নিজেদেরই নেই স্থায়ী ঠিকানা, নিশ্চিত জীবিকা কিংবা সন্তানদের পড়াশোনার স্বাভাবিক সুযোগ। তবুও নেপালের ভয়াবহ ফ্ল্যাশ ফ্লাডে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন কাঠমান্ডুতে বসবাসরত রোহিঙ্গারা।
সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) কাঠমান্ডুতে থাকা পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা নিজেদের কমিউনিটির মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বন্যার্তদের জন্য খাদ্য, পোশাক ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে এগিয়ে যান।
তাদের দেওয়া সহায়তার মধ্যে রয়েছে ১০ বস্তা চাল, ৫০ কার্টন ওয়াই-ওয়াই নুডলস, ২৫ কার্টন বিস্কুট, ৬ বস্তা চিড়া, ৪ বস্তা ভুজা ও ২০ কার্টন পানি। পাশাপাশি নারী, পুরুষ ও শিশুদের পোশাক, জ্যাকেট, কম্বল, বালিশ, বিছানার সামগ্রী ও ত্রিপলও দেওয়া হয়েছে।
এসব সহায়তা গ্রহণ করেন নুয়াকোট জেলার বিদুর পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান গণেশ কুমার নেপাল। রোহিঙ্গাদের এই উদ্যোগের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি তাদের মানবিকতার প্রশংসা করেন।
রোহিঙ্গা কমিউনিটির পক্ষ থেকে মো. সেলিম, জাফর মিয়া, মো. সেলিম, মো. রফিক, মাওলানা আসমত উল্লাহ, শফিক আলম, আবু বক্কর, মোহাম্মদ বেলাল ও মো. আইয়ুব উদ্যোগটিতে যুক্ত ছিলেন।
মাওলানা আসমত উল্লাহ বলেন,“আমরা নিজেরাই গণহত্যা ও বাস্তুচ্যুতির কষ্ট নিয়ে এখানে আশ্রিত। নেপালের এই দুর্যোগ আমাদের ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। তাই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি।”
মো. সেলিম বলেন,“নেপালের মানুষ আমাদের সঙ্গে সবসময় বন্ধুসুলভ আচরণ করেছে। তাদের বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব মনে হয়েছে। আশা করি, আমাদের এই উদ্যোগ দুই সম্প্রদায়ের সম্পর্ক আরও সুন্দর করবে।”
মোহাম্মদ বেলাল বলেন,“রোহিঙ্গাদের নিয়ে অনেক ভুল ধারণা ও প্রচারণা আছে। আমরা মনে করি, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমেই আমাদের আসল পরিচয় তুলে ধরা সম্ভব। মানবিকতার কোনো জাতি বা সীমান্ত নেই।”
কাঠমান্ডুতে বসবাসরত এই রোহিঙ্গাদের জীবনও নানা সংকটে ঘেরা। মিয়ানমারে সহিংসতা ও গণহত্যার মুখে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও নেপালসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন তারা।
নেপালে থাকা রোহিঙ্গাদের অনেকেরই নেই স্থায়ী আবাসনের নিশ্চয়তা। নেই সন্তানদের পড়াশোনার সুযোগ। নিয়মিত চাকরির ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা বাধা। দিনমজুরি, কৃষিকাজ ও অন্যান্য অস্থায়ী কাজের ওপর নির্ভর করেই চলে অনেক পরিবারের জীবন। তাদের ভাষ্য, এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তাও বর্তমানে খুব সীমিত।
নিজেদের এমন সংকটের মধ্যেও নেপালের দুর্যোগপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে মানবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন তারা।
রোহিঙ্গা কমিউনিটির সদস্যদের ভাষায়, নেপালের মানুষের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে। দুর্যোগের সময়ে পাশে দাঁড়িয়ে সেই সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা দূর করারও সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নিজেদের ঘর হারিয়ে একদিন যারা অন্যের দেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন, আজ তারাই অন্যের দুর্দিনে বাড়িয়ে দিয়েছেন সহযোগিতার হাত।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
















