বিশ্ব রাজনীতিতে প্রায়ই একটি ধারণা সামনে আসে, একটি বড় সংঘাতকে “সমঝোতার মাধ্যমে” থামাতে গেলে অন্য কোথাও ছাড় দিতে হয়। আজকের প্রেক্ষাপটে সেই প্রশ্নটি নতুনভাবে উত্থাপিত হয়েছে: যদি ইউক্রেন কে বলির পাঁঠা করা হয়, যদি ন্যাটো দুর্বল বা বিলীন হয়, তাহলে কি ইরান সংক্রান্ত উত্তেজনা বা সম্ভাব্য যুদ্ধ থেমে যাবে?
প্রথম দর্শনে এই ধারণা কৌশলগত বলে মনে হতে পারে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বড় শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে প্রভাবের ক্ষেত্র ভাগ করে নিয়েছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা সেই পুরনো সরল সমীকরণকে অনেকটাই অকার্যকর করে দিয়েছে।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ প্রমাণ করেছে, একটি আঞ্চলিক সংঘাত কত দ্রুত বৈশ্বিক শক্তির দ্বন্দ্বে রূপ নিতে পারে। এখানে ইউক্রেন নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। কিন্তু তাকে “বলির পাঁঠা” হিসেবে উৎসর্গ করলে কি সত্যিই বিশ্ব শান্ত হবে? নাকি এটি আরও বড় অস্থিরতার পথ খুলে দেবে?
একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে বা তার সার্বভৌমত্বকে বিসর্জন দিয়ে অন্যত্র শান্তি কেনা, এই ধারণা নৈতিকভাবে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি কৌশলগতভাবেও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এতে একটি বিপজ্জনক বার্তা যায়: শক্তিশালী রাষ্ট্র চাইলে দুর্বল রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। এর ফল হতে পারে নতুন আগ্রাসন, নতুন সংঘাত।
একইভাবে, ন্যাটো এর বিলুপ্তি নিয়ে যে তত্ত্ব প্রচলিত আছে, সেটিও এক পাক্ষিক। সত্য যে, ন্যাটো এর সম্প্রসারণ রাশিয়া এর নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কিন্তু একই সাথে এটাও সত্য, এই জোট বহু দেশের জন্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছে। এটি হঠাৎ বিলীন হয়ে গেলে যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা কি নতুন সংঘাতের জন্ম দেবে না?
অন্যদিকে, ইরান সংক্রান্ত উত্তেজনার নিজস্ব বাস্তবতা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নির্ধারিত হয় আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মতাদর্শ, এবং দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব দ্বারা, বিশেষ করে ইসরাইল এর সঙ্গে সম্পর্ক, উপসাগরীয় শক্তির ভারসাম্য, এবং অভ্যন্তরীণ কৌশলগত হিসাব। এই জটিল বাস্তবতা ইউক্রেন বা ন্যাটো এর ভবিষ্যতের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়।
অতএব, “এক যুদ্ধের বিনিময়ে আরেক যুদ্ধ থামানো” এই ধারণাটি বাস্তবে অনেকটাই কল্পনাপ্রসূত। এটি এমন একটি সরলীকরণ, যা বিশ্বরাজনীতির বহুস্তরীয় বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে। বরং একটি সংঘাতে ছাড় দিলে অন্যত্র শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, শান্তি কখনোই অন্যায়ের বিনিময়ে টেকসই হয় না। একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে যদি সাময়িক স্থিতি আসে, সেটি দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় অস্থিরতার ভিত্তি তৈরি করে।
আজকের বিশ্বে প্রয়োজন “বিনিময়ের শান্তি” নয়, বরং “ন্যায়ভিত্তিক শান্তি” যেখানে কোনো রাষ্ট্রকে বলির পাঁঠা হতে হবে না, এবং কোনো শক্তিকেই অন্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার দেওয়া হবে না।
শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক 



















