বিশ্বজুড়ে মানুষের খাদ্য তালিকায় প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস এখন পোলট্রি বা ফার্মের মুরগির মাংস। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই মাংসের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। তবে এই প্রতিযোগিতায় বিশ্ববাজারে এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যমতে, বিশ্বে মুরগির মাংস উৎপাদনে শীর্ষ ৫০টি দেশের মধ্যেও নেই বাংলাদেশ। প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, এমনকি শ্রীলঙ্কাও এক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।
কোন অবস্থানে বাংলাদেশ
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বৈশ্বিক উৎপাদন ডাটাবেজের (FAOSTAT) সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ফার্মের মুরগির (তাজা ও প্রক্রিয়াজাত) মোট উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৫০৭ দশমিক ৬৭ মেট্রিক টন। এই উৎপাদন নিয়ে বিশ্বের ১৮৭টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশ ৫৩তম অবস্থানে জায়গা করে নিয়েছে।
দেশের অভ্যন্তরে পোলট্রি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও বৈশ্বিক বাজারে উৎপাদন ও প্রতিযোগিতার দৌড়ে বাংলাদেশ এখনো বেশ পেছনে রয়েছে। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, পোলট্রি খাদ্যের উচ্চমূল্য এবং খামারিদের সঠিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি এই খাতে আশানুরূপ অগ্রগতি অর্জনে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ কত নম্বরে
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ফার্মের মুরগি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শীর্ষ তিন দেশের মধ্যে জায়গা করতে পারেনি। এফএও-এর ডেটা অনুযায়ী, এই অঞ্চলে উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় সবার ওপরে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। অবাক করার মতো বিষয় হলো, জনসংখ্যার দিক থেকে ছোট দেশ হলেও মুরগি উৎপাদনে শ্রীলঙ্কাও বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে এবং তারা তৃতীয় স্থান দখল করেছে।
বাংলাদেশের ঠিক পরে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে নেপাল। আর যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান ও ছোট দেশ ভুটান তালিকার অনেক পেছনে পড়ে আছে।
উৎপাদনে বিশ্বসেরা যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্বজুড়ে ফার্মের মুরগি উৎপাদনের ক্ষেত্রে একক আধিপত্য বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে রেকর্ড ২ কোটি ১৭ লাখ ৬৬ হাজার ৩৭ মেট্রিক টন মুরগির মাংস উৎপাদিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশাল সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাদের শতভাগ আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় খামার ব্যবস্থাপনা। উন্নত জাতের মুরগি প্রতিপালন, কঠোর জৈব-নিরাপত্তা (বায়োসিকিউরিটি) এবং সরকারি প্রণোদনার কারণে তারা বিশ্বের এক নম্বর পোলট্রি উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে চীন ও ব্রাজিল
উৎপাদনের বিশ্বতালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এশিয়ার পরাশক্তি চীন। ২০২৪ সালে চীনের মোট উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৬০ লাখ ৬৬ হাজার ৭৮৯ দশমিক ৫৮ মেট্রিক টন। চীনের বিশাল জনসংখ্যার মাংসের চাহিদা মেটাতে দেশটির সরকার পোলট্রি শিল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগ করে আসছে।
অন্যদিকে, তৃতীয় স্থান দখল করে রেখেছে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল। ২০২৪ সালে ব্রাজিলে মুরগির মাংস উৎপাদিত হয়েছে ১ কোটি ৩৭ লাখ ১৪ হাজার ৭০১ দশমিক ৬৯ মেট্রিক টন। ব্রাজিল শুধু উৎপাদনেই সেরা নয়, তারা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মুরগির মাংস রপ্তানিকারক দেশও বটে। মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বহু দেশে ব্রাজিলের হিমায়িত মুরগির মাংস নিয়মিত রপ্তানি হয়।
রাশিয়া ও ভারতের অবস্থান
এফএও-এর তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া। ২০২৪ সালে দেশটির খামারগুলো থেকে মোট ৫৪ লাখ ৫৭ হাজার ৩২৯ দশমিক ৮০ মেট্রিক টন মুরগির মাংস উৎপাদিত হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়া তাদের অভ্যন্তরীণ পোলট্রি শিল্পকে বেশ শক্তিশালী করে তুলেছে।
অন্যদিকে, ৫০ লাখ ১৯ হাজার ৪১০ মেট্রিক টন উৎপাদন নিয়ে বিশ্বে পঞ্চম স্থানে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। তাদের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং পোলট্রি ফিড বা খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা তাদের এই অবস্থানে আসতে সাহায্য করেছে।
শীর্ষ ১০ দেশের বাকিরা
তালিকায় ষষ্ঠ থেকে দশম স্থানের মধ্যেও বেশ কিছু দেশের চমকপ্রদ উৎপাদন লক্ষ্য করা গেছে। ৪১ লাখ ৭৯ হাজার ৪৪৪ দশমিক ২০ মেট্রিক টন উৎপাদন নিয়ে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়া।
এর ঠিক পরেই ৪০ লাখ ১৩ হাজার ২১৫ দশমিক ৮২ মেট্রিক টন উৎপাদন নিয়ে সপ্তম স্থানে রয়েছে মেক্সিকো। অষ্টম স্থানে জায়গা করে নিয়েছে আফ্রিকার দেশ মিশর, যাদের উৎপাদন ২৫ লাখ ৯৮ হাজার ৬০৩ দশমিক ৫২ মেট্রিক টন।
নবম স্থানে রয়েছে তুরস্ক, তাদের উৎপাদন ২৫ লাখ ১২ হাজার ১৩০ দশমিক ৮৬ মেট্রিক টন। আর ২৪ লাখ ৬৬ হাজার ৯৬৬ দশমিক ৫৯ মেট্রিক টন উৎপাদন নিয়ে শীর্ষ ১০ দেশের তালিকা শেষ করেছে এশিয়ার উন্নত দেশ জাপান।
বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
এফএও-এর এই ডাটাবেজ থেকে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পে এখনো বিশাল উন্নতির সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে ৫৩তম অবস্থানে থাকলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। দেশে পোলট্রি খাতের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
তবে খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে মুরগির মাংসের উৎপাদন আরও বাড়াতে হলে পোলট্রি ফিডের দাম কমাতে হবে। কারণ মুরগি উৎপাদনের মোট খরচের প্রায় ৭০ শতাংশই চলে যায় খাদ্যের পেছনে। এছাড়া খামারিদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা এবং বার্ড ফ্লুসহ বিভিন্ন রোগবালাই প্রতিরোধে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বিশ্বতালিকায় আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে।
সূত্র: এফএও
টিটিএন ডেস্ক 





















