ঢাকা ০৫:০৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সদর থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘নাগু’ গ্রেফতার ৪.১ মাত্রার মৃদু ভূমিকম্প: উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা লোহাগাড়ায় ঢাকাগামী পর্যটকবাহী বাস উল্টে আহত-১৫ পেকুয়ায় আবু তাহের হত্যাকান্ড: ৭২ঘন্টায়ও দায়ের হয়নি মামলা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় ছাত্রদলের আট কমিটি বিলুপ্ত ২৪ দিন পর অপহৃতকে উদ্ধার করলো র‍্যাব টেকনাফে এক চিকিৎসককে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়েছে সন্ত্রাসীরা চলতি বছরেই দেশে ফিরবো: এনডিটিভিকে শেখ হাসিনা কক্সবাজারে শুরু হয়েছে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন উখিয়ায় ১ লাখ ইয়াবাসহ আটক ১, পলাতক ৪ বাংলাদেশ নাম শুনেই থামলেন মার্টিনেজ, বললেন ‘বাংলাদেশের ভক্তদের ভালোবাসি’ চূড়ান্ত হলো নকআউটের ৩২ দল, বিশ্বকাপ থেকে যাদের বিদায় চকরিয়ায় মাইক্রোবাস-মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ, নিহত ২ ‘এই দেশটিকে আমি ভালোবাসি’, বাংলাদেশ নিয়ে যা বললেন মার্টিনেজ ইনানী সৈকতে গোসলে নেমে নিখোঁজ পর্যটক সায়েমের মরদেহ উদ্ধার

জাতিসংঘ কেন অপ্রয়োজনীয়?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার মহান প্রত্যাশা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতিসংঘ। লক্ষ্য ছিল সহজ, যুদ্ধ বন্ধ করা, দুর্বল রাষ্ট্রকে সুরক্ষা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের একটি কাঠামো গড়ে তোলা। কিন্তু সাত দশকের বেশি সময় পার হওয়ার পর বাস্তবতা অনেকের কাছে ভিন্ন ছবি তুলে ধরেছে। সমালোচকদের মতে, আজ জাতিসংঘ এমন এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে যার নৈতিক উচ্চারণ আছে, কিন্তু কার্যকর শক্তি নেই; আছে বৈঠক, বিবৃতি ও প্রস্তাব; কিন্তু নেই বাস্তব পরিবর্তনের ক্ষমতা।

জাতিসংঘের অকার্যকারিতার সবচেয়ে বড় কারণ তার কাঠামোগত বৈষম্য। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য; যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স ভেটো ক্ষমতার মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে বিশ্বে ন্যায় বিচারের প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনেক সময় মানবতার ভিত্তিতে নয়, বরং শক্তিধর রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। এই বাস্তবতা জাতিসংঘকে কার্যত একটি শক্তিধর রাষ্ট্রের ক্লাবে পরিণত করেছে।

বিশ্বের বড় বড় সংঘাত এই ব্যর্থতার নির্মম সাক্ষ্য। দীর্ঘদিন ধরে চলা সিরিয়ান সিভিল ওয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। ইউরোপে চলমান রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত, বিশেষত ইসরাইল হামাজ যুদ্ধ, বর্তমানে চলমান আমেরিকা-ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ, আবারও দেখিয়েছে যে মানবিক বিপর্যয়ের মাঝেও জাতিসংঘ কার্যকর ভাবে যুদ্ধ থামাতে পারেনি বা পারছেনা। আলোচনা হয়েছে, প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, কিন্তু রক্তপাত থামেনি।

জাতিসংঘের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর বাস্তব ক্ষমতার অভাব। প্রতিষ্ঠানটির কোনো স্বাধীন সামরিক শক্তি নেই, নেই এমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা যার মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রকে বাধ্য করা যায় আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত মানতে। ফলে অনেক সময় জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতির কঠোর বাস্তবতার সামনে কাগুজে ঘোষণায় পরিণত হয়।

একই সঙ্গে জাতিসংঘের বিশাল প্রশাসনিক কাঠামোও সমালোচনার মুখে পড়েছে। অসংখ্য সংস্থা, জটিল প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘ আলোচনার সংস্কৃতি অনেক সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কঠিন করে তোলে। সমালোচকদের মতে, বাস্তব সমস্যার সমাধানের চেয়ে অনেক সময় এই প্রতিষ্ঠান কূটনৈতিক ভাষণ ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

ফলে প্রশ্নটি ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে, বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় জাতিসংঘ কি সত্যিই প্রয়োজনীয়, নাকি এটি কেবল একটি প্রতীকী মঞ্চ যেখানে বিশ্বনেতারা নৈতিক বক্তব্য দেন, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তনের ক্ষমতা খুবই সীমিত?

