মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে কক্সবাজার ও টেকনাফ উপকূল থেকে বঙ্গোপসাগরে ভেসে আসা পাঁচটি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে রয়েছে একটি কঙ্কাল, তিনটি অর্ধগলিত মরদেহ এবং কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে উদ্ধার হওয়া মাথা ও দুই পা বিচ্ছিন্ন একটি মরদেহ। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় উপকূলজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, প্রতিটি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল নয়টার দিকে টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপসংলগ্ন কচুবুনিয়া–কাটাবুনিয়া এলাকায় জোয়ারের পানিতে একটি মানুষের কঙ্কাল ভেসে আসে। স্থানীয় বাসিন্দারা সেটি দেখতে পেয়ে শাহপরীর দ্বীপ পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কঙ্কালটি উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে।
শাহপরীর দ্বীপ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) সঞ্জীব বলেন, কঙ্কালটি কয়েক দিন আগের বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় সাগরে থাকায় মরদেহটি সম্পূর্ণ পচে কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত এবং মৃত্যুর কারণ জানতে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।
এর আগের দিন বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) টেকনাফের তিনটি পৃথক স্থান থেকে তিনটি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, দুপুরে সেন্ট মার্টিন সমুদ্রসৈকতে একটি মরদেহ, বিকেলে সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ সমুদ্রসৈকতে আরেকটি এবং সন্ধ্যায় সদর ইউনিয়নের রাজারছড়া সমুদ্রসৈকতে আরও একটি অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে একটি নারীর। সবগুলো মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
একই দিন রাত সাড়ে নয়টার দিকে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে জোয়ারের পানিতে ভেসে আসে আরেকটি খণ্ডিত মরদেহ। সৈকতে দায়িত্ব পালনরত বিচকর্মী খোরশেদ আলম জোয়ারের কাছাকাছি দর্শনার্থীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলার সময় পানিতে ভাসমান মরদেহটি দেখতে পান। তিনি দ্রুত পুলিশকে খবর দিলে কক্সবাজার সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সরোয়ারের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহটি উদ্ধার করে।
পুলিশ জানায়, উদ্ধার হওয়া মরদেহটির মাথা ও কোমরের নিচের দুই পা বিচ্ছিন্ন ছিল। দীর্ঘ সময় সাগরের লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে শরীরের অধিকাংশ অংশ পচে বিকৃত হয়ে যায়। এ অবস্থায় প্রাথমিকভাবে এটি নারী না পুরুষ—তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, মরদেহটির পরিচয় শনাক্ত এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াগামী কোনো ট্রলারডুবি, মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের বহনকারী নৌযানের দুর্ঘটনা অথবা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসার সময় কোনো নৌকাডুবির ঘটনায় এসব মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো ঘটনার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিটি ঘটনাকেই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীপথে মানবপাচারের ঝুঁকি, অনিরাপদ নৌযাত্রা এবং বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণে মাঝেমধ্যে অজ্ঞাতনামা মরদেহ উপকূলে ভেসে আসার ঘটনা ঘটলেও মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুলিশ বলছে, উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর আঙুলের ছাপ, ডিএনএ নমুনা এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন সংগ্রহ করে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন থানায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য এবং সীমান্ত ও সমুদ্রপথে সাম্প্রতিক কোনো দুর্ঘটনার তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে।
উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত কয়েক দিনে সাগরের স্রোত ও জোয়ারের প্রকৃতিতে পরিবর্তন দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে একের পর এক মরদেহ ভেসে আসার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের মাধ্যমে এসব মৃত্যুর রহস্য উন্মোচিত হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















