মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে মারা যাওয়া চার ভাইয়ের পরিবারটি এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। একদিকে, একসঙ্গে চার জনকে হারানোর ভয়াবহ শোক, অন্যদিকে সংসার কীভাবে চলবে– এ নিয়েও উদ্বেগ দেখা গেছে। মারা যাওয়া চার ভাইয়ের আয়ের ওপরই মূলত নির্ভরশীল ছিল পুরো পরিবার। এদিকে, মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর চার ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পেরেছেন বৃদ্ধ মা খদিজা বেগম। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি। পরে যখন অ্যাম্বুলেন্স থেকে একে একে চার ছেলের কফিনবন্দি লাশ নামানো হয়, তা দেখে আহাজারি করতে থাকেন। বারবার জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিলেন।
মৃত চার জন হলেন– রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের মরহুম জামাল উদ্দিনের ছেলে তারা। বেঁচে আছেন তাদের একমাত্র ভাই মুহাম্মদ এনামুল হক। তিনি একটি মাদ্রাসায় খণ্ডখালীন শিক্ষকতা করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এক সময় জামাল উদ্দিনের পরিবার খুব আর্থিক অনটনের মধ্যে দিয়ে দিন কাটিয়েছে। ছেলেগুলো ছোট থাকা অবস্থায় তাদের জামাল মারা যান। ১১-১২ বছর আগে প্রথমে শাহেদুল ইসলাম ওমানে যান। সেখানে যাওয়ার কয়েক বছর পর একে একে বাকি তিন ভাইও সে দেশে পাড়ি জমান। তাদের আয়ও ভালো ছিল। দুঃখ-কষ্টের সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা এসেছে। তারা ওমানে দুটি গাড়ি ওয়াশিংয়ের ব্যবসা গড়ে তোলেন। আগে তাদের কুড়ে ঘরে ছিল। কয়েক বছর আগে এলাকায় জমি কিনে পাকা ভবন করেছে। এখন তারা একসঙ্গে মারা গেছেন, কীভাবে তাদের সংসার চলবে?’
চার ভাইয়ের মধ্যে রাশেদুল ইসলাম ও শাহেদুল ইসলাম ছিল বিবাহিত। রাশেদুল ইসলামের সংসারে তিন বছরের একটি মেয়ে এবং আড়াই মাস বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। অপরদিকে শাহেদুল ৭ মাস আগে বিয়ে করেছিলেন। তার স্ত্রী শান্তা আকতার তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বাকি দুই ভাইয়ের মধ্যে সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলামের বিয়ের জন্য কনে দেখা চলছিল। শুক্রবার (১৫ মে) তাদের দেশে আসার কথা ছিল। তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজনের প্রস্তুতিও ছিল।
এদিকে, বুধবার সকালে লাশ বহন করা অ্যাম্বুলেন্স বাড়ির সামনে আসার পর আহাজারিতে ভেঙে পড়েন নিহত রাশেদুলের স্ত্রী কুলসুমা আক্তার ও সাহেদের স্ত্রী শান্তা আকতার। তারা দুজন আহাজারি করতে করতে বারবার জ্ঞান হারান।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আবদুল মতিন বলেন, ‘চার ভাই একসঙ্গে মারা গেলেন তা এতদিন বৃদ্ধ মাকে জানানো হয়নি। আজ বুধবার সকালে চার ভাইয়ের কফিনবন্দি লাশ একে একে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে তাদের দোতলা বাড়ির নিজতলায় রেখে তাদের মাকে জানানো হয়। এরপর মা দোতলায় তার কক্ষ থেকে নিচে নেমে ছেলেদের মরদেহ দেখতে পান।’
উপজেলার লালানগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আমির হোসেন সুমন বলেন, ‘ওমানে থাকা চার ভাইয়ের আয়ের ওপর তাদের সংসারে সচ্ছলতা ফিরেছে। এখন প্রবাস থেকে আয় বন্ধ হয়ে গেলো।’
গত ১৩ মে রাতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার হয় প্রবাসী চার ভাইয়ের মরদেহ। রয়্যাল ওমান পুলিশের ধারণা, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এসির এগজস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাস গ্রহণের ফলে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
বুধবার (২০ মে) বেলা ১১টায় হোছনাবাদ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে চার ভাইয়ের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন তাদের বেঁচে থাকা একমাত্র ছোট ভাই হাফেজ মুহাম্মদ এনামুল হক। জানাজায় কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। পরে কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এর আগে মঙ্গলবার (১৯ মে) রাত ৮টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে মরদেহগুলো ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিশেষ ফ্রিজারে করে মরদেহগুলো রাঙ্গুনিয়ার লালানগর ইউনিয়নের গ্রামের বাড়িতে বুধবার ভোরে নিয়ে আসা হয়।
সূত্র: বাংলা ট্টিবিউন
টিটিএন ডেস্ক: 






















