শিক্ষকতা আমার কাছে শুধু একটি চাকরি নয়; এটি একটি দায়িত্ব, অঙ্গীকার এবং মানুষ গড়ার মহৎ সুযোগ। একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের কয়েকটি অধ্যায় পড়ান না; তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা, স্বপ্ন, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একজন চিকিৎসক মানুষের শরীরের চিকিৎসা করেন, একজন প্রকৌশলী স্থাপনা নির্মাণ করেন; আর একজন শিক্ষক নির্মাণ করেন মানুষ। তাই একজন শিক্ষকের প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষ কিংবা পরীক্ষার খাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর একটি কথা, একটি উৎসাহ, একটি সঠিক পরামর্শ কিংবা একজন শিক্ষার্থীর প্রতি তাঁর আস্থা—কখনো কখনো একটি জীবনকে নতুন পথে পরিচালিত করতে পারে। শিক্ষকতা করতে গিয়ে আমি একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি একটি শ্রেণিকক্ষে যতজন শিক্ষার্থী থাকে, তাদের প্রত্যেকের শেখার ধরন, সামর্থ্য ও প্রয়োজন এক নয়। কেউ দ্রুত বুঝতে পারে, কেউ একটু বেশি সময় নেয়। কেউ প্রশ্ন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, আবার কেউ না বুঝলেও সংকোচের কারণে প্রশ্ন করতে পারে না। তাই একজন শিক্ষককে শুধু ভাবলে চলবে না, “আমি কী পড়াব?” বরং ভাবতে হবে, “আমার শিক্ষার্থী কীভাবে সবচেয়ে ভালোভাবে শিখবে?” কারণ অনেক সময় শিক্ষার্থী অক্ষম নয়; প্রয়োজন হয় শুধু উপযুক্ত পদ্ধতি ও একটু বাড়তি উৎসাহের। আমার শিক্ষকতার কিছু অভিজ্ঞতা আমাকে এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় করেছে। একবার আমাদের পঅধ্যাক্ষ মোরশেদুল আলম স্যার বলেছিলেন, “এ শাখার বাইরে অন্য কোনো শাখায় ভালো মানের শিক্ষার্থী থাকলে তাকে এ শাখায় নিয়ে আসবেন।” সপ্তম বি শাখায় পড়াতে গিয়ে ফেন্সি নামে একটি মেয়েকে পেলাম। তার পড়াশোনার ধরন আমার বিশেষভাবে ভালো লেগেছিল। তার মধ্যে নিয়মিত পড়াশোনা করার অভ্যাস, মনোযোগ এবং শেখার আগ্রহ লক্ষ্য করেছিলাম। আমার মনে হলো, তাকে যদি আরও ভালো ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিয়ে আসা যায়, তাহলে সে নিজের সম্ভাবনাকে আরও ভালোভাবে বিকশিত করতে পারবে। তাই তাকে বি শাখা থেকে সরাসরি এ শাখায় নিয়ে এলাম।
তাকে উৎসাহ দিয়ে বলেছিলামন“তুমি পারবে। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো।” এখন ফেন্সি নবম শ্রেণিতে পড়ছে। ফলাফলে সে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম চার-পাঁচজনের মধ্যে অবস্থান করছে।
তার এই সাফল্য আমাকে আনন্দিত করে। তবে তার চেয়েও বেশি আনন্দ দেয় এই উপলব্ধি—একজন শিক্ষক যদি কোনো শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকে সময়মতো চিনতে পারেন এবং তাকে উপযুক্ত পরিবেশ ও উৎসাহ দিতে পারেন, তাহলে সেই সম্ভাবনা আরও সুন্দরভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। নুসরাত মযুরীর কথাও মনে পড়ে। সপ্তম শ্রেণি থেকেই তাকে দেখেছি। তখন তার রোল ছিল ১৭ কি ১৮ হবে। কিন্তু রোল নম্বরের আড়ালে আমি অন্য কিছু দেখতে পেয়েছিলাম—চেষ্টা, জেদ এবং নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার মানসিকতা। তাই অনেক সময় শ্রেণিকক্ষে অন্য শিক্ষার্থীদের বলতাম, “এবার কিন্তু ফলাফলে মযুরীর সঙ্গে তোমরা পারবে না, সাবধান!” কথাটার মধ্যে ছিল তাকে নিয়ে আমার বিশ্বাস এবং তার প্রতি এক ধরনের ইতিবাচক চ্যালেঞ্জ। এরপর প্রতিটি শ্রেণিতেই মযুরী ভালো করেছে। ধীরে ধীরে তার অগ্রগতি চোখে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষায় সে অর্জন করেছে ৪.৮৯ GPA। এসএসসির পরে কথা হয়েছে, বললো স্যার ২ মার্কের জন্য এ+ মিস হলো। ইন্টারে হবেই হবে!! এটা তার আত্মবিশ্বাস। একজন শিক্ষক হিসেবে এই ফলাফল আমার কাছে শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি চেষ্টা, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের একটি সুন্দর উদাহরণ।