বিশ্ব যখন ক্রমবর্ধমান সংঘাত ও অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে, তখন একটি কার্যকর বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু যদি সেই প্রতিষ্ঠান নিজেই কাঠামোগত বৈষম্য, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং শক্তির রাজনীতির কাছে বন্দী হয়ে পড়ে, তাহলে তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অনেক সমালোচকের কাছে তাই আজ জাতিসংঘ এক মহান আদর্শের প্রতীক হলেও বাস্তব ক্ষমতার দিক থেকে ক্রমেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

জাতিসংঘ কেন অপ্রয়োজনীয়?

আপডেট সময় : ১২:২৬:০৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার মহান প্রত্যাশা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতিসংঘ। লক্ষ্য ছিল সহজ, যুদ্ধ বন্ধ করা, দুর্বল রাষ্ট্রকে সুরক্ষা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের একটি কাঠামো গড়ে তোলা। কিন্তু সাত দশকের বেশি সময় পার হওয়ার পর বাস্তবতা অনেকের কাছে ভিন্ন ছবি তুলে ধরেছে। সমালোচকদের মতে, আজ জাতিসংঘ এমন এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে যার নৈতিক উচ্চারণ আছে, কিন্তু কার্যকর শক্তি নেই; আছে বৈঠক, বিবৃতি ও প্রস্তাব; কিন্তু নেই বাস্তব পরিবর্তনের ক্ষমতা।

জাতিসংঘের অকার্যকারিতার সবচেয়ে বড় কারণ তার কাঠামোগত বৈষম্য। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য; যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স ভেটো ক্ষমতার মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে বিশ্বে ন্যায় বিচারের প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনেক সময় মানবতার ভিত্তিতে নয়, বরং শক্তিধর রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। এই বাস্তবতা জাতিসংঘকে কার্যত একটি শক্তিধর রাষ্ট্রের ক্লাবে পরিণত করেছে।

বিশ্বের বড় বড় সংঘাত এই ব্যর্থতার নির্মম সাক্ষ্য। দীর্ঘদিন ধরে চলা সিরিয়ান সিভিল ওয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। ইউরোপে চলমান রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত, বিশেষত ইসরাইল হামাজ যুদ্ধ, বর্তমানে চলমান আমেরিকা-ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ, আবারও দেখিয়েছে যে মানবিক বিপর্যয়ের মাঝেও জাতিসংঘ কার্যকর ভাবে যুদ্ধ থামাতে পারেনি বা পারছেনা। আলোচনা হয়েছে, প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, কিন্তু রক্তপাত থামেনি।

জাতিসংঘের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর বাস্তব ক্ষমতার অভাব। প্রতিষ্ঠানটির কোনো স্বাধীন সামরিক শক্তি নেই, নেই এমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা যার মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রকে বাধ্য করা যায় আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত মানতে। ফলে অনেক সময় জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতির কঠোর বাস্তবতার সামনে কাগুজে ঘোষণায় পরিণত হয়।

একই সঙ্গে জাতিসংঘের বিশাল প্রশাসনিক কাঠামোও সমালোচনার মুখে পড়েছে। অসংখ্য সংস্থা, জটিল প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘ আলোচনার সংস্কৃতি অনেক সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কঠিন করে তোলে। সমালোচকদের মতে, বাস্তব সমস্যার সমাধানের চেয়ে অনেক সময় এই প্রতিষ্ঠান কূটনৈতিক ভাষণ ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

ফলে প্রশ্নটি ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে, বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় জাতিসংঘ কি সত্যিই প্রয়োজনীয়, নাকি এটি কেবল একটি প্রতীকী মঞ্চ যেখানে বিশ্বনেতারা নৈতিক বক্তব্য দেন, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তনের ক্ষমতা খুবই সীমিত?

বিশ্ব যখন ক্রমবর্ধমান সংঘাত ও অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে, তখন একটি কার্যকর বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু যদি সেই প্রতিষ্ঠান নিজেই কাঠামোগত বৈষম্য, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং শক্তির রাজনীতির কাছে বন্দী হয়ে পড়ে, তাহলে তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অনেক সমালোচকের কাছে তাই আজ জাতিসংঘ এক মহান আদর্শের প্রতীক হলেও বাস্তব ক্ষমতার দিক থেকে ক্রমেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে।