ফল প্রকাশের দিনটি কারও জন্য বয়ে আনে আনন্দের উচ্ছ্বাস, কারও চোখে জ্বেলে দেয় স্বপ্নপূরণের দীপ্তি। আবার কারও জন্য সেই দিনটিই হয়ে ওঠে নীরব হতাশার। তবে সাফল্যের উল্লাস আর ব্যর্থতার বেদনার মাঝেও শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে শহীদ লেফটেন্যান্ট তানজিম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ (এসটিসিপিসি), এবারের এসএসসি ফলাফলে সেটিই যেন আলাদা এক গল্প হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে রামু উপজেলার একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এচঅ-৫ অর্জনের সংখ্যায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে এসটিসিপিসি। প্রতিষ্ঠানটির ৯০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮৯ জন। পাসের হার ৯৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এর মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ -৫ এবং ৯ জন গোল্ডেন জিপিএ -৫ অর্জন করেছে।
শুধু সংখ্যার বিচারে নয়, ব্যক্তিগত সাফল্যেও উজ্জ্বল করেছে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা। চ্যাং পাং ইয়ে চাক জেন্সি অর্জন করেছে সর্বোচ্চ ১২৪৩ নম্বর, যা এবারের ফলাফলে প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের মুকুটে যুক্ত করেছে আরেকটি উজ্জ্বল পালক।
ফল প্রকাশের পর ক্যাম্পাসজুড়ে নেমে আসে উৎসবের আবহ। শিক্ষার্থীদের মুখে হাসি, শিক্ষক-অভিভাবকদের চোখে গর্ব আর দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের সফল পরিণতিতে আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণ। ২৮টি জিপিএ -৫ যেন সেই পরিশ্রমের ২৮টি উজ্জ্বল স্বাক্ষর; আর ৯টি গোল্ডেন জিপিএ -৫ যেন আরও কিছু স্বপ্নের সোনালি অর্জন।
কিন্তু এই আনন্দের ভিড়েও প্রতিষ্ঠানটি ভুলে যায়নি সেই শিক্ষার্থীকে, যার হাতে কাংখিত সাফল্য ধরা দেয়নি।
প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় মন ভেঙে পড়া শিক্ষার্থী প্রীতমের পাশে দাঁড়াতে তার বাড়িতে ছুটে যান প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মেজর মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন ভূঁঞা, এসপিপি, এইসি, শ্রেণিশিক্ষক, অন্যান্য শিক্ষক এবং সহপাঠীরা। তাঁরা প্রীতমের সঙ্গে কথা বলেন, তার মনোবল বাড়ান এবং তাকে বোঝান একটি পরীক্ষার ফলাফল কখনোই একজন মানুষের সামগ্রিক সক্ষমতা কিংবা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।
অধ্যক্ষের চিন্তার সৌরভ এবং কথাগুলো যেন ফলাফলের হিসাবের বাইরের এক বড় শিক্ষা- “ফলাফল নয়, চেষ্টা ও এগিয়ে যাওয়াই জীবনের আসল সাফল্য।”
সেদিন হয়তো কোনো পুরস্কার হাতে ওঠেনি প্রীতমের। কিন্তু তার দরজায় যখন অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও সহপাঠীরা একসঙ্গে গিয়ে দাঁড়ালেন, তখন সে পেল অন্য এক পুরস্কার হাল না ছাড়ার সাহস। বোধের এই ঋদ্ধতা ছড়িয়ে পড়ুক সবার মাঝে..
শিক্ষাঙ্গনে সাফল্যের গল্প সাধারণত লেখা হয় জিপিএ, নম্বর কিংবা মেধাতালিকার সংখ্যায়। কিন্তু এসটিসিপিসি-এর এবারের গল্পটি যেন সেই প্রচলিত হিসাবের গণ্ডি পেরিয়ে আরও বড় হয়ে উঠেছে। এখানে যেমন সাফল্যের মঞ্চে ২৮টি জিপিএ-৫-এর দীপ্তি, তেমনি ব্যর্থতার মুহূর্তে একজন শিক্ষার্থীর কাঁধে রাখা সান্ত্বনার হাতও হয়ে উঠেছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একজন শিক্ষার্থী যখন সফল হয়, তখন তাকে অভিনন্দন জানানো সহজ; কিন্তু সে যখন হোঁচট খায়, তখন তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস দেওয়াই প্রকৃত শিক্ষার পরিচয়।
এসটিসিপিসি-এর এবারের ফলাফল তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি পরিশ্রমের জয়, স্বপ্নের জয়, শিক্ষকদের নিষ্ঠার জয় এবং একই সঙ্গে মানবিক শিক্ষারও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রামুর শিক্ষাঙ্গনে ফলাফলের শীর্ষে উঠে এসে এসটিসিপিসি হয়তো আরও একবার প্রমাণ করল- একটি ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু ভালো ফলাফল তৈরি করে না; সে তৈরি করে আত্মবিশ্বাসী, সহমর্মী এবং ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে জানা মানুষ।
প্রীতমের জন্য তাই এই দিনটি শেষ হয়ে যাওয়ার দিন নয়; বরং নতুন করে শুরু করার দিন। আর তার পাশে দাঁড়ানো শিক্ষক-সহপাঠীদের ভালোবাসা হয়তো সেই নতুন পথচলার প্রথম আলো।
সাফল্যের দিনে উল্লাস আর ব্যর্থতার দিনে পাশে দাঁড়ানো-এই দুইয়ের সমন্বয়েই যেন পূর্ণতা পেল এসটিসিপিসি-এর এবারের এসএসসি ফলাফলের গল্প।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
