মযুরীর গল্প আমাকে মনে করিয়ে দেয় কোনো শিক্ষার্থীর বর্তমান অবস্থান দেখে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা উচিত নয়। আজ যে শিক্ষার্থী মাঝামাঝি অবস্থানে আছে, সঠিক দিকনির্দেশনা, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাস পেলে আগামীকাল সে-ই অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে।
আশরাফুলের গল্পটি আবার অন্যরকম। আশরাফুল যথেষ্ট মেধাবী একজন শিক্ষার্থী। কিন্তু তার গল্প শুধু মেধার গল্প নয়; এটি সংগ্রাম, অধ্যবসায় এবং প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।
দারিদ্র্যসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থীর সামনে যখন শুধু পড়াশোনার চ্যালেঞ্জ থাকে, তখন কিছু শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার পাশাপাশি জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গেও লড়াই করতে হয়। আশরাফুল সেই লড়াই করেছে। অভাব তাকে থামাতে পারেনি। প্রতিকূলতা তাকে স্বপ্ন থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। নিজের মেধা, চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সে সামনে এগিয়ে গেছে।শেষ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষায় সে চমৎকার ফলাফল অর্জন করেছে। স্কুলের হয়ে বেস্ট রেজাল্ট করেছে।
একজন শিক্ষক হিসেবে এই সাফল্য আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়।
কারণ এখানে শুধু একটি ফলাফল নেই; এখানে আছে অভাবের বিরুদ্ধে লড়াই, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই এবং নিজেকে প্রমাণ করার লড়াই। এই তিনটি অভিজ্ঞতা আমাকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে।
ফেন্সি আমাকে শিখিয়েছে— প্রতিভাকে সময়মতো চিনে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে হয়।
মযুরী আমাকে শিখিয়েছে— বর্তমান ফলাফল, রোল কিংবা অবস্থান দিয়ে কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না।
আশরাফুল আমাকে শিখিয়েছে— প্রতিকূলতা যত কঠিনই হোক, মেধা, অধ্যবসায় ও দৃঢ় মনোবল মানুষকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিতে পারে।
আর এই তিনটি অভিজ্ঞতা আমাকে শিক্ষক হিসেবে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা দিয়েছে, তা হলো
একজন শিক্ষার্থীকে শুধু পড়ালেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাকে বিশ্বাসও করতে হয়।
এই জায়গাতেই শিক্ষকতায় Passion বা পেশার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতার প্রয়োজন।
একজন শিক্ষক যদি শুধু নির্ধারিত সময়ের দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে হয়তো একটি ক্লাস শেষ হবে, একটি অধ্যায় শেষ হবে, একটি পরীক্ষা নেওয়া হবে।
কিন্তু একজন শিক্ষক যদি তাঁর পেশার প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করেন, তাহলে তিনি একজন শিক্ষার্থীর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারেন।
কোন শিক্ষার্থী ভালো করছে, কে পিছিয়ে পড়ছে, কে চেষ্টা করছে, কে চুপচাপ আছে, কার আত্মবিশ্বাস কমে গেছে এসব লক্ষ্য করার জন্য শিক্ষকের মধ্যে আন্তরিকতা থাকতে হয়।
ফেন্সিকে অন্য শাখা থেকে এনে উৎসাহ দেওয়া, মযুরীর সম্ভাবনা দেখে তাকে ইতিবাচকভাবে চ্যালেঞ্জ করা কিংবা আশরাফুলের প্রতিকূলতার মধ্যেও তার মেধা ও অধ্যবসায়কে মূল্য দেওয়া—এসব কোনো পাঠ্যবইয়ের অধ্যায়ের অংশ নয়।
এসব আসে শিক্ষকতার প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকে।
কোচিং নিয়েও আমার ভাবনাটা একটু ভিন্ন।
কোচিং বা অতিরিক্ত পাঠদানকে এক কথায় নেতিবাচকভাবে দেখার কোনো কারণ নেই। অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠের পাশাপাশি অতিরিক্ত অনুশীলন, বিষয়ভিত্তিক সহযোগিতা কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কোচিংয়ের সহায়তা নেয়। অনেক শিক্ষকও অতিরিক্ত সময় ও শ্রম দিয়ে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করেন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা উপকৃতও হতে পারে।
তবে মূল প্রশ্ন হলো কোচিং করা হচ্ছে কী উদ্দেশ্যে এবং শিক্ষার্থীর প্রতি দায়িত্ববোধটি কতটা অক্ষুণ্ন থাকছে? আমার কাছে শিক্ষকতার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর শেখা ও বিকাশ।
