আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বৈষম্যবিরোধী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে আগামী সরকারের জন্য ১০ দফা জাতীয় কর্মসূচি প্রস্তাব করেছে নাগরিক প্ল্যাটফরম। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংকট, অস্থির শ্রমবাজার এবং সুশাসনের ঘাটতির মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এই কর্মসূচিগুলোকে একটি সমন্বিত কল্যাণরাষ্ট্রভিত্তিক নীতির কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) রাজধানীর বনানীতে এক হোটেলে আয়োজিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে নাগরিক ইশতেহার ২০২৬-এর পাশাপাশি এসব জাতীয় কর্মসূচি তুলে ধরা হয়।
ব্রিফিংয়ে সভাপতিত্ব করেন নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। আলোচনায় অংশ নেন নাগরিক প্ল্যাটফরমের কোর গ্রুপ সদস্য ও সিপিডি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য সুলতানা কামাল, গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, নিউ এইজ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের সাবেক ডেপুটি চেয়ারপারসন ড. মুশতাক রাজা চৌধুরী ও শাহীন আনাম।
অনুষ্ঠানে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘শুধুমাত্র নীতিমালা, কাঠামো কিংবা মূল্যবোধের কথা বলে দেশের উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব নয়, এ জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো।
অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা বা নীতিগত বক্তব্য দিলেই তা বাস্তবে রূপ নেয় না। নীতিগুলো কিভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও কর্মসূচি থাকতে হবে। সে কারণেই নাগরিক প্ল্যাটফরম খাতভিত্তিক নীতির পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে নীতিগত প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।
তবে শুধু নীতিকথা যথেষ্ট নয়। এইবার প্রথমবারের মতো আমরা বেশ কিছু জাতীয় কর্মসূচি সামনে আনছি, যেগুলো এসব নীতির বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।’
অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে এই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘নাগরিক প্ল্যাটফরম যে উন্নয়নের কথা বলে, সেই উন্নয়নের বিষয়গুলোই এসব কর্মসূচিতে প্রতিফলিত হয়েছে। শুধু পরামর্শ প্রদান করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং সেই পরামর্শ বাস্তবায়নে নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। এ লক্ষ্যে নাগরিক প্ল্যাটফরম একটি মনিটরিং রিপোর্ট উপস্থাপন করেছে, যার মাধ্যমে তাদের দেওয়া সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করা হবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরো বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে নাগরিক প্ল্যাটফরমের প্রস্তাবগুলো কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করছে বা করছে না, সেগুলোকেও নজরদারি ও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে’। এটিকে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন বাস্তবতা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
নারীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘বাংলাদেশের নারী সমাজ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সচেতন ও সক্ষম। এই সচেতন ও সক্ষম নাগরিক সমাজ ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক উত্তরণে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করবে বলে আমি আশাবাদী।’
নাগরিক প্ল্যাটফরমের মতে, প্রস্তাবিত কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক উত্তরণ নিশ্চিত করা, আয় ও সুযোগের বৈষম্য কমানো এবং টেকসই উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করা। বিদ্যালয়ের শিশু থেকে শুরু করে কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, যুবসমাজ, বয়স্ক নাগরিক, কর্মজীবী নারী এবং শহরের মধ্যবিত্ত—সব শ্রেণির মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পরিকল্পনা এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কল্যাণ ও সামাজিক নিরাপত্তাকে কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রস্তাব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে সর্বজনীন ন্যূনতম আয় কর্মসূচি। এর আওতায় প্রতি পরিবার মাসে ৪ হাজার ৫৪০ টাকা নগদ সহায়তা পাবে। তিন ধাপে দেশব্যাপী এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে, যার চূড়ান্ত পর্যায়ে ১ কোটি ৪৭ লাখ পরিবার এর আওতায় আসবে। প্রথম ধাপে ৩৬ জেলায় বাস্তবায়নে বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
শিক্ষাখাতে বৈষম্য কমানো ও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার লক্ষ্যে সরকারি বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ শিক্ষার্থী প্রতিদিন এক বেলা পুষ্টিকর খাবার পাবে। নাগরিক প্ল্যাটফরমের আশা, এতে ঝরে পড়া, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
স্বাস্থ্যখাতে প্রস্তাব করা হয়েছে জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ড চালুর। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি পরিবার বছরে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সেবা নিতে পারবে। প্রথম ধাপে ৬১ লাখ বয়স্ক ভাতাভোগীর পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ হাজার কোটি টাকা।
যুবসমাজের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে যুব ক্রেডিট কার্ড। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত সুদ ও জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থা থাকবে, যেখানে প্রতি বছর এক লাখ যুবক-যুবতী এই সুবিধা পাবে।
কৃষি খাতে প্রস্তাবিত স্মার্ট কৃষি কার্ড–বাংলাদেশ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষি পরিবার চাহিদাভিত্তিক কৃষি প্রণোদনা ও ডিজিটাল সম্প্রসারণ সেবা পাবে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে ও বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে জাতীয় শ্রমবাজার তথ্য বিনিময় প্ল্যাটফরম চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা প্রায় ৭ কোটি ১৭ লাখ শ্রমশক্তিকে লক্ষ্য করে তৈরি হবে।
নগরজীবনের ভোগান্তি কমাতে সরকার নিয়ন্ত্রিত ও ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে, যেখানে বাসচালক ও সহকারীরা হবেন বেতনভুক্ত কর্মচারী। রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে সমন্বিত কর ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে স্বয়ংক্রিয় রিটার্ন দাখিল, ই-পেমেন্ট এবং দ্রুত কর ফেরত নিশ্চিত করা যায়। পাশাপাশি নাগরিক সেবার ভিত্তি হিসেবে একটি জাতীয় সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে সব নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আন্তঃসংযুক্ত থাকবে।
নাগরিক প্ল্যাটফরমের মতে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল রূপান্তর এবং চলমান প্রকল্পগুলোর যৌক্তিক পরিমার্জন নিশ্চিত করা গেলে এই ১০ দফা জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নযোগ্য ও কার্যকর হবে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ
টিটিএন ডেস্ক: 
























