ঢাকা ০৩:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শিক্ষকদের আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না : প্রধানমন্ত্রী ধানমন্ডি ৩২ থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সন্দেহে আটক ১ অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে কেউ বঞ্চিত হবে না: প্রধানমন্ত্রী স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের বাইরে খোলাবাজারে নিত্যপণ্য বিক্রির পরিকল্পনা করছে টিসিবি দেশের চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত বহাল নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৮১তম জন্মবার্ষিকী আজ, বিএনপির নানা কর্মসূচি আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গুলিবিদ্ধ স্থানীয় যুবককে চট্টগ্রামে প্রেরণ পেকুয়ায় মৎস্য প্রজেক্ট দখলে নিতে গুলিবর্ষণ, আহত ২ কুতুবদিয়ায় আন্তঃস্কুল বিতর্কে শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক শারিকা নুর তাহেরা তুবা কক্সবাজারের আবাসিক হোটেল পুলিশ সদস্যদের মরদেহ উদ্ধার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আরএসও সদস্যের গুলিতে বাংলাদেশি যুবক আহত খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকীতে সারাদেশে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল করবে বিএনপি মাদ্রাসার তালাবদ্ধ কক্ষে কৃষকের বীজ! লোহাগাড়ায় ইউএনওর অভিযানে উদ্ধার ১৩ বস্তা
মন্তব্য কলাম

জুলাই সনদ: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন দিগন্ত?

জুলাই সনদ; শব্দটা এখন রাজনীতির আড্ডায়, টকশোতে, এমনকি চায়ের দোকানেও উচ্চারিত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এটি নাকি একটি ‘নতুন সূচনা’। আবার কেউ বলছে, ‘নতুন বোতলে পুরানো সুরা’। কয়েকটি রাজনৈতিক দল একসঙ্গে বসে এক টুকরো সাদা কাগজে স্বাক্ষর করেছে, যেখানে বলা হয়েছে; তারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একমত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সনদটি আদৌ কী, এবং এর আইনি বা ঐতিহাসিক অবস্থান কোথায়?

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে থাকে। সংবিধানের বাইরে কোনো ‘ইন্টারিম সরকার’ গঠনের পথ সেখানে নেই। অতএব, রাজনৈতিক দলগুলো যদি এমন কোনো ‘সনদ’ তৈরি করে, সেটি কেবল একটি রাজনৈতিক অভিপ্রায় বা মতৈক্যের প্রতীক হতে পারে, কিন্তু সাংবিধানিক দলিল নয়। ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক অভিপ্রায় আর সাংবিধানিক বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান অনেক গভীর।

বিশ্ব ইতিহাসে ‘সনদ’ শব্দটি প্রথম গুরুত্ব পায় ১২১৫ সালের Magna Carta-তে, যখন ইংল্যান্ডের রাজা জন বাধ্য হন জনগণের কিছু মৌলিক অধিকার স্বীকার করতে। সেটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাংবিধানিক ভিত্তি পেয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা গেছে, অধিকাংশ রাজনৈতিক ‘ঘোষণাপত্র’ বা ‘চুক্তি’ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে, যেমন ১৯৭০-এর দশকে আফ্রিকার একাধিক মুক্তি আন্দোলনের ঘোষণা গুলো, বা মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু শান্তি-সনদ, যে গুলোর অনেকই শেষ পর্যন্ত কাগজেই থেকে গেছে।

বাংলাদেশেও আমরা দেখেছি ‘মুক্তি চুক্তি’, ‘জাতীয় ঐক্য’, ‘মৈত্রী সনদ’ ইত্যাদি নানা রাজনৈতিক দলিলের জন্ম। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই এসব দলিল বাস্তব ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তন করতে পেরেছে। কারণ শেষ পর্যন্ত জনগণের ভোটই গণতন্ত্রের একমাত্র বৈধ উৎস। কাগজে লেখা; ইচ্ছা, নীতি বা আদর্শ যতই মহৎ হোক, সংবিধান ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে ক্ষমতার কাঠামো সৃষ্টি করতে পারে না।

তবু, এই জুলাই সনদকে অবহেলা করারও সুযোগ নেই। এটি অন্তত ইঙ্গিত দেয়, রাজনীতির ভেতরে এখনো সংলাপের সম্ভাবনা বেঁচে আছে। একটি রাজনৈতিক দল অন্য দলকে স্বীকৃতি দিচ্ছে যে, ভিন্ন অবস্থান থেকেও ‘একটি সাধারণ লক্ষ্য’ থাকতে পারে, এই মানসিকতাই রাজনীতির অক্সিজেন।

