চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর ইউনিয়নের আকবর পাড়ায় অবস্থিত আহমদিয়া হেফজখানা ও এতিমখানার শিক্ষক জাফর আলমের বিরুদ্ধে ছয় শিক্ষার্থীকে বলাৎকার ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় কয়েকজন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর অভিভাবক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা শামসুল ইসলাম ও শিক্ষক জাফর আলমের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেছেন।
অভিভাবকদের দাবি, এর আগেও জাফর আলমের বিরুদ্ধে একাধিকবার একই ধরনের অভিযোগ উঠলেও প্রতিষ্ঠাতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তিনি বারবার প্রতিষ্ঠানে ফিরে এসেছেন। সর্বশেষ অভিযোগের পর গত ১৬ অক্টোবর শুক্রবার বিকেলে জাফর আলম পালিয়ে গেছেন বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
এদিকে অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন লোহাগাড়া থানার কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা।
লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল্লাহ বলেন, ছেলেকে বলাৎকারের অভিযোগ নিয়ে কয়েকজন অভিভাবক থানায় এসেছিলেন। তাঁদের দাবি, মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতার কাছে বিচার দিয়েও তাঁরা বিচার পাননি। পরে হেফজখানার শিক্ষক জাফর আলমের শাস্তির দাবিতে তাঁরা থানার দ্বারস্থ হন। তাঁরা মাদ্রাসার শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে আমরা প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের দাবি, জাফর আলমের বিরুদ্ধে এর আগেও শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছিল। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের দিকে সামাজিক বিচারের মাধ্যমে তাঁকে প্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়িত করা হয়। কিন্তু এর দুই থেকে তিন বছর পর হেফজখানার প্রতিষ্ঠাতা শামসুল ইসলাম তাঁকে আবার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় জাফর আলমকে আবারও সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি স্থানীয়দের। কিন্তু ওই ঘটনার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তাঁকে পুনরায় প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনা হয় বলে অভিযোগকারীদের ভাষ্য।
অভিভাবকদের অভিযোগ, এরপরও বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু সেসব অভিযোগের যথাযথ প্রতিকার না করে প্রতিষ্ঠাতা শামসুল ইসলাম অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষ নিয়েছেন বলে দাবি তাঁদের। ফলে অনেক অভিভাবক অভিযোগ জানাতে ভয় পেতেন বলেও জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা।
আধুনগর ইউনিয়নের এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর অভিভাবক অভিযোগ করেন, ছেলের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা জানিয়ে তিনি হেফজখানার প্রতিষ্ঠাতা শামসুল ইসলামকে ফোন করেছিলেন। তখন তাঁকে এক সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়।
ওই অভিভাবক বলেন, ১০ দিন পর আবার ফোন করে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি উল্টো উত্তেজিত হয়ে বলেন, জাফর আলম এখানে থাকবে। কেউ যদি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বা তাকে বিতাড়িত করার চেষ্টা করে, তাকে লাঠি দিয়ে মারা হবে।
অভিভাবকের দাবি, প্রতিষ্ঠাতার এমন বক্তব্যে তাঁরা হতাশ ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁর অভিযোগ, সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে তাঁরা যে নিরাপত্তা ও সুশিক্ষার প্রত্যাশা করেছিলেন, তা ভেঙে গেছে।
চকরিয়া থেকে ছেলেকে আহমদিয়া হেফজখানা ও এতিমখানায় ভর্তি করানো আরেক অভিভাবক বলেন, অনেক আশা নিয়ে ছেলেকে কোরআনে হাফেজ বানানোর জন্য সেখানে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কারণে তাঁর ছেলের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, অনেক স্বপ্ন নিয়ে ছেলেকে কোরআনে হাফেজ বানানোর জন্য আহমদিয়া হেফজখানায় পাঠিয়েছিলাম। আমার অভিযোগ, ওই শিক্ষক কয়েক দিন পরপর আমার ছেলেকে নিজের কক্ষে নিয়ে যেতেন এবং শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিতেন। এসব সহ্য করতে না পেরে আমার ছেলে পালিয়ে চলে আসে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের দাবি, এ ধরনের ঘটনার কারণে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং তাদের স্বাভাবিক পড়াশোনাও ব্যাহত হয়েছে।
প্রতিবেদকের কাছে দেওয়া ভিডিও বক্তব্যে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের সঙ্গে যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষক জাফর আলম শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিতেন। এ ছাড়া রাতে তাঁর সঙ্গে থাকার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও করেছে কয়েকজন শিক্ষার্থী।
শিশুদের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে তাদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।
আকবর পাড়ার কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, জাফর আলমের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ ওঠার পরও তাঁকে প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনার ঘটনায় প্রতিষ্ঠাতা শামসুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে অভিযোগকারীদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করা হতো।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে শামসুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান বলে উল্লেখ করে সেখানে কোনো ঘটনা ঘটলেও জাফর আলমের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করতে পারবেন না এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আকবর পাড়ার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবকেরা সন্তানদের পাঠান কোরআন শিক্ষা, নৈতিকতা ও নিরাপদ পরিবেশের আশায়। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হতে হবে এবং কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি যেন তদন্তে বাধা দিতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
অভিভাবকদের দাবি, সর্বশেষ গত আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে ছয় শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সামনে আসে। এরপর কয়েকটি পরিবার থানায় অভিযোগ নিয়ে যায়। তাঁদের ভাষ্য, গত ১৬ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার বিকেলে জাফর আলম প্রতিষ্ঠান ছেড়ে পালিয়ে যান।
তবে তিনি সত্যিই পালিয়ে গেছেন কি না, বর্তমানে কোথায় রয়েছেন এবং পুলিশ তাঁকে শনাক্ত বা আটক করার কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কি না এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
একাধিক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সামনে আসায় আহমদিয়া হেফজখানা ও এতিমখানার শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা দেওয়া, সাক্ষীদের প্রভাবমুক্ত রাখা এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অন্য কোনো শিক্ষার্থী ঝুঁকিতে রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
লোহাগাড়া থানার ওসি মো. আব্দুল্লাহ জানিয়েছেন, অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আহমদিয়া হেফজখানা ও এতিমখানার শিক্ষক জাফর আলমের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
আহমদিয়া হেফজখানা ও এতিমখানার প্রতিষ্ঠাতা শামসুল ইসলাম বলেন, একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলাৎকারের বিষয়ে আমাকে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। তবে আমি এসব বিশ্বাস করি না এবং এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাইনি।
অভিযোগের পর শিক্ষক জাফর আলম কেন প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে গেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে শামসুল ইসলাম বলেন, তাঁর বাবার অসুস্থতার কথা জানিয়ে সহকারী শিক্ষককে অবগত করে তিনি বাড়িতে গেছেন বলে শুনেছি।
এর আগে জাফর আলমের বিরুদ্ধে বলাৎকারের অভিযোগ ওঠা এবং সামাজিক বিচারের মাধ্যমে তাঁকে প্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়িত করার বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়টি অস্বীকার করেন শামসুল ইসলাম। তাঁর দাবি, জাফর আলম প্রায় ৩০ বছর ধরে তাঁর হেফজখানায় কর্মরত আছেন এবং তার সব ধরনের ব্যক্তিগত কাজকর্ম তিনি করেন। শামসুল ইসলাম আরও বলেন, বলাৎকারের অভিযোগের বিষয়ে থানা থেকেও তাঁকে জানানো হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















