ঢাকা ০৩:১১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ভেসে গেছে ৩ হাজার ৯১৮ পুকুর-ঘেরের মাছ, ক্ষতি ৪৬ কোটি টাকা কক্সবাজারে পানিবাহিত রোগ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগের সতর্কতা “বিএনপি জনগণের ভোটে নির্বাচিত, তাই মানুষের প্রতি দায় আছে”- কক্সবাজারে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার: টেন্ডার সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে ‘রয়েল নাসির’ ঝিলংজা ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী রাশেদ-এর ত্রাণ কার্যক্রম পরিদর্শন করলেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিব বন্যার্তদের পাশে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল,রামুতে দেড় হাজার মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ জননেতা নুরুল আবছারের ওপেন হার্ট সার্জারি সোমবারের বদলে হবে বৃহস্পতিবার কুতুবদিয়ায় বঙ্গোপসাগরে ট্রলার ডুবে নিখোঁজ ৪ জেলের মরদেহ উদ্ধার কক্সবাজার জেলা যুবদলের উদ্যোগে ফ্রি মেডিকেল চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম বাঁশের সাঁকোই হলো মৃত্যুফাঁদ, রামুতে প্রাণ গেল যুবকের পুলিশের ‘বিশেষ’ অভিযান: আড়াই মাসে গ্রেপ্তার ৩৩ হাজার, বেশিরভাগই মাদক মামলায় ‘গাছ লাগালেই দায়িত্ব শেষ নয়, শিশুর মতো যত্ন নিতে হবে’ ফ্রান্স কি স্পেনকে ভয় পাচ্ছে? ফ্রান্স বনাম স্পেন : ৩৭ হাজার কোটি টাকার সেমিফাইনাল প্রতি উপজেলায় ৭ হাজার পরিবার ফ্যামিলি কার্ড পাবেন: প্রধানমন্ত্রী
জনস্বাস্থ্যের শতকোটি টাকার কাজ, গোয়েন্দা নজরদারিতে ঠিকাদারি নেটওয়ার্ক

চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার: টেন্ডার সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে ‘রয়েল নাসির’

চট্টগ্রামের একের পর এক সরকারি দপ্তরে হামলা, কর্মকর্তাদের হুমকি, টেন্ডার কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ এবং সংঘবদ্ধভাবে ‘মব’ তৈরির ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মাঠে নেমেছে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এসব ঘটনার নেপথ্যে বারবার উঠে আসছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ পতিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সন্দ্বীপ পৌরসভা শাখার সাবেক সহসভাপতি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লাকি এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ওরফে রয়েল নাসিরের নাম।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুধু চট্টগ্রাম নয়, কক্সবাজারের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরেও দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন রয়েল নাসির। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ঠিকাদার সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাজ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কিছুদিন সভাপতি পদে বহাল ছিলেন বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি উঠেছে সম্প্রতি কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নতুন একটি বৃহৎ প্রকল্প ঘিরে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রায় চার মাস আগে HELP-DPHE Household Community Toilet Project এর আওতায় কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, চকরিয়া এবং বান্দরবান জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাস্তবায়নাধীন ১০০ কোটিরও বেশি টাকার কাজ পেয়েছে লাকি এন্টারপ্রাইজ ও শাহ জব্বারিয়া টিটু কনস্ট্রাকশন জেবি।

গোয়েন্দা সূত্রগুলোর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) একক আধিপত্য গড়ে তোলেন রয়েল নাসির। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সময় এই তিন দপ্তরে প্রকাশিত প্রতি ১০টি কাজের মধ্যে প্রায় পাঁচটিই তার প্রতিষ্ঠান লাকি এন্টারপ্রাইজের দখলে যেত।

সরকার পরিবর্তনের প্রায় দুই বছর পার হলেও ওই তিনটি দপ্তরে এখনো লাকি এন্টারপ্রাইজের প্রভাব বহাল রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, বিএডিসি, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার টেন্ডার কার্যক্রমেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সরকারি দপ্তরের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ঠিকাদার ও সন্ত্রাসী চক্রের সহায়তায় এখনো চট্টগ্রাম ও আশপাশের অঞ্চলের সরকারি নির্মাণকাজে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন রয়েল নাসির। তার সিদ্ধান্তের বাইরে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মব সৃষ্টি, সামাজিকভাবে হেনস্তা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

