ঢাকা ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ফোর্টিফাই রাইটসের বিবৃতি – আরসা প্রধান আতাউল্লাহর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দাবি কুতুবদিয়ায় পুকুরে ডুবে শিশুর মৃত্যু ঝিনাইদহে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হা’ম’লা চকরিয়ায় বাসের ধাক্কায় পথচারী নিহত কুকুরের নৈপুণ্যে টায়ারের ভেতর মিলল ইয়াবা চকরিয়ায় মাদকাসক্ত ছেলের হাতে প্রাণ গেল বৃদ্ধ বাবার প্যাসিফিক বীচ রিসোর্টে আগুনে পুড়ে ছাই ৩ কটেজ, ক্ষতি ৭০ লাখ টাকা খেলাঘরের মানববন্ধন :শিশুর ধর্ষক ও হত্যাকারীদের দ্রুত এবং সর্বোচ্চ শাস্তির দাবী ঈদের দিন কেমন থাকবে আবহাওয়া নতুন আলোচনায় কারা?  / উখিয়ায় ৬ বছর ধরে ‘মেয়াদউর্ত্তীণ’ ছাত্রদলের আহবায়ক কমিটি  চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা, জড়িতদের শাস্তি দাবি অভিযুক্ত ডিবি কার্যালয়ে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে র‍্যাব ​টেকনাফে তরুণদের কারিগরি দক্ষতা মেলা ও ট্যালেন্ট হান্ট অনুষ্ঠিত কুতুবদিয়ায় ভূমি বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা সম্পন্ন চকরিয়ায় পৃথক ঘটনায় একদিনে তিনজনের মৃত্যু
মন্তব্য কলাম

মৃত নুর পাগলা বনাম জীবিত আমরা: কোন পথে হাঁটছে বাংলাদেশ!

রাজবাড়ির গোয়ালন্দের সাম্প্রতিক ঘটনাটি, মৃত নুর পাগলাকে কবর থেকে তুলে এনে জনতার সামনে পোড়ানো, বাংলাদেশের সমাজ, আইন ও মানবাধিকারের জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। এটি কেবল মানবিকতার সীমারেখাই নয়, রাষ্ট্রের আইন ও বিচার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও উন্মোচন করেছে। মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, আমরা কি সভ্যতার পথে হাঁটছি, নাকি অন্ধ উগ্রতার অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি?

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ধারা ২৯৭ স্পষ্টভাবে মৃতদেহের অবমাননাকে অপরাধ ঘোষণা করেছে। হাইকোর্টের একাধিক রায়েও বলা হয়েছে, মৃতদেহের মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার এই নৃশংস ঘটনাটি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাই আইনের অস্তিত্ব থাকলেও এর প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতে মৃত দেহকে “quasi-person” হিসেবে বিবেচনা করা হয়, অর্থাৎ মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থাতেও মর্যাদা রক্ষা করা আবশ্যক। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বহু সংস্থা বারবার বলেছে, মৃতদেহের অবমাননা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নুর পাগলার দেহ নিয়ে যা ঘটেছে, তা শুধু দেশের ভেতর নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

ইসলামে মৃতদেহের মর্যাদা রক্ষা ফরজ দায়িত্ব। রাসূল (স.) বলেছেন “মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙা জীবিতের হাড় ভাঙার সমান।” ফলে কবর উল্টানো কিংবা দেহ পোড়ানো ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনও ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় নির্দেশনা এত স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কিছু মানুষ কেন উগ্রতার বশবর্তী হলো, সেটিই আজ বড় প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সামাজিক মেরুকরণ এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। বহুদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, মানুষ আইন হাতে তুলে নিচ্ছে, অথচ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিরোধের যথেষ্ট উদ্যোগ নেই। এর ফলে “মব জাস্টিস” ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

“মৃত নুর পাগলা বনাম জীবিত আমরা” এই প্রতীকী তুলনা আজ বাংলাদেশের সামনে মৌলিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। আমরা কি মানবিকতা, আইন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের পথ বেছে নেব, নাকি অন্ধ উগ্রতার পথ অনুসরণ করব? রাষ্ট্র যদি মৃতের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে জীবিত মানুষের অধিকারই বা কিভাবে সুরক্ষিত হবে? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে; আমরা, নাগরিক ও রাষ্ট্র, এই প্রশ্নের কী উত্তর দিই তার ওপর।

লেখক: শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক,গবেষক ও চিন্তক।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য কলাম

মৃত নুর পাগলা বনাম জীবিত আমরা: কোন পথে হাঁটছে বাংলাদেশ!

আপডেট সময় : ১২:০১:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫

রাজবাড়ির গোয়ালন্দের সাম্প্রতিক ঘটনাটি, মৃত নুর পাগলাকে কবর থেকে তুলে এনে জনতার সামনে পোড়ানো, বাংলাদেশের সমাজ, আইন ও মানবাধিকারের জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। এটি কেবল মানবিকতার সীমারেখাই নয়, রাষ্ট্রের আইন ও বিচার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও উন্মোচন করেছে। মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, আমরা কি সভ্যতার পথে হাঁটছি, নাকি অন্ধ উগ্রতার অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি?

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ধারা ২৯৭ স্পষ্টভাবে মৃতদেহের অবমাননাকে অপরাধ ঘোষণা করেছে। হাইকোর্টের একাধিক রায়েও বলা হয়েছে, মৃতদেহের মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার এই নৃশংস ঘটনাটি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাই আইনের অস্তিত্ব থাকলেও এর প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতে মৃত দেহকে “quasi-person” হিসেবে বিবেচনা করা হয়, অর্থাৎ মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থাতেও মর্যাদা রক্ষা করা আবশ্যক। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বহু সংস্থা বারবার বলেছে, মৃতদেহের অবমাননা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নুর পাগলার দেহ নিয়ে যা ঘটেছে, তা শুধু দেশের ভেতর নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

ইসলামে মৃতদেহের মর্যাদা রক্ষা ফরজ দায়িত্ব। রাসূল (স.) বলেছেন “মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙা জীবিতের হাড় ভাঙার সমান।” ফলে কবর উল্টানো কিংবা দেহ পোড়ানো ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনও ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় নির্দেশনা এত স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কিছু মানুষ কেন উগ্রতার বশবর্তী হলো, সেটিই আজ বড় প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সামাজিক মেরুকরণ এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। বহুদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, মানুষ আইন হাতে তুলে নিচ্ছে, অথচ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিরোধের যথেষ্ট উদ্যোগ নেই। এর ফলে “মব জাস্টিস” ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

“মৃত নুর পাগলা বনাম জীবিত আমরা” এই প্রতীকী তুলনা আজ বাংলাদেশের সামনে মৌলিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। আমরা কি মানবিকতা, আইন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের পথ বেছে নেব, নাকি অন্ধ উগ্রতার পথ অনুসরণ করব? রাষ্ট্র যদি মৃতের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে জীবিত মানুষের অধিকারই বা কিভাবে সুরক্ষিত হবে? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে; আমরা, নাগরিক ও রাষ্ট্র, এই প্রশ্নের কী উত্তর দিই তার ওপর।

লেখক: শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক,গবেষক ও চিন্তক।