ঢাকা ১২:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
কক্সবাজারে ব্লু ইকনোমি ও মেরিন সাইন্স বিষয়ে স্পেশালাইজড বিশ্ববিদ্যালয় ১৫-২০ বছর আগে হওয়া উচিত ছিলো- প্রধানমন্ত্রী ব্রাজিলকে ‘আমরা ভয় পাই না’: হাকিমি প্রাণের দাবি পুরণ হলো কক্সবাজারবাসীর: মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নত করা ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সম্মাননা পাচ্ছেন প্রয়াত কারিনা কায়সার বিয়ের প্রলোভনে তরুণীকে ধর্ষণের মূলহোতা নূরুল ইসলাম নাহিদ আটক পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান – বিএনপি দেশের মানুষের স্বার্থে কাজ করে শহীদ ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত করলেন প্রধানমন্ত্রী, পরিবারের হাতে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র প্রদান স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক ঘুরে দেখলেন প্রধানমন্ত্রী মালুমঘাটে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কক্সবাজারের জন্য আমার নেতার বৃহত্তর মাস্টার প্ল্যান আছে – স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই গাড়ি চালিয়ে পিএমখালীতে যান প্রধানমন্ত্রী, পাশে বসান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘করবো কাজ, গড়ব দেশ’—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কোদাল দিয়ে মাটি কেটে পাতলী খাল পুনঃখননের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়ে প্রথমবার কক্সবাজারে পৌঁছেছেন তারেক রহমান, দিনব্যাপী অংশ নেবেন ১১ কর্মসূচিতে  কক্সবাজারের পথে সপরিবারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আইনের আলোয় অন্ধকার বাস্তবতা: আয়োডিন ঘাটতির নীরব বিপদ

বাংলাদেশের উপকূলের সাদা মাঠে সূর্যের তাপে জমে ওঠা লবণ শুধু জীবিকার প্রতীক নয়, জনস্বাস্থ্যেরও এক অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু এই লবণই আজ জনস্বাস্থ্যের এক নীরব সংকটের মুখোমুখি করছে দেশকে। ২০২১ সালে প্রণীত “আয়োডিনযুক্ত লবণ আইন” ছিল সেই সংকট মোকাবিলার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবুও বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, আইনের অগ্রগতি সত্ত্বেও আয়োডিনের অভাব এখনো বিস্তৃত রয়ে গেছে।

বাংলাদেশে লবণ প্রধানত দুই প্রকার; ভোজ্য লবণ ও শিল্প লবণ। ভোজ্য লবণে পর্যাপ্ত আয়োডিন থাকে, যা মানবদেহের জন্য অপরিহার্য। অপরদিকে শিল্প লবণ সাধারণত আয়োডিনবিহীন এবং ব্যবহৃত হয় চামড়া, টেক্সটাইল, ডিটারজেন্ট ও রাসায়নিক শিল্পে। কিন্তু নতুন আইনে বলা হয়েছে, শিল্পে ব্যবহৃত লবণেও আয়োডিন থাকতে হবে। অর্থাৎ দেশে আয়োডিনবিহীন লবণ উৎপাদন বা আমদানি এখন আইনত নিরুৎসাহিত।

তবুও মাঠপর্যায়ে চিত্রটি আশানুরূপ নয়। মিক্স৬ (২০১৯) জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২৩.৪ শতাংশ পরিবার এখনো আয়োডিনবিহীন লবণ ব্যবহার করছে, এবং ১৭.৬ শতাংশ পরিবার ব্যবহার করছে মাত্র ০–১৫ পিপিএম আয়োডিনযুক্ত লবণ। অথচ আইন বলছে, খুচরা পর্যায়ে লবণের আয়োডিনমাত্রা থাকতে হবে ২০–৩০ পিপিএম। অর্থাৎ, মোট ৪১ শতাংশ পরিবার এখনো শুন্য আয়োডিন পাচ্ছে অথবা মানসম্মত আয়োডিন পাচ্ছে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (SVRS ২০২৩) অনুসারে, গড়ে প্রতি পরিবারে পাঁচজন সদস্য থাকায় মোট পরিবারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৮৪ হাজার। এর ৪১ শতাংশ পরিবার, অর্থাৎ ১ কোটি ৪১ লাখ ৭৯ হাজার পরিবারেরও বেশি, প্রায় ৭ কোটি মানুষ পর্যাপ্ত আয়োডিন পাচ্ছে না। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার ভাষা নয়, এটি জাতীয় জনস্বাস্থ্যের একটি গভীর সতর্কবার্তা।

২০২২ সালের এপ্রিলে কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নে পরিচালিত এক শুমারিতে ৯৭৭ জন প্রকৃত লবণ চাষি নিবন্ধিত হন। তাদের মধ্যে ২৯টি প্রশ্ন নিয়ে করা এক জরিপে দেখা যায়, ৯১.৭২ শতাংশ চাষি মাঠের খোলা লবণ ব্যবহার করেন, এবং মাত্র ৭.৮৮ শতাংশ চাষি প্যাকেট জাত আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করেন। খোলা লবণে প্রাকৃতিকভাবে আয়োডিন থাকে না। ফলে এই কৃষক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। ২০১৯ সালের পর প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এই চিত্রে তেমন পরিবর্তন আসেনি।

আয়োডিনের অভাব শুধু একটি পুষ্টি ঘাটতি নয়, এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এর ফলে হতে পারে গলগণ্ড, শিশুদের মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা, ক্রিটিনিজম ও মাতৃ-শিশু মৃত্যুহার বৃদ্ধি। অথচ এই সমস্যার সবচেয়ে সহজ, সাশ্রয়ী ও কার্যকর সমাধান হলো, লবণ আয়োডিনাইজেশন। এটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি সফল জনস্বাস্থ্য কৌশল।

আইন থাকার পরও কেন বাস্তবায়ন দুর্বল, তার উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ে সমন্বয়হীনতা এবং তদারকির ঘাটতি রয়েছে। আয়োডিন টেস্টিং ল্যাবের স্বল্পতা, মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণের অভাব, বাজার মনিটরিংয়ের দুর্বলতা এবং জনসচেতনতার ঘাটতি, সব মিলিয়ে নীতিগত সাফল্য কার্যকর বাস্তবতায় পরিণত হতে পারছে না। অথচ আইন যতই কঠোর হোক, যদি তার বাস্তবায়ন দুর্বল হয়, তবে তা জনগণের কাছে অর্থহীন থেকে যায়।

উপকূলের মাঠে লবণ তুলে নেওয়া সেই কৃষকই দেশের আয়োডিন নিরাপত্তার প্রথম প্রহরী। তার হাতে তোলা লবণের প্রতিটি দানা যেন আয়োডিনযুক্ত স্বাস্থ্য প্রতিশ্রুতির প্রতীক হয়, এই লক্ষ্যেই আইন প্রণয়ন হয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই আইনের সুফলকে মাঠে পৌঁছে দেওয়া।

কারণ, আয়োডিনবিহীন লবণের প্রতিটি কণাই একেকটি সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি, আর আয়োডিনযুক্ত লবণের প্রতিটি দানাই একটি সুস্থ, বুদ্ধিদীপ্ত ও কর্মক্ষম জাতির বিনিয়োগ।

লেখক-শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক,গবেষক ও চিন্তক

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

কক্সবাজারে ব্লু ইকনোমি ও মেরিন সাইন্স বিষয়ে স্পেশালাইজড বিশ্ববিদ্যালয় ১৫-২০ বছর আগে হওয়া উচিত ছিলো- প্রধানমন্ত্রী

আইনের আলোয় অন্ধকার বাস্তবতা: আয়োডিন ঘাটতির নীরব বিপদ

আপডেট সময় : ১১:৫৭:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের উপকূলের সাদা মাঠে সূর্যের তাপে জমে ওঠা লবণ শুধু জীবিকার প্রতীক নয়, জনস্বাস্থ্যেরও এক অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু এই লবণই আজ জনস্বাস্থ্যের এক নীরব সংকটের মুখোমুখি করছে দেশকে। ২০২১ সালে প্রণীত “আয়োডিনযুক্ত লবণ আইন” ছিল সেই সংকট মোকাবিলার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবুও বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, আইনের অগ্রগতি সত্ত্বেও আয়োডিনের অভাব এখনো বিস্তৃত রয়ে গেছে।

বাংলাদেশে লবণ প্রধানত দুই প্রকার; ভোজ্য লবণ ও শিল্প লবণ। ভোজ্য লবণে পর্যাপ্ত আয়োডিন থাকে, যা মানবদেহের জন্য অপরিহার্য। অপরদিকে শিল্প লবণ সাধারণত আয়োডিনবিহীন এবং ব্যবহৃত হয় চামড়া, টেক্সটাইল, ডিটারজেন্ট ও রাসায়নিক শিল্পে। কিন্তু নতুন আইনে বলা হয়েছে, শিল্পে ব্যবহৃত লবণেও আয়োডিন থাকতে হবে। অর্থাৎ দেশে আয়োডিনবিহীন লবণ উৎপাদন বা আমদানি এখন আইনত নিরুৎসাহিত।

তবুও মাঠপর্যায়ে চিত্রটি আশানুরূপ নয়। মিক্স৬ (২০১৯) জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২৩.৪ শতাংশ পরিবার এখনো আয়োডিনবিহীন লবণ ব্যবহার করছে, এবং ১৭.৬ শতাংশ পরিবার ব্যবহার করছে মাত্র ০–১৫ পিপিএম আয়োডিনযুক্ত লবণ। অথচ আইন বলছে, খুচরা পর্যায়ে লবণের আয়োডিনমাত্রা থাকতে হবে ২০–৩০ পিপিএম। অর্থাৎ, মোট ৪১ শতাংশ পরিবার এখনো শুন্য আয়োডিন পাচ্ছে অথবা মানসম্মত আয়োডিন পাচ্ছে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (SVRS ২০২৩) অনুসারে, গড়ে প্রতি পরিবারে পাঁচজন সদস্য থাকায় মোট পরিবারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৮৪ হাজার। এর ৪১ শতাংশ পরিবার, অর্থাৎ ১ কোটি ৪১ লাখ ৭৯ হাজার পরিবারেরও বেশি, প্রায় ৭ কোটি মানুষ পর্যাপ্ত আয়োডিন পাচ্ছে না। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার ভাষা নয়, এটি জাতীয় জনস্বাস্থ্যের একটি গভীর সতর্কবার্তা।

২০২২ সালের এপ্রিলে কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নে পরিচালিত এক শুমারিতে ৯৭৭ জন প্রকৃত লবণ চাষি নিবন্ধিত হন। তাদের মধ্যে ২৯টি প্রশ্ন নিয়ে করা এক জরিপে দেখা যায়, ৯১.৭২ শতাংশ চাষি মাঠের খোলা লবণ ব্যবহার করেন, এবং মাত্র ৭.৮৮ শতাংশ চাষি প্যাকেট জাত আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করেন। খোলা লবণে প্রাকৃতিকভাবে আয়োডিন থাকে না। ফলে এই কৃষক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। ২০১৯ সালের পর প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এই চিত্রে তেমন পরিবর্তন আসেনি।

আয়োডিনের অভাব শুধু একটি পুষ্টি ঘাটতি নয়, এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এর ফলে হতে পারে গলগণ্ড, শিশুদের মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা, ক্রিটিনিজম ও মাতৃ-শিশু মৃত্যুহার বৃদ্ধি। অথচ এই সমস্যার সবচেয়ে সহজ, সাশ্রয়ী ও কার্যকর সমাধান হলো, লবণ আয়োডিনাইজেশন। এটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি সফল জনস্বাস্থ্য কৌশল।

আইন থাকার পরও কেন বাস্তবায়ন দুর্বল, তার উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ে সমন্বয়হীনতা এবং তদারকির ঘাটতি রয়েছে। আয়োডিন টেস্টিং ল্যাবের স্বল্পতা, মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণের অভাব, বাজার মনিটরিংয়ের দুর্বলতা এবং জনসচেতনতার ঘাটতি, সব মিলিয়ে নীতিগত সাফল্য কার্যকর বাস্তবতায় পরিণত হতে পারছে না। অথচ আইন যতই কঠোর হোক, যদি তার বাস্তবায়ন দুর্বল হয়, তবে তা জনগণের কাছে অর্থহীন থেকে যায়।

উপকূলের মাঠে লবণ তুলে নেওয়া সেই কৃষকই দেশের আয়োডিন নিরাপত্তার প্রথম প্রহরী। তার হাতে তোলা লবণের প্রতিটি দানা যেন আয়োডিনযুক্ত স্বাস্থ্য প্রতিশ্রুতির প্রতীক হয়, এই লক্ষ্যেই আইন প্রণয়ন হয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই আইনের সুফলকে মাঠে পৌঁছে দেওয়া।

কারণ, আয়োডিনবিহীন লবণের প্রতিটি কণাই একেকটি সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি, আর আয়োডিনযুক্ত লবণের প্রতিটি দানাই একটি সুস্থ, বুদ্ধিদীপ্ত ও কর্মক্ষম জাতির বিনিয়োগ।

লেখক-শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক,গবেষক ও চিন্তক