কক্সবাজার এখন আর শুধু একটি জেলার নাম নয়। এটি যেন এক “মিনি বাংলাদেশ”। দেশের ৬৪ জেলার মানুষ এখানে প্রতিনিয়ত কাজ করছেন, কেউ জীবিকার তাগিদে, কেউ ব্যবসার স্বপ্নে, কেউ পর্যটন শিল্পে, কেউ লবণ মাঠে, কেউ হোটেল-রিসোর্টে, আবার কেউ নির্মাণখাতে।
দেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের এই উপকূলীয় অঞ্চল আজ অর্থনীতি, পর্যটন, লবণ শিল্প ও কর্মসংস্থানের এক বিশাল কেন্দ্র। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারে যাতায়াত করছেন। অসংখ্য পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই জেলার উপর।
কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, এই স্বপ্নের শহরে পৌঁছানোর আগেই অনেকে মৃত্যু বরণ করছেন।
আর যারা পৌঁছাতে পারছেন, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ সমুদ্রের ঢেউয়ে হারিয়ে যাচ্ছেন চিরতরে।
দুই লেনের মহাসড়ক, এক নীরব মৃত্যুফাঁদ।চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ। পর্যটন, ব্যবসা ও শিল্পের কারণে প্রতিদিন এই রাস্তায় চাপ বাড়ছে কয়েক গুণ। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই সড়কের বড় অংশ দুই লেনের সীমাবদ্ধ অবকাঠামোর মধ্যেই আটকে আছে। ফলাফল, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিয়ন্ত্রণহীন গতি, ক্লান্ত চালক, ফিটনেস বিহীন যানবাহন এবং একের পর এক প্রাণহানি।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজারো মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান, যার বড় অংশ মহাসড়ক কেন্দ্রিক। কক্সবাজারমুখী সড়কও এখন সেই ঝুঁকিপূর্ণ তালিকার অন্যতম আলোচিত পথ।
প্রতিটি দুর্ঘটনার পর কিছুদিন আলোচনা হয়, সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ দেখা যায়, প্রশাসনের বৈঠক হয়, কিন্তু কিছুদিন পর আবার সব আগের মতো হয়ে যায়। শুধু বদলে যায় কয়েকটি পরিবারের জীবন।
সমুদ্র, সৌন্দর্যের আড়ালে মৃত্যুর স্রোত। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার বাংলাদেশের গর্ব। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেও রয়েছে ভয়ংকর বাস্তবতা।
প্রতিবছর বহু মানুষ সাগরে ডুবে মারা যাচ্ছেন। কেউ জোয়ারের স্রোত বুঝতে পারেন না, কেউ গভীর খাদ সম্পর্কে জানেন না, আবার কেউ নিরাপত্তা নির্দেশনা উপেক্ষা করেন। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড বা কার্যকর সতর্কতা ব্যবস্থার অভাব পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে।
একটি পরিবার আনন্দ নিয়ে বেড়াতে আসে, কিন্তু ফিরে যায় নিথর দেহ নিয়ে। সৈকতের ঢেউ তখন শুধু পানি নয়, অসংখ্য স্বপ্নও ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
“এই মৃত্যুর দায় কার?” সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। একটি দুর্ঘটনার পর আমরা বলি, “দুর্ভাগ্য”। একটি ডুবে যাওয়ার ঘটনার পর বলি, “সাবধান ছিল না”। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিরাপদ সড়ক ও নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিত করা কি শুধুই ব্যক্তির দায়িত্ব? রাষ্ট্র, প্রশাসন, পরিবহন খাত, পর্যটন ব্যবস্থাপনা, সবার সম্মিলিত দায়িত্ব কি এখানে নেই?
যে পিতা তার সন্তানকে কর্মস্থলে পাঠিয়েছিলেন ভবিষ্যৎ গড়ার আশায়, যে মা অপেক্ষা করছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির ফেরার জন্য, তাদের কাছে একটি দুর্ঘটনা শুধু সংবাদ নয়; এটি আজীবনের শোক।
উন্নয়ন কি শুধু অবকাঠামোর নাম? কক্সবাজারে একের পর এক মেগা প্রকল্প হচ্ছে। হোটেল উঠছে, পর্যটন বাড়ছে, অর্থনীতি প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, মানুষ যদি নিরাপদে চলাচলই করতে না পারে, তাহলে সেই উন্নয়নের অর্থ কী?
উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন একটি মানুষ নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারে। যখন একটি পরিবার নিশ্চিন্তে সমুদ্র দেখতে যেতে পারে।
যখন একটি সড়ক মানুষের স্বপ্ন বহন করবে, লাশ নয়।
এখনই সময় সিদ্ধান্তের, বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজারকে সত্যিকারের আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে; চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে পূর্ণাঙ্গ নিরাপদ বহুলেন সড়কে উন্নীত করা।সড়কে কঠোর গতি নিয়ন্ত্রণ ও ফিটনেস বিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান। চালকদের প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম ব্যবস্থার উন্নয়ন। সমুদ্র সৈকতে আধুনিক লাইফগার্ড, সতর্কতা চিহ্ন ও পর্যটক নিরাপত্তা জোরদার করা। দুর্ঘটনা ও ডুবে যাওয়া প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ।
কক্সবাজার বাংলাদেশের স্বপ্নের অংশ। এই স্বপ্নে দেশের প্রতিটি জেলার মানুষের ঘাম, শ্রম আর আশা জড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে যদি প্রতিনিয়ত মৃত্যু দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে আমাদের থামতেই হবে, ভাবতেই হবে। আর কত প্রাণ হারালে আমরা বলবো “এবার যথেষ্ট হয়েছে”?
শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক 

















