার তুমুল জনপ্রিয়তার কারণে সাধারণ রোহিঙ্গারা তাকে ‘পিস ফাদার’ বা ‘শান্তির জনক’ হিসেবে অভিহিত করতেন।
কেন এই হত্যাকাণ্ড?
তদন্তকারী সংস্থা ও পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকায় এবং সাধারণ রোহিঙ্গাদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে আরসা ও আল-ইয়াকিন নামক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। আরসার শীর্ষ পর্যায় থেকে ফতোয়া জারি করে মুহিবুল্লাহকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
বিচার প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা:
হত্যাকাণ্ডের পরদিন মুহিবুল্লাহর ছোট ভাই হাবিবুল্লাহ বাদী হয়ে উখিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২২ সালের জুনে পুলিশ আরসার ২৯ জন রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার কাজ শুরু হয়। বিচার চলাকালে একাধিক আসামির পক্ষ থেকে সাক্ষীদের হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। বর্তমানে মামলাটি কক্সবাজার আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
আজকের শরণার্থী শিবির:
মুহিবুল্লাহর ৫ম মৃত্যুবার্ষিকীতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিরাজ করছে। সাধারণ রোহিঙ্গারা এখনও তাদের এই প্রিয় নেতার অভাব বোধ করেন। অনেকেই মনে করেন, মুহিবুল্লাহ বেঁচে থাকলে আন্তর্জাতিক মহলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের দাবি আরও জোরালো হতো। তবে তার মৃত্যুর পর নিরাপত্তার খাতিরে মুহিবুল্লাহর পরিবারের ১১ জন সদস্যকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর সহায়তায় কানাডায় স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।
রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ে মুহিবুল্লাহর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করেন শরণার্থী শিবিরের সাধারণ মানুষ ও দেশি-বিদেশি মানবাধিকার কর্মীরা।
নোমান অরুপ 























