বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমার উৎসবের শেষ দিনে রামুর বাঁকখালী নদীতে সম্প্রীতির বন্ধনে কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে ‘২৯ সেপ্টেম্বর সেই কালো রাত, বিচারহীনতার ১৪ বছর- সম্প্রীতির জাহাজে, ফানুসের আলোয় দূর হোক অন্ধকার’-এ শ্লোগানে জাহাজ ভাসানোর আয়োজন করা হয়। ব্যতিক্রমী এ আনন্দযজ্ঞ উদ্বোধন করেন বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাষ্টের চেয়ারম্যান সুকোমল বড়ুয়া।
কেন্দ্রীয় প্রবারণা পূর্ণিমা ও কল্প জাহাজ ভাসা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বিপ্লব বড়ুয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, রামুর কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব আমি প্রথমবার দেখে অভিভূত হয়েছি। এখানে সমস্ত জাতির মহামিলন বলে দেয় বাংলাদেশ শান্তির অসাম্প্রদায়িক দেশ। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন এই দেশের প্রতিটা মানুষের অধিকার সমান। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য এ রাষ্ট্র নয়। পাহাড়, সমতল বিভাজন তৈরি হবে না, সব ধর্ম-বর্ণ একসাথে মিলেমিশে থাকবো। কিছু মানুষ ধর্মের নামে, রাজনীতির নামে, সংস্কৃতির নামে এই দেশকে বিভাজন করতে চাই। এসব থেকে সতর্ক থাকতে হবে। এ উৎসবে সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে সত্যি বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।
উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দয়াল বড়ুয়ার সঞ্চালনায় উদ্বোধক সুকোমল বড়ুয়া বলেন, অন্য সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসবে সরকারি বন্ধ মিলে। আমরাও প্রবারণা পূর্ণিমাতে সরকারি বরাদ্দ পেতে প্রধানমন্ত্রীকে দাবি জানাবো।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ও সদর-রামু-ঈদগাঁও আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, ‘রামুর বৌদ্ধ মন্দির ও পল্লীতে হামলার ঘটনায় মামলা গুলোর কোনো অগ্রগতি নেই। অনেক আসামী ও দোষীদের বিচার হয়না। মামলার পুনঃতদন্তের জন্য সরকারিভাবে চেষ্টা চলছে।’
জাহাজ ভাসা উৎসবের প্রধান সমন্বয়ক অর্পন বড়ুয়া বলেন, সব ধর্মের মানুষ ৭১-এ স্বাধীনতার জন্য যাপিয়ে পড়েছিল। সেই সম্প্রীতির ঐতিহ্যে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরে আঘাত হানে দুস্কৃতিকারীরা। সেই ঘটনায় পুরোনো ঐতিহ্য পুড়ে গেলেও সময়ের আবর্তনে সবকিছু নতুন করে পেয়েছে বৌদ্ধপল্লী- কিন্তু ১৪ বছর বিচারহীনতায় কেটেছে। এরপরও জাহাজ ভাসা উৎসবে সকল ধর্মের মানুষের উপস্থিতি আমাদের অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সেই ঐতিহ্য এখনো অটুট রয়েছে তা জানান দেয়। তবে, কলংখিত সেই ঘটনার উস্কানিদাতা ও নেক্কারজনক ঘটনা সম্পাদনকারিদের সনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখী করা বৌদ্ধ সম্প্রদায়সহ সর্বস্তরের শান্তিপ্রিয় মানুষের দাবি।
রামুর ইউএনও মো. জিল্লুর রহমান বলেন, জাহাজ ভাসা উৎসবটি মূলত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের হলেও এখানে সকল ধর্মের মানুষের উপস্থিতি লক্ষনীয়। যা সকল ধর্মের মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো বক্তব্য রাখেন, কক্সবাজার সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসান, রামু থানার ওসি একে ফজলুল হক, রামু উপজেলা বিএনপির আহবায়ক মোক্তার আহমদ, সদস্য সচিব আবুল বশর বাবু, ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন, বিএনপি নেতা মাহিন চৌধুরীসহ অনেকে।
এতে রামুর কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের অধ্যক্ষ, প্রতিটি বিহারের কর্তাগণ, বৌদ্ধ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টিম, সাংবাদিক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং শুভাকাঙ্খিরা উপস্থিত ছিলেন।
দেখা গেছে, রামুর রাজারকুল, হাজারীকুল, হাইটুপী রাখাইন পাড়া, হাইটুপী বড়ুয়াপাড়া, দ্বীপ-শ্রীকুল, জাদিপাড়া ও মেরংলোয়া গ্রাম থেকে মোট সাতটি কল্পজাহাজ নদীতে ভাসানো হয়।
একাধিক নৌকার উপর বসানো বাঁশ, বেত, কাঠ এবং রঙিন কাগজ দিয়ে অপূর্ব কারুকাজে তৈরি এক-একটি কল্প জাহাজ আকর্ষণীয় নির্মাণ শৈলীর কারণে খুব সহজেই সবার দৃষ্টি কাড়ে।
প্রতিটি জাহাজেই আছে একাধিক মাইক। ঢোল, কাঁসর, মন্দিরাসহ নানা বাদ্যের তালে জাহাজের উপরে শিশু কিশোর ও যুবকরা নেচে গেয়ে অন্যরকম আনন্দে মাতে। জাহাজ নিয়ে ভেসে এপার থেকে ওপারে যেতে যেতে মাইকে চলে বৌদ্ধ কীর্তন-নাচসহ নানা আনন্দায়োজন। নদীর দুপাড়ে উৎসব মূখর জনতা কল্পজাহাজ ভাসা দেখার জন্য দুপাড়ে ভীড় জমায় ও বিভিন্ন ধর্মীয় মানুষ অনুষ্টান উপভোগ করেন।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে কল্পজাহাজ ভাসা শেষে বৌদ্ধধর্মীয় নেতারা মিলে সাআ…দু, সাআ…দু ধ্বনিতে উৎসব মূখর পরিবেশে ফানুস উড়িয়ে দেন। পরে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আয়োজনের সমাপ্তি হয়।
উল্লেখ্য, অর্ধশতাব্দীকাল ধরে রামুতে এ উৎসবের আয়োজন করা হলেও ২০১২ সালে বৌদ্ধ পল্লীতে হামলার ঘটনার পর দুই বছর এ কল্পজাহাজ ভাসা উদযাপন হয়নি। দু’বছর পর আবারো প্রতি বছর থেকে উৎসবের আমেজে তা পালন করা হচ্ছে। বৌদ্ধ-হিন্দু-মুসলিম সকল সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে এ উৎসব অসাম্প্রদায়িক মিলন মেলায় পরিণত হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















