ঢাকা ০৯:০৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি চর্চায় বিশ্বাসী’ – হিন্দু ক্যাম্পে ত্রাণ সচিব টেকনাফের বাহারছড়ায় বাড়িতে ঢুকে অস্ত্রের মুখে কৃষক রফিককে অপহরণ ধর্মের পরিচয়ে নয়, নাগরিক হিসেবে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান” মহানবমীতে মন্ডপে মন্ডপে মানুষের ঢল ঘরে ঘরে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করার চিন্তা রয়েছে সরকারের: মাতামুহুরীতে প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ‎ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কে গণডাকাতির ঘটনায় ‎ছাবের ডাকাতের স্ত্রী সন্তান গ্রেফতার : লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার দেশের বৃহত্তম প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠান সৈকতে : প্রধান অতিথি ভূমি প্রতিমন্ত্রী টেকনাফে পৃথক অভিযানে ৪ লাখ ৬০ হাজার ইয়াবাসহ আটক ৪ পেকুয়ায় ক্রীড়া সংস্থার কমিটি অনুমোদন: সভাপতি রফিকুল, সম্পাদক ছাফওয়ান সবাইকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে : প্রধানমন্ত্রী ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার: প্রধানমন্ত্রী মহানবমী আজ, শুরু দেবীর বিদায়ের ক্ষণগণনা আমাকে দেখলে তো লোকে সংবিধান বলে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিশেষ অভিযানে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার ৯ আইডিইবির সদস্যপদ পেলেন কক্সবাজারের ডিপ্লোমা প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল নোমান
মন্তব্য কলাম

মৃত নুর পাগলা বনাম জীবিত আমরা: কোন পথে হাঁটছে বাংলাদেশ!

রাজবাড়ির গোয়ালন্দের সাম্প্রতিক ঘটনাটি, মৃত নুর পাগলাকে কবর থেকে তুলে এনে জনতার সামনে পোড়ানো, বাংলাদেশের সমাজ, আইন ও মানবাধিকারের জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। এটি কেবল মানবিকতার সীমারেখাই নয়, রাষ্ট্রের আইন ও বিচার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও উন্মোচন করেছে। মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, আমরা কি সভ্যতার পথে হাঁটছি, নাকি অন্ধ উগ্রতার অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি?

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ধারা ২৯৭ স্পষ্টভাবে মৃতদেহের অবমাননাকে অপরাধ ঘোষণা করেছে। হাইকোর্টের একাধিক রায়েও বলা হয়েছে, মৃতদেহের মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার এই নৃশংস ঘটনাটি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাই আইনের অস্তিত্ব থাকলেও এর প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতে মৃত দেহকে “quasi-person” হিসেবে বিবেচনা করা হয়, অর্থাৎ মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থাতেও মর্যাদা রক্ষা করা আবশ্যক। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বহু সংস্থা বারবার বলেছে, মৃতদেহের অবমাননা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নুর পাগলার দেহ নিয়ে যা ঘটেছে, তা শুধু দেশের ভেতর নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

ইসলামে মৃতদেহের মর্যাদা রক্ষা ফরজ দায়িত্ব। রাসূল (স.) বলেছেন “মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙা জীবিতের হাড় ভাঙার সমান।” ফলে কবর উল্টানো কিংবা দেহ পোড়ানো ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনও ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় নির্দেশনা এত স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কিছু মানুষ কেন উগ্রতার বশবর্তী হলো, সেটিই আজ বড় প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সামাজিক মেরুকরণ এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। বহুদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, মানুষ আইন হাতে তুলে নিচ্ছে, অথচ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিরোধের যথেষ্ট উদ্যোগ নেই। এর ফলে “মব জাস্টিস” ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

“মৃত নুর পাগলা বনাম জীবিত আমরা” এই প্রতীকী তুলনা আজ বাংলাদেশের সামনে মৌলিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। আমরা কি মানবিকতা, আইন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের পথ বেছে নেব, নাকি অন্ধ উগ্রতার পথ অনুসরণ করব? রাষ্ট্র যদি মৃতের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে জীবিত মানুষের অধিকারই বা কিভাবে সুরক্ষিত হবে? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে; আমরা, নাগরিক ও রাষ্ট্র, এই প্রশ্নের কী উত্তর দিই তার ওপর।

লেখক: শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক,গবেষক ও চিন্তক।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি চর্চায় বিশ্বাসী’ – হিন্দু ক্যাম্পে ত্রাণ সচিব

মন্তব্য কলাম

মৃত নুর পাগলা বনাম জীবিত আমরা: কোন পথে হাঁটছে বাংলাদেশ!

আপডেট সময় : ১২:০১:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫

রাজবাড়ির গোয়ালন্দের সাম্প্রতিক ঘটনাটি, মৃত নুর পাগলাকে কবর থেকে তুলে এনে জনতার সামনে পোড়ানো, বাংলাদেশের সমাজ, আইন ও মানবাধিকারের জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। এটি কেবল মানবিকতার সীমারেখাই নয়, রাষ্ট্রের আইন ও বিচার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও উন্মোচন করেছে। মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, আমরা কি সভ্যতার পথে হাঁটছি, নাকি অন্ধ উগ্রতার অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি?

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ধারা ২৯৭ স্পষ্টভাবে মৃতদেহের অবমাননাকে অপরাধ ঘোষণা করেছে। হাইকোর্টের একাধিক রায়েও বলা হয়েছে, মৃতদেহের মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার এই নৃশংস ঘটনাটি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাই আইনের অস্তিত্ব থাকলেও এর প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতে মৃত দেহকে “quasi-person” হিসেবে বিবেচনা করা হয়, অর্থাৎ মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থাতেও মর্যাদা রক্ষা করা আবশ্যক। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বহু সংস্থা বারবার বলেছে, মৃতদেহের অবমাননা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নুর পাগলার দেহ নিয়ে যা ঘটেছে, তা শুধু দেশের ভেতর নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

ইসলামে মৃতদেহের মর্যাদা রক্ষা ফরজ দায়িত্ব। রাসূল (স.) বলেছেন “মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙা জীবিতের হাড় ভাঙার সমান।” ফলে কবর উল্টানো কিংবা দেহ পোড়ানো ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনও ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় নির্দেশনা এত স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কিছু মানুষ কেন উগ্রতার বশবর্তী হলো, সেটিই আজ বড় প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সামাজিক মেরুকরণ এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। বহুদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, মানুষ আইন হাতে তুলে নিচ্ছে, অথচ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিরোধের যথেষ্ট উদ্যোগ নেই। এর ফলে “মব জাস্টিস” ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

“মৃত নুর পাগলা বনাম জীবিত আমরা” এই প্রতীকী তুলনা আজ বাংলাদেশের সামনে মৌলিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। আমরা কি মানবিকতা, আইন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের পথ বেছে নেব, নাকি অন্ধ উগ্রতার পথ অনুসরণ করব? রাষ্ট্র যদি মৃতের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে জীবিত মানুষের অধিকারই বা কিভাবে সুরক্ষিত হবে? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে; আমরা, নাগরিক ও রাষ্ট্র, এই প্রশ্নের কী উত্তর দিই তার ওপর।

লেখক: শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক,গবেষক ও চিন্তক।