প্রকৃতির নিয়মে পৌষ ও মাঘ—এই দুই মাস শীতকাল। এ সময় শীতের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়।হিমেল বাতাসে প্রকৃতিতে এক শান্ত, স্নিগ্ধ রূপ ধারণ করলেও এই মৌসুমে বাড়ে নানা সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি। তাপমাত্রা কমে যাওয়া, শুষ্ক ও ধুলোময় বাতাস এবং হঠাৎ আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়।
এই সময়ে শ্বাসতন্ত্রজনিত সংক্রমণ, জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া ও অ্যাজমার মতো রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে এসব রোগ শুধু ভোগান্তির নয়, জীবননাশের কারণও হতে পারে।চিকিৎসকদের মতে, শীতকালীন এসব রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসাই সবচেয়ে কার্যকর।
🔹যেসব রোগব্যাধি হতে পারে
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহজাহান নাজির জানান, শীতে সাধারণত দুই ধরনের রোগ বেশি দেখা যায়—অসংক্রামক ও সংক্রামক। উভয় ধরনের রোগেই ঝুঁকি থাকে, তবে বয়স ও পূর্ববর্তী শারীরিক অবস্থার কারণে কারও কারও ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
🔹অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব
শীতকালে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় অ্যাজমা ও এলার্জিজনিত সমস্যা। যাদের আগে থেকেই অ্যাজমা রয়েছে, ঠান্ডা আবহাওয়ায় তাদের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। আবার অনেকের ক্ষেত্রে শীতকালেই প্রথমবার অ্যাজমার উপসর্গ দেখা দেয়। ঠান্ডা বাতাস, ধুলাবালি ও বায়ু দূষণ অ্যাজমা বাড়িয়ে দেয়।
ডা. শাহজাহান নাজির বলেন,”অ্যাজমা হলে প্রথম ও জরুরি করণীয় হলো মাস্ক ব্যবহার। মাস্কের মাধ্যমে ঠান্ডা বাতাস ও ধুলাবালি থেকে ফুসফুসকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। পাশাপাশি কুসুম গরম পানি পান করা এবং ধূমপান সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা জরুরি”।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “শীতকালে অ্যাজমা রোগীরা ধূমপান করলে সেই ধোঁয়া ফুসফুসে মারাত্মক ক্ষতি করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাণঘাতীও হতে পারে।”
🔹সংক্রামক রোগের ঝুঁকি
শীতকালে ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ভাইরাসজনিত সংক্রমণও বাড়ে। ডা. শাহজাহান নাজির জানান, এ সময় অন্তত ৮ ধরনের ভাইরাস সক্রিয় থাকে। এর মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা, এডিনো ভাইরাস, রাইনো ভাইরাস এবং রেসপিরেটরি সিনসিটিয়াল ভাইরাস (RSV) উল্লেখযোগ্য।
🔹রেসপিরেটরি সিনসিটিয়াল ভাইরাস (RSV)
ডা. শাহজাহান নাজির বলেন,”শীতকালে শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় নিউমোনিয়া, যা মূলত RSV ভাইরাস থেকে হয়ে থাকে। এই ভাইরাসকে বিপজ্জনক ভাইরাস উল্লেখ করে তিনি বলেন,”এটি অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাস, যা শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়। এটি শিশুদের মধ্যে ব্রঙ্কিওলাইটিস ও নিউমোনিয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।”
সাধারণত দুই বছরের মধ্যে বেশিরভাগ শিশুই এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়। সংক্রমণের তীব্রতা ভিন্ন হতে পারে, তবে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে বলে জানান এই চিকিৎসক।
🔹ব্রঙ্কাইটিস ও শ্বাসকষ্ট
শীতকালে বয়স্কদের মধ্যে ব্রঙ্কাইটিস বেশি হয়। ব্রঙ্কাইটিস হলো ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ লাং ডিজিজ (সিওপিডি)-এর একটি প্রধান ধরন।এটি শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া ব্যাহত করে শ্বাসকষ্ট বাড়িয়ে দেয়।যা মাঝে মাঝে জীবননাশকও হতে পারে।
ব্রঙ্কাইটিস রোগের প্রধান কারণ ধূমপান ও বায়ু দূষণ উল্লেখ করে এই চিকিৎসক বলেন, “এই রোগের ঝুঁকি ধূমপায়ীদের সবচেয়ে বেশি।তাই এসময় ধূমপান থেকে বিরত থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি। রোগটি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব”।
এছাড়া অন্যান্য ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সাধারণত নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া, কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দেয় বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ।
🔹শিশু ও বয়স্কদের ঝুঁকি বেশি
ডা. শাহজাহানের মতে,৫ বছরের কম বয়সী শিশু, বিশেষ করে ১ থেকে ৩ বছরের বাচ্চা, এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষদের মধ্যে এসব রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তুলনামূলকভাবে অন্য বয়সীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকায় ঝুঁকি কিছুটা কম থাকে।
🔹প্রতিরোধই প্রধান উপায়
“শীতকালীন রোগ থেকে মুক্ত থাকতে নিয়মিত হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশির সময় কনুই বা টিস্যু দিয়ে মুখ ঢেকে রাখা এবং জনসমাগমে অসুস্থ অবস্থায় না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। পাশাপাশি শিশু ও বয়স্কদের আলাদা যত্ন নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে”, জানান ডাক্তার শাহজাহান নাজির।
🔹অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে মারাত্মক ঝুঁকি
শীতকালে সর্দি, কাশি বা জ্বর হলেই অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করেন, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে সতর্ক করেছেন ডা. শাহজাহান নাজির। তিনি জানান, শীতকালে অধিকাংশ রোগই ভাইরাসজনিত—যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়।
অপ্রয়োজনীয় বা ভুলভাবে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের ফলে শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। এতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলেও ওষুধ কাজ না করার ঝুঁকি বাড়ে এবং সাধারণ সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি রোগ সেরে উঠতে দেরি হয়, সংক্রমণ জটিল হয় এবং কিডনি-লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
🔹ধুলাবালি থেকে সতর্কতা
শীতকালে এলার্জির সমস্যাও বেড়ে যায়। বাতাসে ধুলাবালির পরিমাণ বেশি থাকার কারণে হাঁচি, কাশি ও নাক দিয়ে পানি পড়ার প্রবণতা বাড়ে। একই সঙ্গে উষ্ণতার জন্য ব্যবহৃত পুরোনো লেপ, কম্বল ও শীতের পোশাকে জমে থাকা ধুলাবালিও এলার্জির বড় কারণ।
এই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, শীতের পোশাক বা কম্বল ব্যবহারের আগে কড়া রোদে ভালোভাবে গরম করে নেওয়া উচিত। এতে কাপড়ের ধুলাবালি দূর হয় এবং সূর্যের প্রাকৃতিক জীবাণুনাশক প্রভাব জীবাণু ধ্বংসে সহায়তা করে। শীতের রোদে সাধারণত অতি বেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব কম থাকায় এটি নিরাপদ ও উপকারী।
চিকিৎসকদের মতে, শীতকালীন রোগে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা ও সময়মতো চিকিৎসাই পারে শিশু-বয়স্কসহ সবাইকে সুস্থ রাখতে।
আফজারা রিয়া 
