তবে সেই অক্সিজেনকে প্রজ্বলিত শিখায় পরিণত করতে হলে চাই জনগণের অংশগ্রহণ, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, এবং সর্বোপরি আইনি বৈধতা। নইলে এই সনদও হয়তো ইতিহাসের আরেকটি ‘অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়া কাগজ’ হিসেবেই থেকে যাবে।

রাজনীতি কখনো সাদা কাগজের খেলা নয়। সেখানে প্রতিটি স্বাক্ষরের পেছনে জনগণের বিশ্বাস ও সময়ের বিচার লুকিয়ে থাকে। জুলাই সনদও সেই বিচারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, এটি কি নতুন দিগন্ত খুলবে, না কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক, লেখক ও চিন্তক

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষকদের আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না : প্রধানমন্ত্রী

মন্তব্য কলাম

জুলাই সনদ: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন দিগন্ত?

আপডেট সময় : ০১:১৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৫

জুলাই সনদ; শব্দটা এখন রাজনীতির আড্ডায়, টকশোতে, এমনকি চায়ের দোকানেও উচ্চারিত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এটি নাকি একটি ‘নতুন সূচনা’। আবার কেউ বলছে, ‘নতুন বোতলে পুরানো সুরা’। কয়েকটি রাজনৈতিক দল একসঙ্গে বসে এক টুকরো সাদা কাগজে স্বাক্ষর করেছে, যেখানে বলা হয়েছে; তারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একমত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সনদটি আদৌ কী, এবং এর আইনি বা ঐতিহাসিক অবস্থান কোথায়?

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে থাকে। সংবিধানের বাইরে কোনো ‘ইন্টারিম সরকার’ গঠনের পথ সেখানে নেই। অতএব, রাজনৈতিক দলগুলো যদি এমন কোনো ‘সনদ’ তৈরি করে, সেটি কেবল একটি রাজনৈতিক অভিপ্রায় বা মতৈক্যের প্রতীক হতে পারে, কিন্তু সাংবিধানিক দলিল নয়। ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক অভিপ্রায় আর সাংবিধানিক বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান অনেক গভীর।

বিশ্ব ইতিহাসে ‘সনদ’ শব্দটি প্রথম গুরুত্ব পায় ১২১৫ সালের Magna Carta-তে, যখন ইংল্যান্ডের রাজা জন বাধ্য হন জনগণের কিছু মৌলিক অধিকার স্বীকার করতে। সেটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাংবিধানিক ভিত্তি পেয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা গেছে, অধিকাংশ রাজনৈতিক ‘ঘোষণাপত্র’ বা ‘চুক্তি’ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে, যেমন ১৯৭০-এর দশকে আফ্রিকার একাধিক মুক্তি আন্দোলনের ঘোষণা গুলো, বা মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু শান্তি-সনদ, যে গুলোর অনেকই শেষ পর্যন্ত কাগজেই থেকে গেছে।

বাংলাদেশেও আমরা দেখেছি ‘মুক্তি চুক্তি’, ‘জাতীয় ঐক্য’, ‘মৈত্রী সনদ’ ইত্যাদি নানা রাজনৈতিক দলিলের জন্ম। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই এসব দলিল বাস্তব ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তন করতে পেরেছে। কারণ শেষ পর্যন্ত জনগণের ভোটই গণতন্ত্রের একমাত্র বৈধ উৎস। কাগজে লেখা; ইচ্ছা, নীতি বা আদর্শ যতই মহৎ হোক, সংবিধান ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে ক্ষমতার কাঠামো সৃষ্টি করতে পারে না।

তবু, এই জুলাই সনদকে অবহেলা করারও সুযোগ নেই। এটি অন্তত ইঙ্গিত দেয়, রাজনীতির ভেতরে এখনো সংলাপের সম্ভাবনা বেঁচে আছে। একটি রাজনৈতিক দল অন্য দলকে স্বীকৃতি দিচ্ছে যে, ভিন্ন অবস্থান থেকেও ‘একটি সাধারণ লক্ষ্য’ থাকতে পারে, এই মানসিকতাই রাজনীতির অক্সিজেন।

তবে সেই অক্সিজেনকে প্রজ্বলিত শিখায় পরিণত করতে হলে চাই জনগণের অংশগ্রহণ, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, এবং সর্বোপরি আইনি বৈধতা। নইলে এই সনদও হয়তো ইতিহাসের আরেকটি ‘অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়া কাগজ’ হিসেবেই থেকে যাবে।

রাজনীতি কখনো সাদা কাগজের খেলা নয়। সেখানে প্রতিটি স্বাক্ষরের পেছনে জনগণের বিশ্বাস ও সময়ের বিচার লুকিয়ে থাকে। জুলাই সনদও সেই বিচারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, এটি কি নতুন দিগন্ত খুলবে, না কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক, লেখক ও চিন্তক