কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তঘেঁষা একটি মাঠ। যে মাঠে কিছুদিন আগেও সহপাঠীদের সঙ্গে দৌঁড়ে বেড়াত, খেলাধুলায় মেতে থাকত ছোট্ট হুজাইফা সুলতানা আফনান। সেই মাঠের পাশেই এখন তার চিরনিদ্রার ঠিকানা। ৯ বছরের এই শিশুর জানাজায় নেমেছিল শোকাহত মানুষের ঢল। কান্নাভেজা চোখ আর ভারী নিঃশ্বাসে যেন পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে ছিল।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় অনুষ্ঠিত হয় হুজাইফার জানাজার নামাজ। জানাজায় অংশ নিতে উখিয়া-টেকনাফসহ আশপাশের এলাকা থেকে শত শত মানুষ ছুটে আসেন। উপস্থিত ছিলেন উখিয়া-টেকনাফ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কক্সবাজার জেলা আমির ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী নুর মোহাম্মদ আনোয়ারীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরাও।
জানাজার আগে থেকেই হুজাইফার বাড়িতে ভিড় জমাতে শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শেষবারের মতো একনজর দেখতে এসে অনেকেই নিজেকে সামলাতে পারেননি, সন্তানের মরদেহ সামনে রেখে মা-বাবার হৃদয়বিদারক আহাজারিতে স্বজন ও প্রতিবেশীরাও অশ্রুসজল হয়ে পড়েন। ছোট্ট একটি জীবনের এমন করুণ পরিণতি যেন কাউকেই স্বাভাবিক থাকতে দেয়নি।
হুজাইফা স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তিন ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল পরিবারের বড় সন্তান। পরিবারের স্বপ্ন, ভালোবাসা আর ভবিষ্যতের আশার বড় অংশ জুড়েই ছিল এই শিশু।
শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার পর হুজাইফার মরদেহবাহী গাড়ি গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। রাতের নীরবতা ভেঙে তখন শোকের মাতমে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
এর আগে, গত ১১ জানুয়ারি সকাল ১০টার দিকে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমারে চলমান সশস্ত্র সংঘর্ষের সময় দেশটির ভেতর থেকে ছোড়া একটি গুলিতে গুরুতর আহত হয় হুজাইফা। আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয় তাকে।
দীর্ঘ ২৭ দিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকার জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে হুজাইফা।
শৈশবের খেলাধুলার সেই মাঠের পাশেই এখন তার কবর। যে মাঠে একসময় হাসির শব্দ ভেসে আসত, আজ সেখানে শুধুই নিঃশব্দ শোক আর স্মৃতির ভার। সীমান্তের গুলিতে নিভে যাওয়া ছোট্ট এই প্রাণ যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—সংঘাতের সবচেয়ে নির্মম শিকার হয় নিরীহ মানুষ, কখনো কখনো নিষ্পাপ শিশুরাও।
নিজস্ব প্রতিবেদক 

















