ঢাকা ০৪:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
হঠাৎ রমনা থানা পরিদর্শনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্কাউটসের শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড এর মৌখিক ও সাঁতার মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি : তারেক রহমান চকরিয়ায় ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়ে আটবছরের শিশু মেয়েকে ধর্ষণ, অভিযুক্ত পলাতক টেকনাফে গণপিটুনিতে ‘বাইন্না ডাকাত’ নিহত কচ্ছপিয়ার বড় জাংছড়ি খালে মাছ শিকারের উৎসবে  কক্সবাজারে নানা আয়োজনে পালিত হয়েছে বুদ্ধ পূর্ণিমা কক্সবাজারের লবণ চাষী, জেলে ও পর্যটন শ্রমিকদের জন্য আশার আলো, নাকি অনিশ্চয়তার প্রতিধ্বনি? রামুতে ২০ হাজার ইয়াবাসহ এপিবিএনের কনস্টেবল আটক কক্সবাজারে জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক ও কর্মচারী দলের উদ্যোগে মে দিবস পালিত ‘আঁকো তোমার শহর’—শিল্পচর্চায় নতুন ভাবনা অমরণি ফুলের কুতুবদিয়ায় অটো রিক্সার গ্যারেজে আগুন: পুড়ে গেছে ২২ টি টমটম অপহরণ মামলায় আওয়ামী লীগ নেতার পুত্র তুহিন কারাগারে এআরএ-আরএসও সংঘর্ষ, সীমান্তে আতঙ্ক ট্রাকের ধাক্কায় রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু

যাচ্ছে জ্বালানি তেল, আসছে ইয়াবা- কাটাখালির শীর্ষ চোরাকারবারি কে এই ‘মামুন

টেকনাফ সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ও চোরাচালানের নানা রুট সক্রিয় থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনকহারে বেড়েছে এ পাচার।বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে জ্বালানি তেল পাচার এবং এর বিনিময়ে দেশে ঢুকছে ইয়াবা।

তীব্র জ্বালানি সংকট, সরকারি বিধিনিষেধ এবং নজরদারি জোরদার থাকার পরও এই অবৈধ বাণিজ্য থেমে নেই; বরং সীমান্তের কিছু নির্দিষ্ট পয়েন্টকে ঘিরে তা আরও সুসংগঠিত হয়ে উঠেছে।

অনুসন্ধান বলছে , টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাটাখালি এলাকা বর্তমানে এই পাচার কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, এখানে সক্রিয় রয়েছে কয়েকটি সিন্ডিকেট, যারা বাংলাদেশ থেকে অকটেন, ডিজেল ও কেরোসিন সংগ্রহ করে বিভিন্ন কৌশলে মিয়ানমারে পাচার করছে। বিনিময়ে ওই চক্রগুলো পাচ্ছে ইয়াবার বড় চালান, যা পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

এই সিন্ডিকেটগুলোর মধ্যে সক্রিয় একটির অন্যতম হোতা স্থানীয় মৃত গফুর সওদাগরের ছেলে মামুন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তঘেঁষা বিভিন্ন পয়েন্টে তার প্রভাব রয়েছে এবং একাধিক চোরাকারবারি দলের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি ভিডিও ফুটেজ এই অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি মোটরসাইকেলে করে দুই ব্যক্তি সীমান্তসংলগ্ন একটি সড়কে অবস্থান করছে। কিছুক্ষণ পর আরেক ব্যক্তি কালো পলিথিনে মোড়ানো একটি প্যাকেট তাদের হাতে তুলে দেয়। এরপর মোটরসাইকেলটি দ্রুতগতিতে এলাকা ত্যাগ করে।
ভিডিওতে থাকা দুই ব্যক্তির একজন মামুন বলে শনাক্ত করেছে স্থানীয় একাধিক সূত্র।

স্থানীয়দের মতে, এই ধরনের লেনদেন সাধারণত রাতের অন্ধকারে বা ভোরের দিকে বেশি ঘটে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়ানো যায়।

তবে দিনদুপুরেও মাঝে মাঝে ছোট আকারে চালান আদান-প্রদান করা হয়, বিশেষ করে যখন পরিস্থিতি ‘নিরাপদ’ বলে মনে করা হয়।

কাটাখালি ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জ্বালানি তেল পাচারের জন্য প্রথমে স্থানীয় পাম্প বা খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে তেল সংগ্রহ করা হয়। এরপর তা ছোট ছোট ড্রাম বা কনটেইনারে ভরে সীমান্তের নিকটবর্তী পয়েন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে নৌপথ কিংবা গোপন স্থলপথে মিয়ানমারে পাঠানো হয়। ফিরে আসে ইয়াবা, যা বহন করে আনে একই নেটওয়ার্কের সদস্যরা।

একজন মাদ্রাসা শিক্ষক বলেন, “আমরা প্রায়ই দেখি রাতের বেলা অচেনা লোকজন চলাফেরা করে। মাঝে মাঝে মোটরসাইকেল বা নৌকায় করে কিছু বহন করতে দেখা যায়। কিন্তু ভয় বা নিরাপত্তার কারণে কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলতে চায় না।”

অন্য এক বাসিন্দার অভিযোগ, এই চক্রগুলো এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে যে, তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়। ফলে সাধারণ মানুষ অনেক কিছু দেখেও নীরব থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মামুন ব্যস্ততা দেখিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। জ্বালানি তেল পাচার ও ইয়াবা চোরাচালান রোধে নিয়মিত টহল ও অভিযান চালানো হচ্ছে। নতুন কোনো সিন্ডিকেট বা নির্দিষ্ট ব্যক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য পেলে আমরা তা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করি।’