একাধিক সরকারি কর্মকর্তার অভিযোগ, সরকারি টেন্ডারকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। সরকারি অফিসে হামলা, কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, গণঅভিযোগ সৃষ্টি এবং প্রয়োজনে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার সবই একই কৌশলের অংশ।

গত ২১ জুন চট্টগ্রাম এলজিইডি কার্যালয়ের সামনে অগ্রিম বিল পরিশোধের দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, ফটিকছড়ির সাবেক সংসদ সদস্য নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত আসাদুজ্জামান টিটুকে সঙ্গে নিয়ে কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন রয়েল নাসির।

অভিযোগ রয়েছে, মানববন্ধনের পর অংশগ্রহণকারীরা দলবেঁধে এলজিইডি কার্যালয়ে প্রবেশ করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন। এ সময় চট্টগ্রাম এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তার কার্যালয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। ঘটনার পর নিরাপত্তার কারণে কয়েকদিন নিয়মিত অফিসেও যেতে পারেননি ওই কর্মকর্তা।

এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা জানান, অর্থবছর শেষে অসমাপ্ত প্রকল্পের অব্যবহৃত বরাদ্দ নিয়ম অনুযায়ী ল্যাপস হয়ে যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২৫ কোটি টাকার অব্যবহৃত বরাদ্দ ল্যাপস করার প্রক্রিয়া শুরু হলে কিছু ঠিকাদার অগ্রিম বিল আদায়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।

সূত্রগুলোর দাবি, রয়েল নাসিরের নেতৃত্বে একদল ঠিকাদার কাজ সম্পন্ন হয়েছে এমন প্রতিবেদন দিয়ে অগ্রিম বিল ছাড়ের দাবি জানায়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এতে রাজি না হওয়ায় উত্তেজনা তৈরি হয়।

গত ১৮ জুন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়েও ঘটে আলোচিত ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, অস্ত্রধারী একদল ব্যক্তি অফিসে ঢুকে দুই কর্মচারীকে মারধর করে এবং নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর ইসলামকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বড় বড় প্রকল্প একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন রয়েল নাসির। সরকারের পরিবর্তনের পর বিএনপির কয়েকজন নেতার নাম ব্যবহার করে সেই প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে মীরসরাইয়ের বাড়িয়াখালী মাওলানা লকিয়তুল্লাহ দাখিল মাদরাসা, ফটিকছড়ির দারুস সুন্নাহ কাদেরিয়া দাখিল মাদরাসা, বাকুলিয়া সরকারি কলেজ ভবনসহ একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে লাকি এন্টারপ্রাইজ। অভিযোগ রয়েছে, অন্য প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করেও কয়েকটি প্রকল্প পরিচালনা করছেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরেও লাকি এন্টারপ্রাইজের একাধিক প্রকল্প চলমান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা ওবায়দুল কাদেরের সুপারিশে চট্টগ্রামে বদলি হওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার দাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে এই দপ্তরেও প্রভাব বিস্তার করেন রয়েল নাসির। এমনকি পলাশ কুমার দাশের আত্মীয়দের নামে ‘মেসার্স অরণ্যক’ ও ‘কুল ট্রেডার্স’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠান খুলে রেট কোড জালিয়াতির মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অন্যদিকে কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে ঘিরেও তার প্রভাবের অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাজ নিয়ন্ত্রণের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও নতুন করে শতকোটির বেশি টাকার প্রকল্পে অংশ নিয়েছে তার প্রতিষ্ঠান।

বিশেষ করে HELP-DPHE Household Community Toilet Project এর আওতায় কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, চকরিয়া এবং বান্দরবানে বাস্তবায়নাধীন শতকোটির বেশি টাকার কাজ লাকি এন্টারপ্রাইজ ও শাহ জব্বারিয়া টিটু কনস্ট্রাকশন জেবি পেয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান, সরকারি দপ্তরে মব সৃষ্টি ছাড়াও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে রয়েল নাসিরের বিরুদ্ধে।

তার দাবি, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় রয়েল নাসিরের বাসায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাদের একাধিক বৈঠকের ছবি ও ভিডিও গোয়েন্দা সংস্থার হাতে এসেছে। বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপারেশন অ্যান্ড ক্রাইম) ফয়সল আহমেদ বলেন, টেন্ডার-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি কয়েকটি সরকারি দপ্তরে উত্তেজনা ও কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনায় পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রয়েল নাসির। তিনি বলেন, ২০২০ সালের আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এরপর থেকে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।

