ঢাকা ০৬:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
যেখানে অ্যাম্বুলেন্স নয়, রোগী চলে মানুষের কাঁধে অসহিষ্ণু সমাজের আয়নায় আমরা রোনালদো বললেন, মেসিই সর্বকালের সেরা হজের খরচ কমাতে উদ্যোগ নেওয়া হবে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী মানবিক সহায়তা জোরদার ও নারী নেতৃত্ব বৃদ্ধির আহ্বান বাংলাদেশের সমঝোতার পরই হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিল ইরানের ১১ জাহাজ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে : তথ্যমন্ত্রী শিশু ওয়াহিদ হ-ত্যা: বিক্ষোভে ফুঁসছে চকরিয়া, আসামিদের পক্ষে দাঁড়াবে না আইনজীবীরা কুতুবদিয়ায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত মিয়ানমার-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেবে বাংলাদেশ: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াবা পাচারের সময় পুলিশের ধাওয়া খেয়ে ঈদগাঁওয়ের যুবকের মৃত্যু, আহত ১ কুতুবদিয়ায় জামায়াত আমীর আনোয়ারী – ঐক্যবদ্ধভাবে ভূমিকা পালন করতে হবে” চট্টগ্রামে শিশু আয়াত হত্যার রায় : ১ মাসের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর চায় পরিবার আপত্তিকর ভিডিও প্রচারের অভিযোগে কক্সবাজার সিটি কলেজের শিক্ষার্থী বহিষ্কার জনগণের টাকা আর পাচার হতে দেব না: প্রধানমন্ত্রী

যেখানে অ্যাম্বুলেন্স নয়, রোগী চলে মানুষের কাঁধে

ছবিতে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন মানুষ কাঁধে করে একজন রোগীকে নিয়ে যাচ্ছেন। পাশেই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো। এটি কোনো দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের নয়, কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের বেংডেবা গ্রামের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে দেশ এগিয়ে চললেও কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বেংডেবা গ্রামের প্রায় ১০০ পরিবার এখনো রয়ে গেছে উন্নয়নের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও গ্রামটিতে পৌঁছেনি একটি চলাচল উপযোগী সড়ক নির্মিত হয়নি প্রয়োজনীয় সেতু মেলেনি বিদ্যুৎ সংযোগ। ফলে প্রতিদিনই দুর্ভোগ, অনিশ্চয়তা আর বঞ্চনার মধ্য দিয়ে জীবন পার করছেন এলাকার মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৫০ বছর ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন-নিবেদন করেও মাত্র ২ কিলোমিটার রাস্তা ও কয়েকটি ছোট সেতুর ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। ফলে গ্রামের মানুষ আজও কাদামাটি, পাহাড়ি ছড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন।

চিকিৎসা নিতে গিয়ে মৃত্যুর মিছিলঃ
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দেয় জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে। এলাকাবাসীর দাবি, রাস্তা ও সেতুর অভাবে অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ছড়া ও খাল পানিতে তলিয়ে গেলে রোগীদের বাঁশের খাটিয়া কিংবা মানুষের কাঁধে বহন করে কয়েক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে গত কয়েক দশকে অন্তত ২০ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গর্ভবতী নারী, বৃদ্ধ ও শিশুদের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময় রাতের অন্ধকারে রোগী নিয়ে বের হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে।

স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম জানান, জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা তো দূরের কথা, মোটরসাইকেল পর্যন্ত গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে অসুস্থ ব্যক্তিদের চিকিৎসা সেবা পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে।

কৃষিপণ্য উৎপাদন হয়, কিন্তু বাজারে পৌঁছায় না বেংডেবা গ্রাম মূলত কৃষিনির্ভর এলাকা। এখানে ধান, শাকসবজি, মৌসুমি ফল ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য সময়মতো বাজারে নিতে পারেন না।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, অনেক সময় পরিবহন সংকটের কারণে পণ্য নষ্ট হয়ে যায় কিংবা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে কৃষকদের উৎপাদন খরচও উঠে আসে না। ফলে গ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে সড়ক যোগাযোগ অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। অথচ বেংডেবা গ্রামে সেই মৌলিক অবকাঠামোই অনুপস্থিত।

শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা যেন যুদ্ধঃ
যোগাযোগ সংকটের প্রভাব পড়েছে শিক্ষার ক্ষেত্রেও। গ্রামের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার দুর্গম পথ অতিক্রম করে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় যাতায়াত করে।

বর্ষাকালে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হতে পারে না। স্থানীয়দের মতে, সড়ক ও সেতুর অভাবে অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথে লেখাপড়া ছেড়ে দিচ্ছে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকলেও যাতায়াত সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কক্সবাজার সরকারি কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী আবুল হাসনাত আল-আমিন বলেন,জন্মের পর থেকে দেখে আসছি আমাদের গ্রাম এখনো সরকারের মৌলিক উন্নয়ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সড়ক, বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক সুবিধার অভাবে এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে বসবাস করছে। আমরা চাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করুক।

সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মিয়া বলেন,
“রামুর অন্যান্য এলাকায় উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও আমাদের গ্রাম এখনো পিছিয়ে আছে। সরকারের কাছে বিনীত আবেদন, দ্রুত আমাদের এলাকার সমস্যাগুলো সমাধান করা হোক। বিদ্যুৎহীনতায় থমকে আছে আধুনিক জীবন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও গ্রামটিতে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। সৌরবিদ্যুতের সীমিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে কিছু পরিবার রাতের অন্ধকার দূর করার চেষ্টা করছে।মোবাইল ফোন চার্জ দিতে অনেককে কয়েক কিলোমিটার দূরের এলাকায় যেতে হয়।

ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বলতার কারণে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী এবং অনলাইন সেবাগ্রহীতারা মারাত্মক সমস্যায় পড়ছেন। ডিজিটাল সেবার যুগে এমন অবস্থা স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে।

বন বিভাগের আপত্তিতে থমকে উন্নয়ন?
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিলেই বন বিভাগের আপত্তির মুখে পড়তে হয়। ফলে বছরের পর বছর ধরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য একরামুল হক বাবুল বলেন,এটি আমার ওয়ার্ডের দীর্ঘদিনের অবহেলিত রাস্তা। এখানে প্রায় একশ বছর ধরে মানুষের বসবাস হলেও চলাচলের একমাত্র রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নিলে স্থানীয় বন বিভাগের বাধার মুখে পড়তে হয়। নির্বাচনের সময় অনেকে প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না।

জোয়ারিয়ানালা বিট কর্মকর্তা বাদন ধর বলেন,প্রস্তাবিত রাস্তা নির্মাণ করা হলে বন বিভাগের গাছ কেটে সহজেই সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বনাঞ্চলের নিরাপত্তা ও গাছ সংরক্ষণের স্বার্থে আমরা রাস্তা নির্মাণে আপত্তি জানিয়ে আসছি।

এদিকে স্থানীয়রা বলছেন, বন সংরক্ষণ ও জনস্বার্থ দুই বিষয়কে সমন্বয় করেই উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তারা পরিবেশবান্ধব নকশায় রাস্তা ও সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়ন কোথায়? গ্রামবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনের সময় বিভিন্ন প্রার্থী রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুতের প্রতিশ্রুতি দিলেও ভোটের পর আর কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যার মধ্যে আটকে আছে বেংডেবা।

এ বিষয়ে জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল শামশুদ্দিন আহাম্মদ প্রিন্সের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাত্র ২ কিলোমিটার সড়ক ও কয়েকটি সেতু নির্মাণের মাধ্যমে শতাধিক পরিবারের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব করা সম্ভব। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক উন্নত করা গেলে এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

গ্রামবাসীর দাবি, উন্নয়নের সুফল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছানোর কথা থাকলেও বেংডেবা গ্রাম এখনো অবহেলা ও বঞ্চনার প্রতীক হয়ে আছে। তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

যেখানে অ্যাম্বুলেন্স নয়, রোগী চলে মানুষের কাঁধে

যেখানে অ্যাম্বুলেন্স নয়, রোগী চলে মানুষের কাঁধে

আপডেট সময় : ০৪:৪৫:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

ছবিতে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন মানুষ কাঁধে করে একজন রোগীকে নিয়ে যাচ্ছেন। পাশেই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো। এটি কোনো দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের নয়, কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের বেংডেবা গ্রামের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে দেশ এগিয়ে চললেও কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বেংডেবা গ্রামের প্রায় ১০০ পরিবার এখনো রয়ে গেছে উন্নয়নের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও গ্রামটিতে পৌঁছেনি একটি চলাচল উপযোগী সড়ক নির্মিত হয়নি প্রয়োজনীয় সেতু মেলেনি বিদ্যুৎ সংযোগ। ফলে প্রতিদিনই দুর্ভোগ, অনিশ্চয়তা আর বঞ্চনার মধ্য দিয়ে জীবন পার করছেন এলাকার মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৫০ বছর ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন-নিবেদন করেও মাত্র ২ কিলোমিটার রাস্তা ও কয়েকটি ছোট সেতুর ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। ফলে গ্রামের মানুষ আজও কাদামাটি, পাহাড়ি ছড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন।

চিকিৎসা নিতে গিয়ে মৃত্যুর মিছিলঃ
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দেয় জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে। এলাকাবাসীর দাবি, রাস্তা ও সেতুর অভাবে অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ছড়া ও খাল পানিতে তলিয়ে গেলে রোগীদের বাঁশের খাটিয়া কিংবা মানুষের কাঁধে বহন করে কয়েক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে গত কয়েক দশকে অন্তত ২০ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গর্ভবতী নারী, বৃদ্ধ ও শিশুদের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময় রাতের অন্ধকারে রোগী নিয়ে বের হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে।