তিনি আরও জানান, ‘সীমান্ত এলাকা অনেক জায়গায় দুর্গম এবং বিভিন্ন অননুমোদিত পথ রয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করে চোরাকারবারিরা সক্রিয় থাকার চেষ্টা করে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহার, গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয়দের সহযোগিতার মাধ্যমে এসব দমন করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের সংকটকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা এখন ‘বিনিময় বাণিজ্য’ পদ্ধতি ব্যবহার করছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ এতে নগদ অর্থের লেনদেন কম থাকায় অনেক সময় প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু সীমান্তে টহল বাড়ালেই হবে না; বরং জ্বালানি তেল সরবরাহ ও বিক্রয় ব্যবস্থার ওপরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

ট্যাগ :

হঠাৎ রমনা থানা পরিদর্শনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

যাচ্ছে জ্বালানি তেল, আসছে ইয়াবা- কাটাখালির শীর্ষ চোরাকারবারি কে এই ‘মামুন

আপডেট সময় : ০৫:৩০:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬

টেকনাফ সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ও চোরাচালানের নানা রুট সক্রিয় থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনকহারে বেড়েছে এ পাচার।বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে জ্বালানি তেল পাচার এবং এর বিনিময়ে দেশে ঢুকছে ইয়াবা।

তীব্র জ্বালানি সংকট, সরকারি বিধিনিষেধ এবং নজরদারি জোরদার থাকার পরও এই অবৈধ বাণিজ্য থেমে নেই; বরং সীমান্তের কিছু নির্দিষ্ট পয়েন্টকে ঘিরে তা আরও সুসংগঠিত হয়ে উঠেছে।

অনুসন্ধান বলছে , টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাটাখালি এলাকা বর্তমানে এই পাচার কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, এখানে সক্রিয় রয়েছে কয়েকটি সিন্ডিকেট, যারা বাংলাদেশ থেকে অকটেন, ডিজেল ও কেরোসিন সংগ্রহ করে বিভিন্ন কৌশলে মিয়ানমারে পাচার করছে। বিনিময়ে ওই চক্রগুলো পাচ্ছে ইয়াবার বড় চালান, যা পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

এই সিন্ডিকেটগুলোর মধ্যে সক্রিয় একটির অন্যতম হোতা স্থানীয় মৃত গফুর সওদাগরের ছেলে মামুন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তঘেঁষা বিভিন্ন পয়েন্টে তার প্রভাব রয়েছে এবং একাধিক চোরাকারবারি দলের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি ভিডিও ফুটেজ এই অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি মোটরসাইকেলে করে দুই ব্যক্তি সীমান্তসংলগ্ন একটি সড়কে অবস্থান করছে। কিছুক্ষণ পর আরেক ব্যক্তি কালো পলিথিনে মোড়ানো একটি প্যাকেট তাদের হাতে তুলে দেয়। এরপর মোটরসাইকেলটি দ্রুতগতিতে এলাকা ত্যাগ করে।
ভিডিওতে থাকা দুই ব্যক্তির একজন মামুন বলে শনাক্ত করেছে স্থানীয় একাধিক সূত্র।

স্থানীয়দের মতে, এই ধরনের লেনদেন সাধারণত রাতের অন্ধকারে বা ভোরের দিকে বেশি ঘটে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়ানো যায়।

তবে দিনদুপুরেও মাঝে মাঝে ছোট আকারে চালান আদান-প্রদান করা হয়, বিশেষ করে যখন পরিস্থিতি ‘নিরাপদ’ বলে মনে করা হয়।

কাটাখালি ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জ্বালানি তেল পাচারের জন্য প্রথমে স্থানীয় পাম্প বা খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে তেল সংগ্রহ করা হয়। এরপর তা ছোট ছোট ড্রাম বা কনটেইনারে ভরে সীমান্তের নিকটবর্তী পয়েন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে নৌপথ কিংবা গোপন স্থলপথে মিয়ানমারে পাঠানো হয়। ফিরে আসে ইয়াবা, যা বহন করে আনে একই নেটওয়ার্কের সদস্যরা।

একজন মাদ্রাসা শিক্ষক বলেন, “আমরা প্রায়ই দেখি রাতের বেলা অচেনা লোকজন চলাফেরা করে। মাঝে মাঝে মোটরসাইকেল বা নৌকায় করে কিছু বহন করতে দেখা যায়। কিন্তু ভয় বা নিরাপত্তার কারণে কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলতে চায় না।”

অন্য এক বাসিন্দার অভিযোগ, এই চক্রগুলো এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে যে, তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়। ফলে সাধারণ মানুষ অনেক কিছু দেখেও নীরব থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মামুন ব্যস্ততা দেখিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। জ্বালানি তেল পাচার ও ইয়াবা চোরাচালান রোধে নিয়মিত টহল ও অভিযান চালানো হচ্ছে। নতুন কোনো সিন্ডিকেট বা নির্দিষ্ট ব্যক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য পেলে আমরা তা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করি।’

তিনি আরও জানান, ‘সীমান্ত এলাকা অনেক জায়গায় দুর্গম এবং বিভিন্ন অননুমোদিত পথ রয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করে চোরাকারবারিরা সক্রিয় থাকার চেষ্টা করে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহার, গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয়দের সহযোগিতার মাধ্যমে এসব দমন করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের সংকটকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা এখন ‘বিনিময় বাণিজ্য’ পদ্ধতি ব্যবহার করছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ এতে নগদ অর্থের লেনদেন কম থাকায় অনেক সময় প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু সীমান্তে টহল বাড়ালেই হবে না; বরং জ্বালানি তেল সরবরাহ ও বিক্রয় ব্যবস্থার ওপরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।