শিক্ষার্থী দুর্বল হলে তাকে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, মেধাবী হলে তার সম্ভাবনাকে কীভাবে আরও বিকশিত করা যায় সেটিই হওয়া উচিত মূল চিন্তা। শিক্ষাদানের সঙ্গে বাণিজ্যিক বিষয় যুক্ত থাকতেই পারে; কিন্তু অর্থনৈতিক স্বার্থ যেন কখনো শিক্ষার্থীর স্বার্থকে ছাপিয়ে না যায় এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষাকে খাটো না করে, কোনো শিক্ষার্থীকে ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত নির্ভরশীল না করে এবং অর্থনৈতিক সামর্থ্যের কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে পিছিয়ে পড়ার অনুভূতি না দিয়ে যদি অতিরিক্ত শিক্ষাসেবা দেওয়া যায়, তাহলে সেটিও শিক্ষার্থীর জন্য সহায়ক হতে পারে। তাই আমার কাছে শিক্ষক ও কোচিং একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়।
মূল বিষয় হলো—নৈতিকতা, স্বচ্ছতা, পেশাগত দায়িত্ববোধ এবং শিক্ষার্থীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। বর্তমান সময়ে একজন শিক্ষককে নিজের বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষণ-পদ্ধতি, শিক্ষার্থীর শেখার বৈচিত্র্য এবং প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কেও জানতে হবে।
আজকের শিক্ষার্থীরা তথ্যের বিশাল জগতের মধ্যে বেড়ে উঠছে। তাই শিক্ষককে শুধু তথ্যের উৎস হয়ে থাকলে চলবে না; শিক্ষার্থীকে সঠিক তথ্য খুঁজে বের করা, তার সত্যতা যাচাই করা এবং জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করাও শেখাতে হবে। প্রযুক্তি শিক্ষককে প্রতিস্থাপন করবে না; একজন দক্ষ শিক্ষক প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে শিক্ষার্থীর শেখাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারেন।নআমার শিক্ষকতার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি—কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে শুধু একটি সুযোগ দিতে হয়। কাউকে একটু উৎসাহ দিতে হয়। কাউকে বলতে হয়—“তুমি পারবে।”
কাউকে বুঝিয়ে বলতে হয়—“তোমার বর্তমান ফলাফল তোমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।”
আর কাউকে তার সংগ্রামের মধ্যেও পাশে দাঁড়িয়ে বলতে হয়—“লড়াই চালিয়ে যাও।”
ফেন্সি, মযুরী ও আশরাফুল—তিনটি আলাদা গল্প, তিনটি আলাদা পথ এবং তিন ধরনের বাস্তবতা।
কিন্তু তাদের গল্পের ভেতর দিয়ে আমি একজন শিক্ষক হিসেবে একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি— প্রতিটি শিক্ষার্থীর ভেতরেই কোনো না কোনো সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে।
সেই সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করা, তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা, তার আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং নিজের সামর্থ্যকে চিনতে সাহায্য করা—এটাই একজন শিক্ষকের অন্যতম বড় দায়িত্ব।
হয়তো আমরা প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে প্রথম বানাতে পারব না।
হয়তো প্রত্যেক শিক্ষার্থী GPA-5 অর্জন করবে না। কিন্তু আমরা প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বলতে পারি—
“তুমি তোমার সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করো। আমি তোমার পাশে আছি।”
একজন শিক্ষকের কাছে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? কারণ শিক্ষক শুধু পরীক্ষার খাতা দেখেন না। তিনি শিক্ষার্থীর সম্ভাবনা দেখেন। তিনি শুধু বর্তমান দেখেন না। তিনি ভবিষ্যৎ দেখার চেষ্টা করেন। আর একজন ভালো শিক্ষক শুধু সফল শিক্ষার্থী তৈরি করেন না।
তিনি এমন মানুষ তৈরির চেষ্টা করেন, যারা একদিন নিজের সাফল্যের গল্পে তাদের শিক্ষকের একটি ছোট্ট অবদানের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।
শিক্ষকতা তাই আমার কাছে শুধু পেশা নয়, এটি মানুষ গড়ার এক নিরন্তর সাধনা।
লেখক -আলীম প্রামাণীক
সহকারী শিক্ষক
ধূরুং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ
কুতুবদিয়া, কক্সবাজার।
আলীম প্রামাণীক 
























