ঢাকা ০৫:৩৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
কলাতলীতে অবৈধ স্থাপনা সরাতে ২৪ ঘন্টার সময় বেঁধে দিলো প্রশাসন হাসপাতাল থেকে হাতকড়াসহ পালালো অস্ত্র মামলার আসামী রোহিঙ্গা ইব্রাহিম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অশালীন আচরণের অভিযোগ : তদন্ত প্রতিবেদন জমা কুলসুমার সঙ্গে বাসটার্মিনালের হোটেলে উঠেছিল যুবক, পরে মিললো মরদেহ হাদির নাম মুছে ঢাবির হলের ফটকে ফিরছে বঙ্গবন্ধুর নাম লোহাগাড়ায় ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির যাচাই-বাছাই কমিটি : প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূলের ‘রায়’ সদর থানার বিশেষ অভিযান : গ্রেফতার ৯ ৩৯ দিন ধরে খোঁজ মিলছে না ব্যবসায়ী জসিমের ​হারানো সরকারি অস্ত্রের তথ্য দিলে মিলবে নগদ অর্থ পুরস্কার কক্সবাজারে ১৪ কেজি চোরাই মালামালসহ ভাঙ্গারী দোকানদার গ্রেপ্তার টেকনাফে দুই বিদ্যালয়ের ৮ শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চাষ করেছেন ৭ কানি, দিনভর লাইনে দাঁড়িয়ে সার পেলেন ৫ কেজি মাঝ আকাশে ইসরায়েলগামী বিমানের পাইলটকে ছুরিকাঘাত, তবুও যেভাবে বেঁচে ফিরল ১৮০ যাত্রী মরিয়মের পরিবারের সঙ্গে আপস: জামিন পেলেন গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী ঘুষ হিসেবে জমি নিয়ে ফাঁসলেন উপ-সচিবসহ ৫ জন
মন্তব্য কলাম

মৃত নুর পাগলা বনাম জীবিত আমরা: কোন পথে হাঁটছে বাংলাদেশ!

রাজবাড়ির গোয়ালন্দের সাম্প্রতিক ঘটনাটি, মৃত নুর পাগলাকে কবর থেকে তুলে এনে জনতার সামনে পোড়ানো, বাংলাদেশের সমাজ, আইন ও মানবাধিকারের জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। এটি কেবল মানবিকতার সীমারেখাই নয়, রাষ্ট্রের আইন ও বিচার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও উন্মোচন করেছে। মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, আমরা কি সভ্যতার পথে হাঁটছি, নাকি অন্ধ উগ্রতার অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি?

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ধারা ২৯৭ স্পষ্টভাবে মৃতদেহের অবমাননাকে অপরাধ ঘোষণা করেছে। হাইকোর্টের একাধিক রায়েও বলা হয়েছে, মৃতদেহের মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার এই নৃশংস ঘটনাটি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাই আইনের অস্তিত্ব থাকলেও এর প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতে মৃত দেহকে “quasi-person” হিসেবে বিবেচনা করা হয়, অর্থাৎ মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থাতেও মর্যাদা রক্ষা করা আবশ্যক। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বহু সংস্থা বারবার বলেছে, মৃতদেহের অবমাননা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নুর পাগলার দেহ নিয়ে যা ঘটেছে, তা শুধু দেশের ভেতর নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

ইসলামে মৃতদেহের মর্যাদা রক্ষা ফরজ দায়িত্ব। রাসূল (স.) বলেছেন “মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙা জীবিতের হাড় ভাঙার সমান।” ফলে কবর উল্টানো কিংবা দেহ পোড়ানো ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনও ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় নির্দেশনা এত স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কিছু মানুষ কেন উগ্রতার বশবর্তী হলো, সেটিই আজ বড় প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সামাজিক মেরুকরণ এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। বহুদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, মানুষ আইন হাতে তুলে নিচ্ছে, অথচ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিরোধের যথেষ্ট উদ্যোগ নেই। এর ফলে “মব জাস্টিস” ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

“মৃত নুর পাগলা বনাম জীবিত আমরা” এই প্রতীকী তুলনা আজ বাংলাদেশের সামনে মৌলিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। আমরা কি মানবিকতা, আইন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের পথ বেছে নেব, নাকি অন্ধ উগ্রতার পথ অনুসরণ করব? রাষ্ট্র যদি মৃতের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে জীবিত মানুষের অধিকারই বা কিভাবে সুরক্ষিত হবে? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে; আমরা, নাগরিক ও রাষ্ট্র, এই প্রশ্নের কী উত্তর দিই তার ওপর।

লেখক: শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক,গবেষক ও চিন্তক।

ট্যাগ :

কলাতলীতে অবৈধ স্থাপনা সরাতে ২৪ ঘন্টার সময় বেঁধে দিলো প্রশাসন

মন্তব্য কলাম

মৃত নুর পাগলা বনাম জীবিত আমরা: কোন পথে হাঁটছে বাংলাদেশ!

আপডেট সময় : ১২:০১:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫

রাজবাড়ির গোয়ালন্দের সাম্প্রতিক ঘটনাটি, মৃত নুর পাগলাকে কবর থেকে তুলে এনে জনতার সামনে পোড়ানো, বাংলাদেশের সমাজ, আইন ও মানবাধিকারের জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। এটি কেবল মানবিকতার সীমারেখাই নয়, রাষ্ট্রের আইন ও বিচার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও উন্মোচন করেছে। মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, আমরা কি সভ্যতার পথে হাঁটছি, নাকি অন্ধ উগ্রতার অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি?

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ধারা ২৯৭ স্পষ্টভাবে মৃতদেহের অবমাননাকে অপরাধ ঘোষণা করেছে। হাইকোর্টের একাধিক রায়েও বলা হয়েছে, মৃতদেহের মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার এই নৃশংস ঘটনাটি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাই আইনের অস্তিত্ব থাকলেও এর প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতে মৃত দেহকে “quasi-person” হিসেবে বিবেচনা করা হয়, অর্থাৎ মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থাতেও মর্যাদা রক্ষা করা আবশ্যক। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বহু সংস্থা বারবার বলেছে, মৃতদেহের অবমাননা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নুর পাগলার দেহ নিয়ে যা ঘটেছে, তা শুধু দেশের ভেতর নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

ইসলামে মৃতদেহের মর্যাদা রক্ষা ফরজ দায়িত্ব। রাসূল (স.) বলেছেন “মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙা জীবিতের হাড় ভাঙার সমান।” ফলে কবর উল্টানো কিংবা দেহ পোড়ানো ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনও ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় নির্দেশনা এত স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কিছু মানুষ কেন উগ্রতার বশবর্তী হলো, সেটিই আজ বড় প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সামাজিক মেরুকরণ এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। বহুদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, মানুষ আইন হাতে তুলে নিচ্ছে, অথচ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিরোধের যথেষ্ট উদ্যোগ নেই। এর ফলে “মব জাস্টিস” ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

“মৃত নুর পাগলা বনাম জীবিত আমরা” এই প্রতীকী তুলনা আজ বাংলাদেশের সামনে মৌলিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। আমরা কি মানবিকতা, আইন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের পথ বেছে নেব, নাকি অন্ধ উগ্রতার পথ অনুসরণ করব? রাষ্ট্র যদি মৃতের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে জীবিত মানুষের অধিকারই বা কিভাবে সুরক্ষিত হবে? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে; আমরা, নাগরিক ও রাষ্ট্র, এই প্রশ্নের কী উত্তর দিই তার ওপর।

লেখক: শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক,গবেষক ও চিন্তক।