বাংলাদেশের ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার উপহার হিসেবে ৮৮ কোটি টাকা (৬.৬ মিলিয়ন ডলার) ব্যয়ে নির্মিতব্য আধুনিক ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার বাস্তবায়ন অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে জমি জটিলতা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আটকে থাকা প্রকল্পটির জন্য কক্সবাজারের রামু উপজেলার রশিদনগরে ১৫.২০ একর জমি বরাদ্দ সম্পন্ন হয়েছে।
বাফুফে সূত্র জানিয়েছে, রামুর স্বপ্নতরী বিনোদন কেন্দ্রের পাশে মহাসড়কসংলগ্ন খাস জমিতে টেকনিক্যাল সেন্টারটি নির্মিত হবে। প্রাথমিক প্রশাসনিক কার্যক্রম শেষে জমি বরাদ্দের ফাইল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদন ও রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হলেই নির্মাণকাজ শুরু হবে।
বাফুফের কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় দল, নারী দল এবং অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-২০, অনূর্ধ্ব-২৩সহ সব বয়সভিত্তিক দলের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, কোচিং শিক্ষা ও খেলোয়াড় তৈরির কার্যক্রম এক ছাতার নিচে পরিচালনার লক্ষ্যেই এই কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হবে আন্তর্জাতিক মানের একাধিক প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম ঘাসের ফুটবল মাঠ, আধুনিক জিমনেশিয়াম, চারতলা আবাসিক ভবন, ক্লাসরুম, ইনডোর ট্রেনিং সুবিধা, স্পোর্টস সায়েন্স ও মেডিকেল ইউনিট, ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, ভিডিও অ্যানালাইসিস ল্যাব, কোচিং এডুকেশন সেন্টার, ডাইনিং ও কনফারেন্স সুবিধা এবং বয়সভিত্তিক দলের জন্য পৃথক আবাসন।
বাফুফের মতে, কেন্দ্রটি চালু হলে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মানের স্থায়ী ফুটবল প্রশিক্ষণ অবকাঠামো গড়ে উঠবে। এতে বিদেশে প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভরতা কমবে, খেলোয়াড়দের বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত হবে এবং সারাদেশের প্রতিভাবান ফুটবলারদের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাফুফের দাপ্তরিক সূত্র জানায়,২০২২ সালে ফিফার নির্বাহী কমিটি বাংলাদেশের জন্য এই টেকনিক্যাল সেন্টার অনুমোদন দেয়। এরপর দেশের বিভিন্ন এলাকায় সমীক্ষা চালিয়ে কক্সবাজারকে প্রকল্পের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়।
প্রথমে রামুর খুনিয়াপালং এলাকায় ২০ একর জমি নির্ধারণ করা হলেও সেটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আওতায় পড়ায় পরিবেশগত আপত্তির মুখে প্রকল্পটি বাতিল করতে হয়। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সুপারিশে পরে বিকল্প জমি খোঁজা শুরু হয়।
দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০২৫ সালে রামুর রশিদনগরের ধলিরছড়া মৌজায় ১৫.২০ একর খাস জমি চূড়ান্ত করা হয়। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জমিটি বাফুফের নামে বন্দোবস্তের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বাফুফের প্রকল্প কর্মকর্তা তানভির আহমেদ ছিদ্দিকী বলেন, কক্সবাজারকে নির্বাচনের পেছনে রয়েছে পর্যাপ্ত জায়গা, ভৌগোলিক সুবিধা এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা। মহাসড়কের পাশে হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও সহজ হবে।
প্রকল্পের স্থানীয় লিয়াজোঁ কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ জানান, ২০২২ সাল থেকে জমি নিয়ে নানা জটিলতা চললেও শেষ পর্যন্ত পরিবেশগতভাবে উপযোগী স্থান নির্বাচন সম্ভব হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজারের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিন বলেন, নির্বাচিত জমিটি পাহাড় শ্রেণির নয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা নেই। এ কারণে অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমরান হোসাইন সজীব জানান, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা প্রশাসন জমি নির্ধারণ ও বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান কামরুল হাসান হিলটন বলেন, জমি বরাদ্দের স্থানীয় প্রক্রিয়া শেষে ফাইলটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন নিয়ে এখন ভূমি মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। দ্রুত অনুমোদন পাওয়া যাবে বলে তারা আশাবাদী।
তিনি আরও বলেন, নানা সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা হয়েছে। এ সময়ে একাধিকবার ফিফার কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করতে হয়েছে। প্রকল্পটি বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছিল। তবে সরকারের সহযোগিতা ও বাফুফের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় প্রকল্পটি রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এখন দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করে দেশের ফুটবলের জন্য একটি স্থায়ী আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলাই লক্ষ্য।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কেবল কক্সবাজার নয়, বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সুবিধা দেশের খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়ায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং ভবিষ্যতে জাতীয় ফুটবলের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে রামুর এই টেকনিক্যাল সেন্টার।
নিজস্ব প্রতিবেদক (রামু) 
