তিনি দাবি করেন, এলজিইডিতে ঠিকাদারদের স্বার্থে কথা বলতে গিয়েছিলেন, সেটিকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। শিক্ষা প্রকৌশলে তার দুটি এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ই-জিপি পদ্ধতিতে সরকারি বিধি মেনেই কাজ দেওয়া হয় এবং লাকি এন্টারপ্রাইজ যোগ্যতার ভিত্তিতেই কাজ পায়।

তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সরকারি দপ্তরকেন্দ্রিক টেন্ডার সিন্ডিকেট, সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি, সংঘবদ্ধ মব, ঠিকাদারি প্রভাব বিস্তার এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ। এসব অভিযোগ এখন একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

ভেসে গেছে ৩ হাজার ৯১৮ পুকুর-ঘেরের মাছ, ক্ষতি ৪৬ কোটি টাকা

জনস্বাস্থ্যের শতকোটি টাকার কাজ, গোয়েন্দা নজরদারিতে ঠিকাদারি নেটওয়ার্ক

চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার: টেন্ডার সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে ‘রয়েল নাসির’

আপডেট সময় : ১১:১৭:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রামের একের পর এক সরকারি দপ্তরে হামলা, কর্মকর্তাদের হুমকি, টেন্ডার কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ এবং সংঘবদ্ধভাবে ‘মব’ তৈরির ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মাঠে নেমেছে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এসব ঘটনার নেপথ্যে বারবার উঠে আসছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ পতিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সন্দ্বীপ পৌরসভা শাখার সাবেক সহসভাপতি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লাকি এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ওরফে রয়েল নাসিরের নাম।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুধু চট্টগ্রাম নয়, কক্সবাজারের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরেও দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন রয়েল নাসির। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ঠিকাদার সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাজ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কিছুদিন সভাপতি পদে বহাল ছিলেন বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি উঠেছে সম্প্রতি কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নতুন একটি বৃহৎ প্রকল্প ঘিরে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রায় চার মাস আগে HELP-DPHE Household Community Toilet Project এর আওতায় কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, চকরিয়া এবং বান্দরবান জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাস্তবায়নাধীন ১০০ কোটিরও বেশি টাকার কাজ পেয়েছে লাকি এন্টারপ্রাইজ ও শাহ জব্বারিয়া টিটু কনস্ট্রাকশন জেবি।

গোয়েন্দা সূত্রগুলোর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) একক আধিপত্য গড়ে তোলেন রয়েল নাসির। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সময় এই তিন দপ্তরে প্রকাশিত প্রতি ১০টি কাজের মধ্যে প্রায় পাঁচটিই তার প্রতিষ্ঠান লাকি এন্টারপ্রাইজের দখলে যেত।

সরকার পরিবর্তনের প্রায় দুই বছর পার হলেও ওই তিনটি দপ্তরে এখনো লাকি এন্টারপ্রাইজের প্রভাব বহাল রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, বিএডিসি, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার টেন্ডার কার্যক্রমেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সরকারি দপ্তরের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ঠিকাদার ও সন্ত্রাসী চক্রের সহায়তায় এখনো চট্টগ্রাম ও আশপাশের অঞ্চলের সরকারি নির্মাণকাজে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন রয়েল নাসির। তার সিদ্ধান্তের বাইরে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মব সৃষ্টি, সামাজিকভাবে হেনস্তা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

একাধিক সরকারি কর্মকর্তার অভিযোগ, সরকারি টেন্ডারকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। সরকারি অফিসে হামলা, কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, গণঅভিযোগ সৃষ্টি এবং প্রয়োজনে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার সবই একই কৌশলের অংশ।

গত ২১ জুন চট্টগ্রাম এলজিইডি কার্যালয়ের সামনে অগ্রিম বিল পরিশোধের দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, ফটিকছড়ির সাবেক সংসদ সদস্য নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত আসাদুজ্জামান টিটুকে সঙ্গে নিয়ে কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন রয়েল নাসির।

অভিযোগ রয়েছে, মানববন্ধনের পর অংশগ্রহণকারীরা দলবেঁধে এলজিইডি কার্যালয়ে প্রবেশ করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন। এ সময় চট্টগ্রাম এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তার কার্যালয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। ঘটনার পর নিরাপত্তার কারণে কয়েকদিন নিয়মিত অফিসেও যেতে পারেননি ওই কর্মকর্তা।

এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা জানান, অর্থবছর শেষে অসমাপ্ত প্রকল্পের অব্যবহৃত বরাদ্দ নিয়ম অনুযায়ী ল্যাপস হয়ে যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২৫ কোটি টাকার অব্যবহৃত বরাদ্দ ল্যাপস করার প্রক্রিয়া শুরু হলে কিছু ঠিকাদার অগ্রিম বিল আদায়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।

সূত্রগুলোর দাবি, রয়েল নাসিরের নেতৃত্বে একদল ঠিকাদার কাজ সম্পন্ন হয়েছে এমন প্রতিবেদন দিয়ে অগ্রিম বিল ছাড়ের দাবি জানায়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এতে রাজি না হওয়ায় উত্তেজনা তৈরি হয়।

গত ১৮ জুন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়েও ঘটে আলোচিত ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, অস্ত্রধারী একদল ব্যক্তি অফিসে ঢুকে দুই কর্মচারীকে মারধর করে এবং নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর ইসলামকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বড় বড় প্রকল্প একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন রয়েল নাসির। সরকারের পরিবর্তনের পর বিএনপির কয়েকজন নেতার নাম ব্যবহার করে সেই প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে মীরসরাইয়ের বাড়িয়াখালী মাওলানা লকিয়তুল্লাহ দাখিল মাদরাসা, ফটিকছড়ির দারুস সুন্নাহ কাদেরিয়া দাখিল মাদরাসা, বাকুলিয়া সরকারি কলেজ ভবনসহ একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে লাকি এন্টারপ্রাইজ। অভিযোগ রয়েছে, অন্য প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করেও কয়েকটি প্রকল্প পরিচালনা করছেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরেও লাকি এন্টারপ্রাইজের একাধিক প্রকল্প চলমান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা ওবায়দুল কাদেরের সুপারিশে চট্টগ্রামে বদলি হওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার দাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে এই দপ্তরেও প্রভাব বিস্তার করেন রয়েল নাসির। এমনকি পলাশ কুমার দাশের আত্মীয়দের নামে ‘মেসার্স অরণ্যক’ ও ‘কুল ট্রেডার্স’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠান খুলে রেট কোড জালিয়াতির মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অন্যদিকে কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে ঘিরেও তার প্রভাবের অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাজ নিয়ন্ত্রণের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও নতুন করে শতকোটির বেশি টাকার প্রকল্পে অংশ নিয়েছে তার প্রতিষ্ঠান।

বিশেষ করে HELP-DPHE Household Community Toilet Project এর আওতায় কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, চকরিয়া এবং বান্দরবানে বাস্তবায়নাধীন শতকোটির বেশি টাকার কাজ লাকি এন্টারপ্রাইজ ও শাহ জব্বারিয়া টিটু কনস্ট্রাকশন জেবি পেয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান, সরকারি দপ্তরে মব সৃষ্টি ছাড়াও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে রয়েল নাসিরের বিরুদ্ধে।

তার দাবি, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় রয়েল নাসিরের বাসায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাদের একাধিক বৈঠকের ছবি ও ভিডিও গোয়েন্দা সংস্থার হাতে এসেছে। বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপারেশন অ্যান্ড ক্রাইম) ফয়সল আহমেদ বলেন, টেন্ডার-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি কয়েকটি সরকারি দপ্তরে উত্তেজনা ও কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনায় পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রয়েল নাসির। তিনি বলেন, ২০২০ সালের আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এরপর থেকে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।

তিনি দাবি করেন, এলজিইডিতে ঠিকাদারদের স্বার্থে কথা বলতে গিয়েছিলেন, সেটিকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। শিক্ষা প্রকৌশলে তার দুটি এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ই-জিপি পদ্ধতিতে সরকারি বিধি মেনেই কাজ দেওয়া হয় এবং লাকি এন্টারপ্রাইজ যোগ্যতার ভিত্তিতেই কাজ পায়।

তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সরকারি দপ্তরকেন্দ্রিক টেন্ডার সিন্ডিকেট, সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি, সংঘবদ্ধ মব, ঠিকাদারি প্রভাব বিস্তার এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ। এসব অভিযোগ এখন একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।