বাংলাদেশের সামাজিক সংস্কৃতিতে “আপা” ও “ভাইয়া” শব্দ দুটি কেবল সম্বোধন নয়, বরং আত্মীয়তা, সম্মান ও মানবিক দূরত্ব কমানোর এক অনন্য ভাষা। গ্রাম থেকে শহর, রাজনীতি থেকে ব্যবসা, সবখানেই এই সম্বোধন সহজ সম্পর্ক গড়ে তোলে। অথচ বিস্ময়ের বিষয় হলো, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো বা আমলাতন্ত্রে এই শব্দগুলো প্রায় অদৃশ্য। সেখানে এখনো “স্যার” ও “ম্যাডাম” যেন এক অলিখিত বাধ্যবাধকতা।
এর পেছনে রয়েছে ঔপনিবেশিক আমলের দীর্ঘ ইতিহাস। ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় প্রশাসনকে জনগণের সেবক নয়, বরং শাসক শ্রেণি হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। সেই সময়ে “স্যার” ছিল ক্ষমতার প্রতীক, আর সাধারণ মানুষ ছিল আনুগত্য প্রদর্শনের পক্ষ। স্বাধীনতার বহু দশক পরও প্রশাসনিক সংস্কৃতির ভেতর সেই মানসিকতার অনেকাংশ রয়ে গেছে। পদমর্যাদা ও দূরত্বকে মর্যাদার অংশ হিসেবে দেখার প্রবণতা এখনো শক্তিশালী।
বর্তমান সময়ে বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনিক আচরণ আরও মানবিক ও অংশীদারিত্ব মূলক হয়েছে। সেখানে কর্মকর্তারা নিজেদের “পাবলিক সার্ভেন্ট” হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই সম্বোধন এখনো ক্ষমতার প্রতীক হয়ে আছে, সেবার নয়।
অথচ “আপা” বা “ভাইয়া” বললে সম্মান কমে যায় না; বরং নাগরিক ও প্রশাসনের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব কমে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের সঙ্গে প্রশাসনের সম্পর্ক হওয়া উচিত আস্থার, আতঙ্কের নয়; সহযোগিতার, আনুষ্ঠানিক দূরত্বের নয়।
সময় এসেছে ভাষার ভেতর লুকিয়ে থাকা ঔপনিবেশিক মানসিকতাকেও নতুনভাবে ভাবার। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কেবল ক্ষমতার আনুষ্ঠানিকতায় নয়, মানুষের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতায় নিহিত।
শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক 






















