ঢাকায় ৮ তলা বাড়িসহ অবৈধভাবে বিপুল অর্থ আয়ের অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বছর তিনেক আগে দুদকের তদন্তের মুখোমুখি হয়েছিলেন রাজধানীর রমনা থানার সাবেক ওসি মনিরুল ইসলাম।
নাম একই শুধু বাড়তি রয়েছে ‘ভূঁইয়া’ শব্দ, অর্থাৎ এবার কক্সবাজারের রামুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অভিযানে উদ্ধার হওয়া ইয়াবা আত্মসাৎ করে কয়েক কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগ উঠায় তার জ্ঞাতআয় বহির্ভূত সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর রামুতে যোগদানের পর একেরপর এক বির্তক জন্ম দিতে থাকেন মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া। দুদকে দাখিলকৃত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে,রামুতে দায়িত্বপালন কালে অন্তত
৫ টি মাদকবিরোধী অভিযানে প্রায় ১৫ কোটি টাকা আনুমানিক মূল্যের অবৈধ ইয়াবা এই পুলিশ পরিদর্শক আত্মসাৎ করেছেন।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রামু কেন্দ্রীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে মিনিট্রাকে পাচারের সময় দেড় লাখ ইয়াবা সহ এক ব্যক্তিকে আটক দেখায় রামু থানা পুলিশ। ঐ অভিযানে খোদ নেতৃত্বে ছিলেন ওসি, ৪ লাখ ৫০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করলেও বাকি ৩ লাখ তিনি সরিয়ে ফেলেন বলে অভিযোগ উঠে আসে।
এই ঘটনার ১ মাস পর ২৮ মার্চ দুপুরে উপজেলার জোয়ারিয়ানালার মৌলভীপাড়া এলাকায় পরিচালিত অভিযান থেকে ১ লাখ ৪ হাজার ইয়াবা উদ্ধার দেখানো হয়।
দুপুরে উদ্ধার হলেও রাতে এঘটনায় মাবিয়া খাতুন নামে ৬০ উর্ধ্ব বৃদ্ধ নারীকে গ্রেফতারের কথা জানিয়ে রামু থানা গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। এই অভিযানে উদ্ধারকৃত ইয়াবার প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও আছে বির্তক,দুই লাখ উদ্ধার হলেও ৯৬ হাজার ইয়াবা কৌশলে সরিয়ে ফেলা হয়।
একই দিনে বিকেল ৩ টার দিকে ওসি মনির তার একান্ত সোর্সের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জোয়ারিয়ানালা এলাকার গ্রামীন ব্যাংক অফিসের সামনে হাইওয়ে রোডে একদল পুলিশকে অভিযানে প্রেরণ করেন। এসময় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা সহ একটি তুষের লাকড়ি বহন করা পরিবহন জব্দ করে পুলিশ।
অভিযানে অংশ নেওয়া এক পুলিশ সদস্যের ভাষ্য , ‘স্যারের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা অভিযানে যাই। অভিযানে একটি বস্তা পাওয়া গেলেও সেটি এক সোর্সকে দিয়ে দেওয়া হয়।’
ঐ বস্তা আনুমানিক ৮ লাখ ইয়াবা ছিলো বলে খবর ছড়ালেও রহস্যজনক কারণে এই ঘটনায় রামু থানায় কোন মামলা দায়ের করা হয়নি।
সর্বশেষ গত ২৪ এপ্রিল ভোরে উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের পূর্ব ধেচুয়াপালং সিকদারপাড়া তেলখোলা এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে অংশ নেন এএসআই সিরাজুল ইসলাম, এএসআই জাহেদুল হাসান এবং এসআই মো. আবু সায়েম।
এঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারে অভিযান চলাকালীন মোস্তফা হেলাল নামের এক ব্যক্তির বসতবাড়ির গোয়ালঘরে অভিযান চালিয়ে ১০ হাজার ১০০ পিস ইয়াবা, নগদ ৬ লাখ টাকা, একটি টাকা গণনার মেশিন, একটি মোবাইল ফোন এবং ২০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয় বলে উল্লেখ করা হয় তবে তবে কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
খুনিয়াপালং এলাকার বিখ্যাত ইয়াবা কারবারি ও পুলিশের কথিত সোর্স জাকির হোসেন প্রকাশ জাকির মাঝির দেওয়া তথ্যের মাধ্যমে এই অভিযানে ওসি তার সহযোগিতায় সরিয়ে ফেলেন
৫৩ হাজার ৯০০ পিস ইয়াবা ও নগদ ১০ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়টি সামনে এলে প্রতিবেদক গুরুতর এই অভিযোগগুলোর ব্যাপারে জানার চেষ্টা করেন।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্রের দাবী, অভিযানে উদ্ধার হওয়া ইয়াবার মধ্যে তথ্যদাতা বা কথিত সোর্সকে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ দিয়ে দিতে হয় এবং গায়েব করা বাকি ইয়াবা বিক্রির অর্থ ভাগবাটোয়ারা হয়ে যায় অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্য ও উর্ধ্বতন মহলের পকেটে। এই পুরো কাজটি নিজে তদারকি করে কোটি টাকা হাতিয়েছেন মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া।