স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম জানান, জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা তো দূরের কথা, মোটরসাইকেল পর্যন্ত গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে অসুস্থ ব্যক্তিদের চিকিৎসা সেবা পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে।

কৃষিপণ্য উৎপাদন হয়, কিন্তু বাজারে পৌঁছায় না বেংডেবা গ্রাম মূলত কৃষিনির্ভর এলাকা। এখানে ধান, শাকসবজি, মৌসুমি ফল ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য সময়মতো বাজারে নিতে পারেন না।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, অনেক সময় পরিবহন সংকটের কারণে পণ্য নষ্ট হয়ে যায় কিংবা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে কৃষকদের উৎপাদন খরচও উঠে আসে না। ফলে গ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে সড়ক যোগাযোগ অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। অথচ বেংডেবা গ্রামে সেই মৌলিক অবকাঠামোই অনুপস্থিত।

শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা যেন যুদ্ধঃ
যোগাযোগ সংকটের প্রভাব পড়েছে শিক্ষার ক্ষেত্রেও। গ্রামের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার দুর্গম পথ অতিক্রম করে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় যাতায়াত করে।

বর্ষাকালে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হতে পারে না। স্থানীয়দের মতে, সড়ক ও সেতুর অভাবে অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথে লেখাপড়া ছেড়ে দিচ্ছে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকলেও যাতায়াত সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কক্সবাজার সরকারি কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী আবুল হাসনাত আল-আমিন বলেন,জন্মের পর থেকে দেখে আসছি আমাদের গ্রাম এখনো সরকারের মৌলিক উন্নয়ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সড়ক, বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক সুবিধার অভাবে এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে বসবাস করছে। আমরা চাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করুক।

সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মিয়া বলেন,
“রামুর অন্যান্য এলাকায় উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও আমাদের গ্রাম এখনো পিছিয়ে আছে। সরকারের কাছে বিনীত আবেদন, দ্রুত আমাদের এলাকার সমস্যাগুলো সমাধান করা হোক। বিদ্যুৎহীনতায় থমকে আছে আধুনিক জীবন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও গ্রামটিতে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। সৌরবিদ্যুতের সীমিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে কিছু পরিবার রাতের অন্ধকার দূর করার চেষ্টা করছে।মোবাইল ফোন চার্জ দিতে অনেককে কয়েক কিলোমিটার দূরের এলাকায় যেতে হয়।

ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বলতার কারণে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী এবং অনলাইন সেবাগ্রহীতারা মারাত্মক সমস্যায় পড়ছেন। ডিজিটাল সেবার যুগে এমন অবস্থা স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে।

বন বিভাগের আপত্তিতে থমকে উন্নয়ন?
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিলেই বন বিভাগের আপত্তির মুখে পড়তে হয়। ফলে বছরের পর বছর ধরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য একরামুল হক বাবুল বলেন,এটি আমার ওয়ার্ডের দীর্ঘদিনের অবহেলিত রাস্তা। এখানে প্রায় একশ বছর ধরে মানুষের বসবাস হলেও চলাচলের একমাত্র রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নিলে স্থানীয় বন বিভাগের বাধার মুখে পড়তে হয়। নির্বাচনের সময় অনেকে প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না।

জোয়ারিয়ানালা বিট কর্মকর্তা বাদন ধর বলেন,প্রস্তাবিত রাস্তা নির্মাণ করা হলে বন বিভাগের গাছ কেটে সহজেই সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বনাঞ্চলের নিরাপত্তা ও গাছ সংরক্ষণের স্বার্থে আমরা রাস্তা নির্মাণে আপত্তি জানিয়ে আসছি।

এদিকে স্থানীয়রা বলছেন, বন সংরক্ষণ ও জনস্বার্থ দুই বিষয়কে সমন্বয় করেই উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তারা পরিবেশবান্ধব নকশায় রাস্তা ও সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়ন কোথায়? গ্রামবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনের সময় বিভিন্ন প্রার্থী রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুতের প্রতিশ্রুতি দিলেও ভোটের পর আর কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যার মধ্যে আটকে আছে বেংডেবা।

এ বিষয়ে জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল শামশুদ্দিন আহাম্মদ প্রিন্সের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাত্র ২ কিলোমিটার সড়ক ও কয়েকটি সেতু নির্মাণের মাধ্যমে শতাধিক পরিবারের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব করা সম্ভব। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক উন্নত করা গেলে এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

গ্রামবাসীর দাবি, উন্নয়নের সুফল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছানোর কথা থাকলেও বেংডেবা গ্রাম এখনো অবহেলা ও বঞ্চনার প্রতীক হয়ে আছে। তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।