নাম প্রকাশ না করে কথিত এক সোর্স বলেন , ‘জাকিরকে ওসি স্যারের বেশি পছন্দ,সেই বড় কাজ দেয়। আমরা ইয়াবা ইনফরমেশন নিয়ে তেমন কাজ করি না, এই পথে জাকিরের মাধ্যমে অনেক টাকা কামাইসেন ওসি।’
শুধু ইয়াবা গায়েবই নয় সাজানো নাটকের মাধ্যমে মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসা ব্যক্তিকে ক্রেডিট নিতে উদ্ধারের গল্প বানিয়ে প্রচারের অভিযোগ রয়েছে ওসির বিরুদ্ধে। গত ২২ এপ্রিল রামুর অপরাধপ্রবণ এলাকা ঈদগড়ে স্থানীয় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রুস্তম আলী অপহৃত হন।
অপহরণের পর তার পরিবারের কাছে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে, পরে তিনি ১০ লাখ টাকা দিয়ে মুক্তি পান। অপহরণকারীদের ধরতে না পারলেও একই দিন রাতে রশিদনগর ইউনিয়নের পানিরছড়া পাহাড়ি এলাকা থেকে রুস্তম আলীকে উদ্ধার দেখায় পুলিশ।
রুস্তম আলীর ছোট চাচা মৌলভী আব্দুল করিম জানান, ‘আমি মুক্তিপণের টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়েছি। পুলিশ পাহাড়ে যাওয়ার সাহস করেনি। নিখোঁজের পরপরই আমরা অভিযোগ জানালেও পুলিশের কোনো সাড়া পাইনি, এতগুলো টাকা গেল এত বড় বিপদ হল অথচ তারা কাউকে ধরতে পারল না। শুধু শুধু ছবি তুলে বাহবা নিয়েছে।’
এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে বির্তক যখন তুঙ্গে তখন সম্প্রতি রামু থানার ওসি হিসেবে ভোলার ছাত্রদল নেতা হত্যা মামলার আসামী আরমান হোসেনকে পদায়ন করা হয় বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর ছড়ায়। যদিও এই খবর ভুয়া জানিয়ে এবং রামুর ওসি হিসেবে মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়াই দায়িত্বে আছেন বলে উল্লেখ করে গণমাধ্যমে বিবৃতি দেয় জেলা পুলিশ।
এর কিছুদিন পর একটি আদেশে চট্টগ্রাম রেঞ্জ থেকে সেই আরমান হোসেনকে ময়মনসিংহে বদলী করা হয় তবে এখনো মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া রামুতেই রয়ে গেছেন।
এদিকে বারবার অভিযোগ ও গণমাধ্যমে খবর আসার পর ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে গত ২৭ এপ্রিল সরাসরি মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করে পুলিশের ৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অ্যাডিশনাল ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) নাজমুল হাসান জানান, ‘ রামুর ওসির বিরুদ্ধে আমরা বেশ কিছু অভিযোগ পেয়েছি, মাঠপর্যায়েও তদন্ত হয়েছে। সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় মামলাসহ প্রযোজ্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে অনুসন্ধান প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুদকের কক্সবাজার জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে
আনীত অভিযোগ তদন্ত করতে ঢাকার প্রধান কার্যালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী এগোচ্ছি, তদন্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ‘
বারবার ইয়াবা গায়েবের অভিযোগ কেনো? এই প্রশ্ন সহ প্রাসঙ্গিক কারণে জানতে চাওয়া হলে ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘ এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ, প্রত্যেকটি অভিযানের ভিডিও চিত্র সংরক্ষিত আছে। এখানে হেরফেরের সুযোগ নেই। একটি চক্র উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে আমার পেছনে লেগেছে এবং বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি বিলাচ্ছে। ‘
জানা গেছে, উপ পরিদর্শক (এসআই) হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়া এই পুলিশ কর্মকর্তা অতীতে রামুর হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ি সহ কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে শুরুর দিকে কয়েক বছর চাকরি করেছেন৷ রাউজানের ওসি হিসেবে দায়িত্বপালনের পর তিনি রামুতে নিযুক্ত হন।
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক 

















